কর্মসূচি ‘ফাঁস’ হওয়ায় বিএনপিতে তোলপাড়*বেকায়দায় মহানগর নেতারা,অধিকাংশই আত্মগোপনে

ঢাকার উপনির্বাচন:

প্রকাশিত: ৭:৩৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৩, ২০২০ | আপডেট: ৭:৩৫:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৩, ২০২০

তারিক্যল ইসলাম।ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচনে ‘ভোট কারচুপির’ প্রতিবাদে রাজধানীতে হরতালসহ দেশব্যাপী কর্মসূচি দেয়ার পরিকল্পনা করেছিল বিএনপি। কিন্তু এটি ফাঁস হয়ে গেছে। কে, কারা কীভাবে ফাঁস করল তা নিয়ে দলের মধ্যে তোলপাড় চলছে।

দলের জ্যেষ্ঠ কয়েক নেতা এ বিষয়ে জানতেন। এখন এ নিয়ে একে অপরকে দোষারোপ করছেন, দেখছেন সন্দেহের চোখে। দলের এ অবস্থার মধ্যে ভোটের দিন বৃহস্পতিবার ঢাকায় ১০ বাসে আগুন দেয়ার ঘটনায় পুরো পরিস্থিতিই পাল্টে যায়। ফলে ওই কর্মসূচি আর ঘোষণা করা হয়নি। বৃহস্পতিবার রাতে দলের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা এটি ঘোষণা দিতে নিষেধ করেন। বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির কেন্দ্রীয় এক নেতা জানান, উপনির্বাচনের আগের দিন (বুধবার) সকালে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে ঢাকা-১৮ ও সিরাজগঞ্জ-১ আসনের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে নির্বাচনের দিন করণীয় নির্ধারণের পাশাপাশি কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়। নেতারা কঠোর কর্মসূচি দেয়ার বিষয়ে মত দেন। পরে তাদের মতামত বিএনপি হাইকমান্ডকে অবহিত করা হয়। ওই নেতা আরও জানান, তাদের পরিকল্পনা ছিল ভোটের দিন রাতে হরতালসহ তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এর পরপরই নগরের বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করবেন। সে প্রস্তুতিও অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ছিল।

পরে নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগের দাবিতে ধাপে ধাপে আরও কর্মসূচি দিয়ে মাঠে থাকার পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর পুরো পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। তাদের দাবি কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন তা জানেন না দলের কেউ। এখন মামলার কারণে উল্টো বেকায়দায় পড়েছেন নেতারা। ঢাকা মহানগরসহ বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা কেউ বাসায় থাকতে পারছেন না।

সূত্র জানায়, পরে নির্বাচনের দিন (বৃহস্পতিবার) রাতে বিএনপির সিনিয়র নেতারা ফের বৈঠক করেন। সে বৈঠকে কঠোর কোনো কর্মসূচি না দিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচির সিদ্ধান্ত হয়। জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতরের চলতি দায়িত্বে থাকা সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স যুগান্তরকে বলেন, হরতাল দেয়া হবে এমন কোনো সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আমার জানা নেই। তবে বৃহস্পতিবার রাতে সিনিয়র নেতারা বৈঠক করেছেন। সে বৈঠকে সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দুই দিনের বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা হয়েছে।

ঢাকা-১৮ আসনে ভোটের দিন অধিকাংশ স্থানীয় নেতা মাঠে ছিলেন না : এই আসনের প্রার্থিতা নিয়ে শুরু থেকেই জটিলতায় পড়ে বিএনপি। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকারের দিন বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দু’পক্ষের মধ্যে হামলায় দলের ১৭ নেতাকর্মী আহত হন। এজন্য বাকি মনোনয়নপ্রত্যাশীরা এসএম জাহাঙ্গীরকে দোষারোপ করে লিখিত অভিযোগ দেন দলের নীতিনির্ধারকদের কাছে। সেই ঘটনায় কাউকে দোষী না করে জাহাঙ্গীরকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। এতে ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বাসায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। তবে এ ঘটনায় ১৮ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়। যারা সবাই ছিলেন স্থানীয় পদধারী নেতা।

অভ্যন্তরীণ কোন্দল না মিটিয়ে প্রচার শুরু করলে স্থানীয় অধিকাংশ নেতাকর্মী অংশ নেয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহানগর উত্তরের এক নেতা বলেন, নির্বাচনের আগে হাজারও নেতাকর্মী নিয়ে প্রচার চালানো হল, অথচ নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে কাউকে পাওয়া যায়নি। এতে স্থানীয় জনগণের কাছে আমরা লজ্জা পেয়েছি। এছাড়া ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান স্থায়ী কমিটির কাউকে না করে চেয়ারপারসনের একজন উপদেষ্টাকে করা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।

ওই কমিটির সদস্যরা সাবেক ছাত্রনেতা হলেও তারা একই বলয়ের রাজনীতিতে যুক্ত। ওই নেতা বলেন, এছাড়া ৭ থানা ও ১৪ ওয়ার্ডের বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে প্রায় কাউকেই ভোটের দিন কেন্দ্রে পাওয়া যায়নি। অথচ তারা একেকটি কেন্দ্রের আহ্বায়কের দায়িত্বে ছিলেন। তাদের প্রধান কাজ ছিল ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট দেয়া ও তাদের কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া। শুধু উত্তরা পশ্চিম থানার স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি মোস্তফা কামাল হৃদয় ও খিলক্ষেত থানার ফজলুসহ কয়েকজন ভোট গণনা পর্যন্ত কেন্দ্রে ছিলেন। এছাড়া স্থানীয় নেতাকর্মীদের অধিকাংশ ভোট দিতে কেন্দ্রেই যায়নি।

অক্টোবরে অনুষ্ঠিত ঢাকা-৫ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপি গঠিত নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন সদস্য বলেন, প্রচারের ক্ষেত্রে এ আসনের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে বিএনপি দ্বিমুখী আচরণ করেছেন। ঢাকা-১৮ আসনের প্রার্থীর প্রচারে বিএনপিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো যেভাবে অংশ নিয়েছে ঠিক তার উল্টো চিত্র ছিল ঢাকা-৫ আসনে। সেখানে সালাহউদ্দিনকে কোনো সহযোগিতা করেনি অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সালাহউদ্দিনের ছেলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক তানভির আহমেদ রবিন কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

নেতারা আত্মগোপনে; নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের দাবি জোরালো হচ্ছে : এদিকে বাস পোড়ানোর মামলায় বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনসহ মহানগরের অধিকাংশ নেতারা এখন আত্মগোপনে। রাজধানীর বিমানবন্দর থানা বিএনপির এক নেতা জানান, ঢাকা-১৮ আসনে উপনির্বাচনের কয়েকদিন আগে আওয়ামী লীগের কার্যালয় পোড়ানোর ঘটনায় বিএনপির দুই শতাধিক স্থানীয় নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়। যে কারণে এখন এই আসনের নেতাকর্মীরা সবাই ঘরছাড়া। এই নির্বাচনে অংশ নিয়ে কোনো লাভই হয়নি বিএনপির, বরং স্থানীয় নেতাকর্মীরা এখন আরও বিপদে পড়েছেন।

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু  বলেন, শুধু শুধু অর্থ ও নিজের শক্তি ক্ষয় করার কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ ফলাফল যেখানে আগেই নির্ধারিত হয়ে থাকে, সেখানে এসব নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার পক্ষে আমি না। এতে কর্মীরা উজ্জীবিত হওয়া তো দূরের কথা, তারা আরও হতাশ হচ্ছেন। আসলে আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।