গলাচিপায় ‘ট্রিপল মার্ডারের’ রহস্য উদ্‌ঘাটন

পালিত মেয়েকে বিয়ে দিতে না চাওয়ায় মস্তক ছিন্ন করে হত্যা

প্রকাশিত: ১:৪২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০২০ | আপডেট: ১:৪২:অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০২০

পটুয়াখালী-পটুয়াখালীর গলাচিপায় আলোচিত ‘ট্রিপল মার্ডারের’ মামলার তিন বছর পর পুলিশ রহস্য উদ্‌ঘাটন এবং মূল হোতাকে গ্রেপ্তার করেছে। ওই ব্যক্তির নাম শহীদুল ইসলাম (৪২)। গত শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকার সাভার থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আজ সোমবার বিকেলে মামলার প্রধান আসামি দেখিয়ে তাঁকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। বিকেল পাঁচটার দিকে শহিদুল ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেও শহিদুল তিনজনকে হত্যার কথা স্বীকার করেছিলেন। আজ দুপুরে পটুয়াখালী পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে প্রেস বিফ্রিং করে সাংবাদিকদের বিষয়টি অবহিত করা হয়। সেখানেই উঠে আসে ট্রিপল মার্ডার মামলার রহস্য।

পটুয়াখালী পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মইনুল হাসান জানান, গলাচিপার আমখোলা ইউনিয়নের ছৈলাবুনিয়া গ্রামে ২০১৭ সালের ১ আগস্ট গভীর রাতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছিল। পরদিন ২ আগস্ট সন্ধ্যায় নির্জন ঘর থেকে একই সঙ্গে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত ব্যক্তিরা হলেন দেলোয়ার মোল্লা (৬৫), তাঁর স্ত্রী পারভিন বেগম (৬৫) ও তাঁদের পালিত কন্যা কাজলী আক্তার (১৫)। কাজলীর দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছিল। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে। কাজলীর পরিধেয় কাপড় থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষা করানো হয়। হত্যাকাণ্ডের পর কাজলীর ব্যবহৃত মুঠোফোন পাওয়া যায়নি।

মুঠোফোনের সূত্র ধরে গ্রেপ্তার শহিদুল

হত্যাকাণ্ডের পর নিহত দেলোয়ারের বড় ভাই মো. ইদ্রিস মোল্লা কারও নাম উল্লেখ না করে ৩ আগস্ট একটি হত্যা মামলা করেন। দেলোয়ারের বোন পিয়ারা বেগম ৭ আগস্ট ২২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ১০-১৫ জনকে আসামি করে আদালতে একটি হত্যা মামলা করেন। আদালত থানায় করা মামলার সঙ্গে এই মামলা একত্রে তদন্ত করার আদেশ দেন।

ঘটনার সাড়ে তিন মাস পর পটুয়াখালীতে যোগদান করার পর এসপি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মামলাটি নিবিড় ও গভীর তদন্তের জন্য গলাচিপা থানাকে নির্দেশ দেন। গত শুক্রবার ঢাকার পল্লবীর বাউনিয়া বাঁধ এলাকা থেকে মোহাম্মদ আবু রায়হান নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে কাজলীর খোয়া যাওয়া নকিয়া ১২৮০ মুঠোফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ। রায়হানের বাড়ি বরিশালের হিজলায়। জিজ্ঞাসাবাদে রায়হান জানান, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে তাঁর ফুপুর ননদের স্বামী শহিদুল তাঁকে মুঠোফোনটি দিয়েছেন। এই মুঠোফোনের সূত্র ধরে পুলিশ শহিদুলকে খুঁজতে থাকে।

গত শুক্রবার ঢাকার পল্লবীর বাউনিয়া বাঁধ এলাকা থেকে মোহাম্মদ আবু রায়হান নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে কাজলীর খোয়া যাওয়া নকিয়া ১২৮০ মুঠোফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে রায়হান জানান, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে তাঁর ফুপুর ননদের স্বামী শহিদুল তাঁকে মুঠোফোনটি দিয়েছেন। এই মুঠোফোনের সূত্র ধরে পুলিশ শহিদুলকে খুঁজতে থাকে।

বিফ্রিংয়ে জানানো হয়, গ্রেপ্তার শহিদুল ইসলাম নিহত দেলোয়ারের বড় ভাই ইদ্রিস মোল্লার (থানার মামলার বাদী) ছেলে। গাড়িচালক শহিদুল প্রথমে গলাচিপার আমখোলায় বিয়ে করেন এবং পরে বরিশালের হিজলায় দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই শহিদুল তাঁর পরিবার ও গ্রামের সব আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।

