লন্ডন যাত্রীদেরও করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট জরুরী! ওসমানীতে লন্ডনফেরত যাত্রীদের ৩ ঘন্টা ভোগান্তি

সাজিদুর রহমান ফারুকের হস্তক্ষেপে জটিলতার অবসান

প্রকাশিত: ৭:৩০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৫, ২০২০ | আপডেট: ১০:৪৫:পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৬, ২০২০

সিলেট অফিস।করোনার রিপোর্ট সঙ্গে না থাকার কারণে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় তিন ঘণ্টা আটকা পড়েছিলেন শ’খানেক লন্ডনফেরত প্রবাসী। দীর্ঘ পথ যাত্রা করে বিমানবন্দরে তাদের আটকে রাখা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেক প্রবাসী। এ সময় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে তাদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। পরে অবশ্য থার্মো স্ক্যানার দিয়ে পরীক্ষার পর লন্ডন থেকে আসা যাত্রীদের বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়। এ নিয়ে গতকাল সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিন ঘণ্টা নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে কেটেছে লন্ডনফেরত যাত্রীদের। যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন গত সোমবার যেসব যাত্রী লন্ডন থেকে দেশে এসেছিলেন তাদের জন্য এই নিয়ম প্রযোজ্য ছিল না। করোনা রিপোর্ট ছাড়াই তারা যাতায়াত করতে পেরেছেন। কিন্তু হঠাৎ করে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে কড়াকড়ি আরোপ করার কারণে বিমানবন্দরে এসে ভোগান্তিতে পড়ছেন তারা।তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে করোনার প্রভাব সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে একটু কম থাকার কারণে প্রবাসীদের জন্য এতো কড়াকড়ি ছিল না। কিন্তু বর্তমানে করোনার প্রভাব বেড়ে যাওয়ার কারণে এখন রিপোর্ট যাদের থাকবে না তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হবে।

চলমান করোনাকালে আকাশপথে বহির্বিশ্বে যাতায়াত করা যাত্রীদের নিয়ে ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ নীতি পালন করেছে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ। বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের যেকোনো দেশে যাত্রী যেতে বাধ্যতামূলক করোনা রিপোর্ট নিতে হচ্ছে যাত্রীদের। এ কারণে করোনা পরীক্ষায় প্রবাসী যাত্রীদের দুর্ভোগের অন্ত নেই। কিন্তু বাইরে থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে এই নিয়মের কোনো বালাই ছিল না। সরকারের তরফ থেকে রিপোর্ট নিয়ে আসার নির্দেশনা থাকলেও সেটি পালন করা হয়নি।

বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, করোনাকালেই গত আগস্ট মাস থেকে যুক্তরাজ্য থেকে যাত্রীরা সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর দিয়ে আসছেন। তাদের কেবল থার্মো স্ক্যানার দিয়ে পরীক্ষা করা হতো। করোনার পরীক্ষার নেগেটিভ রিপোর্টের সনদ সঙ্গে রয়েছে কিনা- সে ব্যাপারে বিমানবন্দরে থাকা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারাও কখনো প্রশ্ন তুলেননি। ফলে যুক্তরাজ্য থেকে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে করোনা রিপোর্ট ছাড়াই যাত্রীরা আসতে পারতেন। করোনার সেকেন্ড ওয়েব নিয়ে ইতিমধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে সিলেটে। ফের বাড়তে শুরু করেছে  রোগীর সংখ্যা। আগস্টের মাঝামাঝি সময় থেকে রোগী কমে এসেছিল সিলেটে। সেই সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও কম ছিল। অক্টোবর পর্যন্ত করোনার প্রাদুর্ভাব কম হওয়ার কারণে কিছুটা স্বস্তিতে ছিলেন সিলেটবাসী। কিন্তু সেকেন্ড ওয়েব শুরু হতে না হতেই রোগী বেড়ে যাওয়ার কারণে গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে ফের কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।

