মানিকগঞ্জে গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত শিল্পকারখানায় উৎপাদন

প্রকাশিত: ৭:৫৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২, ২০২০ | আপডেট: ৭:৫৭:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২, ২০২০

রিপন আনসারী,মানিকগঞ্জ থেকে।। মানিকগঞ্জে গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে শিল্পকারখানা গুলোর উৎপাদন। গ্যাস নির্ভর শিল্পকারখানা গুলোতে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ৫ ঘন্টাও মিলছে না গ্যাস। ফলে অনেক শিল্পকারখানা কার্যত বন্ধের উপক্রম দেখা দিয়েছে। প্রতিমাসে ভর্তুকি দিয়েই কারখানার শ্রমিকদের বেতন ভাতা পরিশোধ করছেন মালিকরা। শুধু শিল্প কারখানাই নয় বাসা বাড়ির চুলায়ও জ্বলে না গ্যাসের আগুন।
জানাগেছে,মানিকগঞ্জের বড় বড় প্রায় ১৫টি গ্যাস নির্ভর শিল্পকারখানা রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারনে কারখানাগুলো চালাতে হিমসীম খাচ্ছেন কারখানার মালিকরা।
খোজখবর নিয়ে জানাগেছে,গ্যাসের অভাবে মানিকগঞ্জের সুপার সাইন কেবল,রাইজিং স্পিনিং মিল, মুন্নু ফেব্রিকস লিমিটেডসহ আরো কয়েকটি বড় বড় শিল্প কারখানায় উৎপাদনে ধ্বস নেমেছে। গ্যাস সরবরাহ নিরবিচ্ছিন্ন না থাকায় আর চাহিদার তুলনায় তিন ভাগের এক ভাগও গ্যাস সরবরাহ করতে পারছেনা । এতে বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে শিল্প মালিকদের। বিগত দিনে নিরবিচ্ছন্ন গ্যাসের দাবীতে মানিকগঞ্জের মানুষজন রাস্তায় নেমে আন্দোলন সংগ্রামে বাধ্য হয়েছিলেন। বর্তমান গ্যাসের যে বেহাল দশা এতে কোন কোন শিল্পকারখানা যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে শ্রমিকদের মধ্যে অসষেÍাষ দেয়ার সম্ভাবনা রযেছে।
জেলা বিসিকের শিল্পনগরী কর্মকর্তা রবিউল আলম বলেন,মানিকগঞ্জ বিসিকে ১৫টি বিভিন্ন ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অধিকাংশ কারখানায় গ্যাসের উপর নিভর্রশীল। অব্যাহত গ্যাস-সংকটে কারখানাগুলো বন্ধের উপক্রম হয়েছে। এ সমস্যা সমাধান না হলে শিল্পে বিনিয়োগে আস্থা হারিয়ে ফেলবেন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা।
জেলার সাটুরিয়া উপজেলার নয়াডিঙ্গী এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত রাইজিং স্পিনিং মিল। জেলার অন্যতম বৃহৎ এই কারখানায় সুতা ও কাপড় তৈরি করা হয়।
সম্প্রতি সরেজমিনে কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কারখানাটিতে জেনারেটর চালাতে সঞ্চালন পাইপের মাধ্যমে তিতাস গ্যাসের সংযোগ রয়েছে। গ্যাস-সংকটের কারণে সচল রাখতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। কারখানাটির উৎপাদন বিভাগের হিসাবমতে, গত মে মাসে ১ কোটি ৭৮ লাখ ৬২ হাজার টাকা গ্যাসের বিল পরিশোধের পরও বাড়তি ৪৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল গুনতে হয়েছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, জুলাই মাসে গ্যাসের বিল ১ কোটি ৬১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা দেওয়ার পরও ৫৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হয়েছে।এতে কারখানার মালিকের কাঁধে বাড়তি খরচের পাল্লা।
রাইজিং স্পিনিং মিলের উপমহাব্যবস্থাপক (উৎপাদন) মো. কলিম উদ্দিন বলেন, উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে গ্যাসের চাপ কম পক্ষে পাঁচ পিএসআই প্রয়োজন। এক্ষেত্রে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র এক পিএসআই। গ্যাসের এত কম চাপের কারণে জেনারেটর চালু রাখতে বাধ্য হয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে কারখানার মালিকের প্রতি মাসে গড়ে ৫০ লাখ টাকা বেশি অতিরিক্ত অর্থ খরচ হচ্ছে।
