অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান প্রকল্প-সুবিধাভোগীর তালিকায় মৃত ব্যক্তি পাগল ও প্রবাসী

প্রকাশিত: ৯:২০ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩, ২০২০ | আপডেট: ৯:২৫:অপরাহ্ণ, জুলাই ৩, ২০২০

সুনামগঞ্জ, বিশেষ প্রতিনিধি।সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার দেওয়ান নগর গ্রামের সিকন্দর আলীর ছেলে নূর মিয়া মারা গিয়েছেন ছয় বছর আগে।  প্রায় আট বছর ধরে ওমানে বসবাস করছেন একই গ্রামের আমির আলীর ছেলে হাবিবুর রহমান। মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে বাড়িতে প্রায় ২৪ ঘণ্টাই শেকলবাঁধা অবস্থায় থাকেন একই উপজেলার দোহালিয়া ইউনিয়নের বাদে গোরেশপুর গ্রামের আলখাছ আলীর ছেলে আব্দুল গণি। একই গ্রামের ফয়জুল ইসলামের স্ত্রী ফরিদা বেগম কোটি টাকা মূল্যের বাড়ির মালিক। অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় গৃহীত প্রকল্পের রাস্তায় মাটি কাটার শ্রমিক হিসেবে দেখানো হয়েছে তাদের সবাইকেই।

বিষয়টি জানার পর এখন পর্যন্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পেরেছেন শুধু ফরিদা বেগমই।  নাম ও পরিচয়পত্র নকল এবং স্বাক্ষর জাল করে সরকারি প্রকল্পের সুবিধাভোগী বানিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছেন তিনি।দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া ইউনিয়নে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় নেয়া সাতটি প্রকল্পে এমনই অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। এমনকি কাজ না করেই প্রকল্পের পুরো টাকা আত্মসাতের প্রমাণও উঠে এসেছে বণিক বার্তার অনুসন্ধানে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রকল্পের নাম ও কাজের সঙ্গে কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই এমন ব্যক্তিদের দিয়ে কাজ করানো হয়েছে দেখিয়ে জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। মৃত ব্যক্তি, প্রবাসী, মানসিক ভারসাম্যহীন এমনকি কোটিপতিদেরও দেখানো হয়েছে অতিদরিদ্রদের জন্য গৃহীত প্রকল্পের শ্রমিক বা কর্মী হিসেবে।  এসব অনিয়ম নিয়ে অভিযোগের তীর দোহালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের গঠিত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।

প্রসঙ্গত, দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া ইউনিয়নে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় সাতটি প্রকল্প নেয়া হয়।  এ সাত প্রকল্পে অতিদরিদ্র ১৭৫টি উপকারভোগী কার্ডের জন্য মোট ১৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। তবে শেষ পর্যন্ত দেখা গিয়েছে কাজী আনোয়ার হোসেন আনু ও ইউপি সদস্য আলী হোসেনের ঘনিষ্ঠজনরাই এ প্রকল্পের প্রকৃত উপকারভোগী হয়েছেন। অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির ৪১ ও ৪২ নম্বর প্রকল্পে ভুয়া নাম ব্যবহার এবং মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখানোসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতি পাওয়া গিয়েছে। একই অবস্থা ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০ ও ৪৩ নম্বর প্রকল্পেরও। এসব প্রকল্পের আওতায় নামকাওয়াস্তে মাটি ফেলে পুরো টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসী।অভিযোগ রয়েছে খোদ প্রকল্প গ্রহণের বিষয়টি নিয়েও।  এ সাত প্রকল্পের মধ্যে কর্মসূচির অধীন ৪১ নম্বর প্রকল্পটি নেয়া হয়েছে ‘গুরুশপুর ছইর আলীর বাড়ি থেকে ব্রিজের মুখ পর্যন্ত এবং মোহনের বাড়ি থেকে মেইন রোড পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ’ নামে। অনুসন্ধান করে জানা গিয়েছে, ছইর আলী ও মোহন নামে ওই গ্রামে কোনো লোক নেই।।বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর একাধিক অভিযোগ করেও কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি বলে জানালেন মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় সমাজসেবক আলাউদ্দিন।  তিনি বলেন, ইউপি মেম্বার আলী হোসেন ভুয়া প্রকল্প তৈরি করে উপকারভোগীদের তালিকায় মৃত, মানসিক ভারসাম্যহীন ও একাধিক প্রবাসীর নাম ব্যবহার করে কাজ না করেই টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ নিয়ে একাধিকবার অভিযোগ করেও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি, কোনো তদন্তও হয়নি।

কর্মসূচির অধীন এ সাত প্রকল্পের প্রতিটি নিয়েই উঠেছে এমন অনিয়মের অভিযোগ। এসব প্রকল্পে সভাপতি হিসেবে কাগজে- কলমে ইউপি সদস্যদের নাম থাকলে সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হিসেবে স্থানীয়দের অভিযোগের তীর ইউপি চেয়ারম্যান কাজী আনোয়ার হোসেন আনুর দিকে।এ ব্যাপারে দোহালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কাজী আনোয়ার হোসেন আনুর সঙ্গে সেলফোনে যোগাযোগ করা হলে ব্যস্ততার কথা বলে ফোন কেটে দেন তিনি।  যদিও পরে ফোন দিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে সার্বিক কাজের সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (পিআইও) আম্বিয়া আহমদ বলেন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমি দোয়ারাবাজারে ছিলাম না। আমি নতুন এসেছি। বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আমি খোঁজখবর নিচ্ছি। তবে উপকারভোগীর তালিকায় মৃত ব্যক্তি বা প্রবাসীর নাম থাকার কথা নয়।  যদি এমন হয়ে থাকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, বিষয়টি আমার নজরে আসেনি। অভিযোগের কাগজপত্র খুঁজে দেখব।  কেউ অভিযোগ না দিলেও প্রকল্পের কাজের মূল্যায়ন প্রতিবেদন দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।