যুক্তরাজ্য থেকে এখন সপ্তাহে বিমানের দু’টি ফ্লাইট আসে সিলেটে। একটি আসে  সোমবার ও অপরটি বৃহস্পতিবার। লন্ডনের যাত্রীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে এই ফ্লাইট চালু করা হয়েছে। গতকাল সকাল ১০টার দিকে বিমানবন্দরে যুক্তরাজ্য থেকে ১৯৩ জন যাত্রী নিয়ে বিমানবন্দরে আসে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট। আগের নিয়মেই যাত্রীরা ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস শেষ করে স্বাস্থ্য পরীক্ষার মুখোমুখি হন। লন্ডনফেরত যাত্রীরা জানিয়েছেন, বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষাকালে সকল যাত্রীর কাছে করোনার নেগেটিভ রিপোর্ট চাওয়া হয়। এ সময় শ’খানেক যাত্রী করোনা সার্টিফিকেট দেখাতে পারেননি। করোনা সার্টিফিকেট নিয়ে আসা প্রসঙ্গে যুক্তি তুলে ধরে তারা বলেন- করোনাকালে কখনো বিমানবন্দরে যাত্রীদের সার্টিফিকেট চাওয়া হয়নি। এ জন্য তারা যুক্তরাজ্য থেকে ওই রিপোর্ট নিয়ে আসেননি। তাদের কথায় কান দেয়নি স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। যাদের করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট ছিল তাদের ছেড়ে দিয়ে যারা রিপোর্ট সঙ্গে নিয়ে আসেননি তাদের বিমানবন্দরেই রেখে দেয়া হয়। এক পর্যায়ে স্বাস্থ্য বিভাগের তরফ থেকে ঘোষণা  দেয়া হয়- যাত্রীদের কোয়ারেন্টিনে যেতে হবে। রিপোর্ট সঙ্গে না থাকার কারণে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনের পর তাদের ছেড়ে দেয়া হবে বলে জানানো হয়। এতে করে উপস্থিত শ’খানেক যাত্রী ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন।

এ সময় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তর্কেও জড়িয়ে পড়েন কেউ কেউ। যাত্রীরা অভিযোগ করে বলেন, তারা বাংলাদেশ বিমানের টিকিট কেনার সময় তাদের এই নিয়ম সম্পর্কে অবগত করা হয়নি। আবার যখন তারা লন্ডন থেকে বিমানে উঠলেন তখনো তাদের কাছে করোনার রিপোর্ট চাওয়া হয়নি। এ ব্যাপারে তাদের কাছে কোনো ‘মেসেজ’ না  পৌঁছানোর কারণে তারা বিমান কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেন। বলেন- করোনা রিপোর্ট বিষয়টি বিমান কর্তৃপক্ষের জানানো উচিত ছিল। কিন্তু তারা সেটি করেননি।

এদিকে, লন্ডনফেরত এসব যাত্রীকে নিয়ে প্রায় ৩ ঘণ্টা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে স্বাস্থ্য বিভাগ। এসময় যাত্রীদের সঙ্গে থাকা যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগের সেক্রেটারি সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুক হস্তক্ষেপ করেন। নিজের পরিচয় দিয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগ করে পুরো অবস্থা বুঝাতে সক্ষম হলে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। 

এর আগে যাত্রীরা কোয়ারেন্টিনে  যেতে রাজি না হওয়ার কারণে দেখা দেয় জটিলতা। পরে স্বাস্থ্য বিভাগের তরফ থেকে থার্মো স্ক্যানার দিয়ে পরীক্ষা করে সব যাত্রীকে ছেড়ে দেয়া হয়। সিলেটের সিভিল সার্জন প্রেমানন্দ মণ্ডল মানবজমিনকে জানিয়েছেন, এতোদিন করোনা রিপোর্ট নিয়ে আসার কোনো নির্দেশনা ছিল না। এখন স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে নির্দেশনা এসেছে, এ কারণে পরবর্তীতে করোনা রিপোর্ট যারা আনবেন তাদের কোয়ারেন্টিন ছাড়াই যেতে দেয়া হবে। আর যারা সার্টিফিকেট আনবেন না তাদের কোয়ারেন্টিনে নেয়া হবে। তিনি জানান, যুক্তরাজ্য যাত্রীদের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে গতকাল যাত্রীদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বিমান কর্তৃপক্ষ টিকিট বিক্রি ও লন্ডনে বিমানে উঠার আগে যাত্রীদের কাছে এই  মেসেজ পৌঁছানো উচিত বলে জানান সিভিল সার্জন।

সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ম্যানেজার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সব নিয়মই বিদ্যমান রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা স্বাস্থ্য পরীক্ষা কিংবা করোনার বিষয়টি মনিটরিং করেন। যাত্রীদের করোনা রিপোর্ট আছে কী নেই, কিংবা নিয়ে আসার প্রয়োজন রয়েছে কিনা সেটি স্বাস্থ্য বিভাগই জানেন। তবে যাত্রীদের কাছে মেসেজ পৌঁছানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এদিকে বাংলাদেশ বিমানের সিলেটের ম্যানেজার এটিএম শামসুজ্জামান জাানিয়েছেন, যুক্তরাজ্য থেকে সিলেটে আসা বাংলাদেশ বিমানের যাত্রীদের  বেলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুসারে সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেটি এখন যাত্রীদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিমান কর্তৃপক্ষও যাত্রীদের কাছে এই মেসেজ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করবে বলে জানান তিনি।