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার গিলন্ড এলাকায় রয়েছে জেলার আরেক বৃহৎ শিল্প কারখান মুন্নু ফেব্রিকস লিমিটেড। এই কারখানার প্রধান অক্্িরজেনই হচ্ছে গ্যাস। জেনারেটর,বয়লার ও কিছু মেশিন আছে যা গ্যাস ছাড়া চালানো অসম্ভব। দীর্ঘ দিন ধরে গ্যাস সংকটের কারনে এই কারখানায় উৎপাদনে চরমভাবে ব্যহত হচেছ বলে জানিয়েছেন কারখানা কর্তৃপক্ষ।
মুন্নু ফেবক্্িরস লিমিটেডের এজিএম (প্রশাসন ও মানবসম্পদ) বাবুল হোসেন বলেন, অক্্িরজের না থাকলে যেমন যেমন মানুষ বাঁচে,তেমনি গ্যাস নির্ভর কারখানা গুলোতে গ্যাস না থাকলে সব কিছু অচল হয়ে পড়ে। গ্যাস সংকটের কারনে আমাদের কারখানাটির উৎপাদন মারাত্বকভাবে ব্যহত হচ্ছে। ১৫ পিএসআই গ্যাসের অনুমদোন থাকলেও কিছু কিছু সময় মাত্র ৪-৫ পিএসআই পাওয়া গেলেও বেশীরভাগ সময় শুন্য পিএসআই থাকে। ফলে জেনারেটর,বয়লার ও কিছু কিছু মেশিন রয়েছে যা এই অল্প গ্যাসের চাপে চালানো যায় না। এ পরিস্থিতিতে কারখানার উৎপাদন চালু রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। লোকসানের মধ্যেই শ্রমিকদের মাসিক বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে। কোন শ্রমিকদে ছাটাই করা হচ্ছে না। প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ পিএসআই গ্যাস যদি পাওয়া যায় তাহলে কারখানায় উৎপাদনে গতি আসবে।
বিসিকে অবস্থিত সুপার সাইন কেবল নামের কারখানার মহাব্যবস্থাপক (জিএম) উত্তম ভৌমিক বলেন, ‘প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৫ ঘণ্টা গ্যাস মিলছে। বাকি ১৯ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ নেই। এই সামান্য গ্যাস দিয়ে কীভাবে শিল্পপ্রতিষ্ঠান টিকবে? কীভাবে কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক থাকবে?
জেলার একাধিক শিল্পকারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মানিকগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাসের সংকট চলছে। দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ একেবারেই থাকে না। রাত ১২টা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত মাত্র পাঁচ ঘণ্টা গ্যাসের চাপ থাকে, তবে তা সীমিত। গ্যাসের এ সংকটে অনেক কারখানার উৎপাদন অর্ধেক কমে গেছে। এ সামান্য উৎপাদন দিয়ে শ্রমিকের মজুরিসহ ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এভাবে গ্যাসের সংকট চলতে থাকলে কারখানাগুলো টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়বে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় কোটি কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। কোনো কারখানা উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি থেকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের মানিকগঞ্জ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার আশুলিয়া থেকে সঞ্চালন পাইপের মাধ্যমে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার আরিচা পর্যন্ত তিতাস গ্যাস সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ঢাকার ধামরাই উপজেলার ইসলামপুর থেকে আরিচা পর্যন্ত মানিকগঞ্জের তিতাস গ্যাসের আওতাভুক্ত এলাকা। এ জেলায় আবাসিক গ্রাহক রয়েছে ১ হাজার ২৪২টি, বাণিজ্যিক ৩৩টি, শিল্পকারখানা ৭১টি এবং ১৯টি সিএনজি স্টেশনে গ্যাস–সংযোগ রয়েছে।
তিতাস গ্যাস কার্যালয়ের বিপণন বিভাগের ব্যবস্থাপক ফিরোজ কবিরের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, সঞ্চালন পাইপের মাধ্যমে তিতাস গ্যাস সরবরাহ ও বিতরণ করা হয়ে থাকে। তবে ট্রান্সমিশন কোম্পানি প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করতে না পারায় মানিকগঞ্জে গ্যাস-সংকট রয়েছে। বিষয়টি তিতাসের পেট্রোবাংলাকে জানানো হয়েছে। টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে মানিকগঞ্জে বিকল্প একটি সঞ্চালন লাইন নির্মাণে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে মানিকগঞ্জে গ্যাসের সংকট থাকবে না।