গত তিন বছর শহিদুল নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘জাহাঙ্গীর’ রেখে প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে সাভার এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় অবস্থান করছিলেন এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা (ইজিবাইক) চালাতেন। গলাচিপা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হ‌ুমায়ূন কবিরের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল শনিবার সন্ধ্যায় সাভার থেকে শহিদুলকে গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শহিদুল পুলিশের কাছে চাচা দেলোয়ার, চাচি পারভিন ও তাঁদের পালিত কন্যা কাজলীকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর দুই স্ত্রী থাকার পরও তিনি কাজলীকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চাচা-চাচি দুজনই রাজি না হওয়ায় রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁর চাচা-চাচি ও কাজলীকে কুপিয়ে ও জবাই করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটান।

গাড়িচালক শহিদুল প্রথমে গলাচিপার আমখোলায় বিয়ে করেন এবং পরে বরিশালের হিজলায় দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তাঁর দুই স্ত্রী থাকার পরও তিনি চাচা–চাচির পালিত কন্যা কাজলীকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চাচা-চাচি দুজনই রাজি না হওয়ায় রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁর চাচা-চাচি ও কাজলীকে কুপিয়ে ও জবাই করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটান।

সন্দেহভাজনও ছিলেন না শহিদুল

শহিদুলকে গ্রেপ্তারের পর আজই প্রথম তাঁকে মামলার আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর আগে থানা ও আদালতে করা দুটি মামলার কোনোটিতেই তিনি সন্দেহভাজনের তালিকায় ছিলেন না। এ ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা জিজ্ঞাসাবাদ করবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, খুব দরিদ্র দেলোয়ার মোল্লা আগে ঢাকায় দিনমজুরের কাজ করতেন। আর তাঁর স্ত্রী পারভীন অন্যের বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। তাঁরা নিঃসন্তান ছিলেন। ২০১২ সালের দিকে ঢাকা থেকে কাজলীকে ১০ বছর বয়সে দেলোয়ার দম্পতি গ্রামে নিয়ে আসেন এবং নিজের মেয়ের মতো বড় করতে থাকেন। ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে এসে দেলোয়ার বড় ভাই ইদ্রিসের (শহিদুলের বাবা) একটি বাড়িতে ওঠেন এবং বাড়িটি দেখাশোনার ভার নিয়ে সেখানেই বসবাস করতে থাকেন। গলাচিপার আমখোলা ইউনিয়নের দক্ষিণ ছৈলাবুনিয়া গ্রামের ওই বাড়িতেই দেলোয়ার মোল্লা, তাঁর স্ত্রী পারভিন বেগম ও তাঁদের পালিত কন্যা কাজলী আক্তারকে ঘুমন্ত অবস্থায় নির্মমভাবে কুপিয়ে ও জবাই করে হত্যা করা হয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ইদ্রিস মোল্লার এক বোন রোকেয়া বেগমের বিয়ে হয় তাঁর চাচাতো ভাই বজু মোল্লার সঙ্গে। বিয়ের পর জমিজমা নিয়ে ইদ্রিস মোল্লার সঙ্গে বজু মোল্লার বিরোধ সৃষ্টি হয়। তবে বজু মোল্লা মারা যাওয়ার পর তাঁর সাত ছেলের সঙ্গে সেই বিরোধ রয়ে যায়। এর জেরে ২০১৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ্যে ইদ্রিস মোল্লার ছেলে এসএসসি পরীক্ষার্থী শফিক মোল্লাকে ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। দুই দিন পর ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শফিক মারা যায়। এ হত্যাকাণ্ডের পর ইদ্রিস মোল্লা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং নিজের নিরাপত্তার জন্য বাড়ি ছেড়ে পটুয়াখালীর সদর উপজেলার আউলিয়াপুর গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয় নেন। এ সময় ইদ্রিস মোল্লা তাঁর বাড়িটি দেখাশোনার জন্য ভাই দেলোয়ার ও তাঁর স্ত্রীকে থাকতে দেন।

ছেলে শফিক হত্যার ঘটনায় ইদ্রিস মোল্লা বজু মোল্লার সাত ছেলেকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছিলেন। ওই হত্যা মামলার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ছিলেন তাঁর ভাই দেলোয়ার মোল্লা ও ভাইয়ের স্ত্রী পারভীন বেগম।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হ‌ুমায়ূন কবীর জানান, শফিক হত্যা মামলা ও জমি নিয়ে বিরোধের সূত্র ধরে নিহত দেলোয়ারের বোন পিয়ারা বেগম বাদী হয়ে ২০১৭ সালের ৭ আগস্ট গলাচিপা আদালতে যে হত্যা মামলাটি করেন, তাতে তাঁদের পারিবারিক প্রতিপক্ষ বজু মোল্লার ছেলে-নাতি-স্বজনদেরই আসামি করা হয়েছিল। কিন্তু সব সন্দেহের বাইরে ছিলেন মূল হোতা শহিদুল।