দুর্গম হাওরে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প দিনে মাত্র দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ

হতাশ গ্রাহক

প্রকাশিত: ১:০২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০২০ | আপডেট: ১:০৫:অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০২০

এলটিএন সুনামগঞ্জ।দুর্গম হাওর এলাকার মানুষের ঘরে ঘরে জ্বলবে বিদ্যুতের আলো। শিক্ষার্থীরা সেই আলোতে বসে পড়বে। প্রসার ঘটবে ব্যবসা-বাণিজ্যের। এমনটাই ছিল প্রকল্পের উদ্দেশ্য। এ কারণে প্রকল্প নিয়ে খুশি ছিল হাওরপারের মানুষ। কিন্তু তিন বছরের মাথায় এসে প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। গ্রাহকেরা এখন সৌরবিদ্যুতের এ প্রকল্প ছেড়ে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ চান। অথচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এখনো প্রকল্পটি বুঝে নেয়নি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।

সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, শাল্লা উপজেলায় ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে চালু হয় ‘দুর্গম হাওরে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প’। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের যৌথ অর্থায়নে এ প্রকল্পে প্রায় ৩২ কোটি টাকা ব্যয় হয়। ওই বছরের ১০ ডিসেম্বর প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। মৌরাপুর, আগুয়াই, বিলপুর, শাসখাই গ্রাম ও শাসখাই বাজারের মানুষ এ প্রকল্পের গ্রাহক। কিন্তু গ্রাহকদের উপকারের বদলে ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এটি। দিনে মাত্র দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন তাঁরা। কখনো তার চেয়ে কম। আবহাওয়া খারাপ হলে বন্ধ থাকে সরবরাহ।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, হবিবপুর ইউনিয়নের আগুয়াই-শাসখাই বাজারের মধ্যবর্তী স্থানে চার একর জমির ওপর এটি স্থাপন করা হয়েছে। শাসখাই বাজার থেকে এক কিলোমিটার দক্ষিণে শাসখাই হাওরপারে প্রকল্পের অবস্থান। সেখানে যাওয়ার রাস্তাও ভাঙাচোরা। সড়কের পাশ ঘেঁষে এবং হাওরের ওপর দিয়ে ছোট ছোট খুঁটি দিয়ে প্রকল্প থেকে লাইন গেছে মানুষের বসতবাড়ি ও বাজারের দোকানপাটে। এসব খুঁটি এখন বিভিন্ন স্থানে হেলে পেড়েছে। মানুষ বাঁশ দিয়ে বেঁধে রেখেছেন। প্রকল্পের ভেতরে মাটি থেকে সামান্য উঁচুতে সারবদ্ধভাবে ২ হাজার ২৩টি প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় রয়েছে দুটি দোতলা পাকা ভবন। একটিতে রয়েছে যন্ত্রপাতি ও প্রকল্পের লোকদের থাকার ব্যবস্থা। অন্যটি শুরু থেকেই তালা দেওয়া। প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রহিমআফরোজ রিনিউঅ্যাবল এনার্জি লিমিটেডের প্রতিনিধি ইমন মিয়া তদারকের দায়িত্বে আছেন। আর কোনো লোক নেই। প্রকল্পের বিষয়ে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

গ্রাহকেরা জানিয়েছেন, শুরুতে তাঁরা বিল দিয়েছেন। পরে যখন বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা দেখা দেয়, তখন আর কোনো লোক বিল নিতে আসেননি। এখন অনেকে বিলও দিচ্ছেন না। দেখাশোনারও প্রয়োজনীয় লোক নেই এখানে।

হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান আগুয়াই গ্রামের বাসিন্দা সুবল চন্দ্র দাস প্রকল্পটি দেখিয়ে আফসোস করেন। তিনি বলেন, এটি নিয়ে এলাকার মানুষের উৎসাহের সীমা ছিল না। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা থাকলেও শুরুতে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হয়। এরপর ধীরে ধীরে সময় কমতে থাকে। এখন দিনে মাত্র দুই ঘণ্টা দেওয়া হচ্ছে। তা–ও নিয়মিত নয়। এখন আশপাশের সব গ্রামে পল্লী বিদ্যুৎ চলে এসেছে। সুবল বলেন, ‘আমরা এ প্রকল্পে আর থাকতে চাই না। এর বদলে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ পেতে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছি।’
শাসখাই গ্রামের বাসিন্দা রতন চন্দ্র দাস (৩৫) বলেন, ‘প্রকল্প বুঝে নেওয়ার আগেই এটির অবস্থা এমন হবে আমরা ভাবতেও পারিনি। এখন বলা হচ্ছে এটার ক্যাপাসিটি নাকি কম।’

একই গ্রামের বাসিন্দা কৃষ্ণপদ চৌধুরী বলেন, ঘরে এ প্রকল্পের সংযোগ আছে। কিন্তু বাতি জ্বলে না। তাই বছরখানেক আগে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল কিনে লাগিয়েছেন। এখন তাঁদের চাওয়া এ প্রকল্প থেকে আমাদের মুক্তি দেওয়া হোক।’

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড দিরাই-শাল্লার আবাসিক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হায়দার আলী বলেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পটি বুঝে নিতে নির্দেশনা এসেছে। কিন্তু এটির অবস্থা এখন ভালো নয়। অনেক যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে। মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। গ্রাহকদের কাছে প্রায় ১২ লাখ টাকা বিল বকেয়া আছে। এটি তদারকি ও পরিচালনার মতো স্থানীয়ভাবে লোকবলও নেই। এই বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।