রামগঞ্জে বাধা পেরিয়ে ৫ নারীর সফলতা

প্রকাশিত: ১২:০৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৮, ২০২০ | আপডেট: ১২:০৬:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৮, ২০২০
অ আ আবীর আকাশ,লক্ষ্মীপুর অফিস। লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলাতে ৫ জন নারী নিজেদের অদম্য ইচ্ছেশক্তিতে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে  পেরেছেন। শত ঘাত-প্রতিঘাতকে পিছনে ফেলে তারা কঠোর পরিশ্রম,একাগ্রতা,আত্মবিশ্বাসের কারনে আজ সম্মানের আসনে আধিষ্ঠ হয়েছেন। কেউ দুর্বল অবস্থান থেকে পরিশ্রম করে সন্তানদের করেছে প্রতিষ্ঠিত আর কেউ নির্যাতনে বিভীষিকা মুছে নিজে হয়েছে সাবলম্বী।
শাহিনা আক্তার
হিন্দু নারী থেকে মুসলমান হওয়া শাহিনা আক্তার ( মঞ্জুমা রানী) ভালোবেসে মাসিমপুর গ্রামের মুসলিম ছেলে রফিকুল ইসলামকে ১৯৮৫ সালে বিয়ে করার অপরাদে পিতা-মা,ভাই-বোন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। দায়িত্বশীল স্বামীর অনুপস্থিতিতে পরিবারের সদস্যরা চালায় নানা প্রকার নির্যাতন। ১৯৯৫ সালে একটি এনজিওতে চাকুরী নিয়ে কর্মময় জীবন শুরু করেন।১৯৯৮ সালে চন্ডিপুর ইউপি থেকে সংরক্ষিত মহিলা মেম্বার নিবার্চিত হন। এরপর থেকে টানা ৪ বার মেম্বার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চাকুরীর বেতন ও মেম্বার হিসেবে পাওয়ায় সম্মানী দিয়ে এক মেয়েকে মাস্টার্স,এক মেয়েকে ফাজিল এবং এক ছেলেকে এইচ.এসসি পাশ করিয়েছেন। জরাজীর্ণ বসতঘর থেকে বর্তমানে সমাজে প্রতিষ্ঠিত নারী শাহিনা আক্তার।
আছমা খানম
দরিদ্র পরিবারের সন্তান আছমা খানম টিউশনি করে অনার্সে অধ্যায়নরত অবস্থায় ২০১০ সালে বদরপুর গ্রামের জাহাঙ্গীর আলমের সাথে পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়। কিন্তু বিধিবাম! বিয়ের ৫ বছরের মাথায় স্বামী মারা যান। দাম্পত্ব্য জীবনে কোন সন্তান না হওয়ায় স্বামীর বাড়িতে থাকার জায়গাটুকু হয়নি। ফলে দরিদ্র বাবার বাড়িতে ফিরে আবার শুরু করেন জীবন যুদ্ধ। টিউশনি করে পড়া-লেখা চালিয়ে মাস্টার্স পাশ করেই মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আইজিএ প্রকল্পের ট্রেইনার পদে চাকুরী পান। বর্তমানে রামগঞ্জ উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে কর্মরত আছেন। অদম্য ইচ্ছেশক্তিই তাঁকে আজ স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করেছে।
আমেনা বেগম
উপজেলার আলীপুর গ্রামের আমেনা বেগমের স্বামী আবদুর রশিদ লোকাল বাসের লাইনম্যান হিসেবে ৫ হাজার টাকা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। জরাজীর্ণ বসতঘরে বৃষ্টি আসলে পানি পড়ে। স্থানীয় একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কিছু টাকা ঋন নিয়ে পৈত্রিক ৫ শতাংশ এবং স্বামীর ৪শতাংশ সম্পত্তিতে শুরু করেন হাঁস-মুরগী,কবুতর পালন। শুরু করেন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার যুদ্ধ। সন্তানদের পড়া-লেখা,সাংসারিক কাজ ও হাঁস-মুরগী,কবুতর পালনে কঠোর পরিশ্রম করে মাত্র কয়েক বছরে আমেনা স্বাবলম্বী নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। বর্তমানে সুন্দর একটি বসতঘর, ১৪টি হাঁস,১৫টি মুরগী,১২টি কবুতর,১৭টি ছাগল,৪টি গাভী,১টি ষাঁড় ও ৩টি গো-বাছুর রয়েছে আমেনা বেগমের।
রায়হান আক্তার
১৯৭৯ সালে ৯ম শ্রেনীর ছাত্রী থাকাবস্থায় রামগঞ্জ পৌর আঙ্গারপাড়া গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের সাথে বিয়ে হয় রায়হান আক্তারের। বিয়ের পর স্বামীর পরিবার নববধু রায়হান আক্তারের পড়া-লেখার করার পক্ষে না থাকলেও নিজের প্রবল ইচ্ছেশক্তিতে পড়া-লেখা অব্যাহত রাখেন তিনি।১৯৮২ সালে এইচএসসি পাশ করার পরেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকুরী পান। লক্ষ্মীপুর সরকারী কলেজ থেকে বি.এড ও এম.এস.এস পাশ করার পরে ২০০১ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করে। তার ছেলে কুমিল্লা ভিক্টোরীয়া কলেজ থেকে রসায়ন বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে ইসলামী ব্যাংক রামগঞ্জ শাখা সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন এবং মেয়েও কুমিল্লা ভিক্টোরীয়া কলেজ থেকে রসায়ন বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে সোনালী ব্যাংক রামগঞ্জ শাখা সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।
পারভিন আক্তার
রামগঞ্জ পৌর কাজিরখিল গ্রামের লুৎফর রহমান চট্টগ্রামে বিমান বাহিনীর সৈনিক হিসেবে কর্মরত থাকায় স্ত্রী পারভিন আক্তারকে কর্মস্থলে নিয়ে যান। স্বামীর বেতনের টাকা সংসারে নুন আনতে পান্তা পুরায় দেখে গৃহবধু পারভিন নিজের এক আত্মীর সহযোগীতা সেলাই কাজ শিখেন। ঘরে থেকেই আশ-পাশের নারীদের পোষাক সেলাইসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে থাকেন। ২০১১ সালে ভারতের গুজরাটে গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের মাধ্যমে ২১ দিন ব্যাপী নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষন গ্রহন করেন। তিনি এই পর্যন্ত ৩০০ নারীদের প্রশিক্ষন দিয়েছেন এবং নিজে ৭টি প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রতিকুলতা অতিক্রম করে বর্তমানে রামগঞ্জ পৌরসভার সংরক্ষিত কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মাত্র কয়েক বছরে কঠোর পরিশ্রমে পারভিন আক্তার জরাজীর্ণ বসতঘর থেকে দৃষ্টিনন্দন ঘরে বসবাস করার পাশাপাশি প্রতিষ্টিত নারী হিসেবে সম্মানিত ।