ধর্ষণের শাস্তি নিয়ে বিতর্ক

সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার কথা ভাবছে সরকার : আইনমন্ত্রী ** ক্রসফায়ারের দাবি পাগলের প্রলাপ ছাড়া কিছু নয় :শাহ্দীন মালিক ** ক্রসফায়ারের দাবি হতাশার বহিঃপ্রকাশ : ইফতেখারুজ্জামান

প্রকাশিত: ৭:৩৮ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৮, ২০২০ | আপডেট: ৭:৩৮:পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৮, ২০২০

শামছুদ্দিন আহমেদ।বিদ্যমান আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করার দাবি বারবারই উঠছে। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান করার দাবি এখন বেশ জোরালো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষকদের এবং বেগমগঞ্জে নারী নির্যাতকদের ‘ক্রসফায়ারে’ দেওয়ারও দাবি তুলেছেন। তবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সংবিধান পরিপন্থি এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে মনে করেন বেশির ভাগ মানুষ। দেশি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বরাবরই বিচারবহির্ভূত যে কোনো হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারায় ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন ও ৯(২) ধারায় ধর্ষণের কারণে মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন থেকে বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর বনানীতে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে এ কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, জনগণের দাবি বিবেচনা না করে উপায় নেই।

আইন বিশেষজ্ঞদের কারো কারো মতে, ধর্ষণের আইনি কাঠামোয় কার্যকর পরিবর্তন আনতে হলে ধর্ষণসংক্রান্ত আইনগুলোর আধুনিকীকরণ এবং লিঙ্গ সংবেদনশীল পরিবর্তন প্রয়োজন। ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন প্রণীত হলেও ধর্ষণের সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এখনো রয়ে গেছে ১৮৬০ সালে ব্রিটিশদের তৈরি করা ফৌজদারি দণ্ডবিধি। বিশ্বের অনেক দেশে যৌন অপরাধ আর ধর্ষণকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে।

আইনজ্ঞদের মতে, ধর্ষণের শিকার নারীকে আদালতে কী ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন করা যাবে এবং কী করে তার সম্মানহানি না করে বিচারকার্য চালানো যাবে, সেই সম্পর্কিত আইনগুলোতেও অনেক দুর্বলতা ও ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। কার্যত এখনো ব্রিটিশ আইনপ্রণেতাদের তৈরি ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। ধর্ষণের ক্ষেত্রে আইন ও বিচারব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো শোধরানো জরুরি বলে মত আইনজ্ঞদের।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহ্দীন মালিক গতকাল  আলাপকালে বলেন, ‘ধর্ষকদের ক্রসফায়ারে দেওয়ার দাবি পাগলের প্রলাপ ছাড়া কিছুই নয়। ২০০৫ সাল থেকেই আমি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বলে আসছি, লেখালেখি করছি।’ তিনি বলেন, ‘ফরাসি দার্শনিক মন্টেস কিউ ৩০০ বছর আগে বলে গেছেন, একটা সমাজ কতটা গণতান্ত্রিক বা অগণতান্ত্রিক কিংবা একটা সমাজ কতটা সভ্য বা পশ্চাত্পদ, সেটি বোঝা যায় সেই সমাজের ফৌজদারি আইনগুলোতে কী ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে তা দেখে। ব্রিটিশরা ১৮৬০ সালে প্যানাল কোর্টের ৫১১টি ধারার মধ্যে মাত্র ছয়টি অপরাধের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখেছিল। আমাদের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এ ৩৪টি ধারার মধ্যে ১০টির অধিকটিতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। এর থেকে বেশি শাস্তি আর কী দেওয়া যায়?’

তিনি বলেন, ‘আমাদের কারাগারগুলোর কনডেম সেলে বর্তমানে আঠারো শতাধিক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তি রয়েছে, যেটা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিতের সর্বোচ্চ সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে আমরা তৃতীয় কী চতুর্থ স্থানে। এত মৃত্যুদণ্ডের আদেশ পৃথিবীর কতটা দেশে হয়? ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিপ্লবের পর সম্ভবত এত মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল।’

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করতে চলমান দাবি সম্পর্কে শাহ্দীন মালিক বলেন, ‘আসলে আমাদের সমাজটাই বর্বর ও অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। আমাদের মনে রাখা দরকার যে পৃথিবীর তিন-চতুর্থাংশ দেশেই মৃত্যুদণ্ড নেই। প্রতিবেশী ভারতে গত ২০ বছরে হয়তো একটি মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। বিশ্বে বর্তমানে সর্বাধিক মৃত্যুদণ্ড হচ্ছে চীন, ইরান, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে।’ তার মতে, সরকারই শুধু অগণতান্ত্রিক নয়; মানুষের মন-মানসিকতাও অজান্তেই অগণতান্ত্রিক, অসহিষ্ণু ও নৃশংস হয়ে যাচ্ছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, বিশ্বের ১০৬টি দেশ মৃত্যুদণ্ড রহিত করেছে। এছাড়া ৮০টিরও বেশি দেশ রয়েছে, যেখানে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও সেটির ব্যবহার নেই। অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ২৩০ জনের মতো ব্যক্তিকে সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পূর্ববর্তী মামলায় দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত অপরাধীসহ সব মিলিয়ে ঐ বছর দেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মোট আসামির সংখ্যা ছিল দেড় হাজারের বেশি। এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে যেসব দেশ সাজা হিসেবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড দিয়ে থাকে, বাংলাদেশ তার একটি।

কারো কারো মতে, ধর্ষণের শাস্তি শুধু যাবজ্জীবন হলে জেল থেকে বেরিয়ে অনেক সময় একই অপরাধে আবারও জড়ায় অপরাধীরা। তাই মৃত্যুদণ্ড অপরাধের মাত্রা কিছুটা হলেও কমাতে পারে। আবার ফেসবুকে কেউ কেউ বলছেন, ধর্ষণের মতো নিষ্ঠুর ঘটনা বন্ধ করতে হলে ধর্ষণকারীদের ক্রসফায়ারে দিতে হবে। অর্থাত্, তাকে বিনা বিচারে হত্যা করতে হবে, যাতে এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর প্রতি ভয় তৈরি হয়। ফেসবুকেই আবার অনেকের মন্তব্য, ক্রসফায়ারের মাধ্যমে ধর্ষণের মতো অপরাধ থামানো সম্ভব নয়। বরং এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমাজকে বর্বর করে তুলবে। খোদ জাতীয় সংসদে এ বছরের ২০ জানুয়ারি ধর্ষণকারীদের ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করার দাবি জানান সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) দুই জন সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ ও মুজিবুল হক চুন্নু।

বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান  বলেন, যে অবস্থাই হোক না কেন, ক্রসফায়ার একদম অগ্রহণযোগ্য। যত বড় অপরাধীই হোক না কেন, আইনের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার তার রয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সুশাসন ও আইনের শাসনের ভাবনার বিরোধী। তার মতে, বিচারবহির্ভূত হত্যার দাবি তোলা হতাশার বহিঃপ্রকাশ। দেশে আইনের শাসনের অভাব থাকায় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর আস্থার সংকট থেকেই এই হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।

সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধানের দাবি সম্পর্কে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সর্বোচ্চ শাস্তি একেক জনের কাছে একেক রকম। কথাটা হচ্ছে, অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হতে হবে, যাতে পরবর্তী সময়ে কেউ সে ধরনের অপরাধ করার সাহস না পায়। বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের এখানে যেসব আইন রয়েছে, দুই-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া সেগুলোও সঠিকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না।’