মৃত্যুপুরীতে নাটকের মঞ্চায়ন- অ আ আবীর আকাশ

প্রকাশিত: ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৫, ২০২০ | আপডেট: ১০:৩৬:পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৫, ২০২০

যে যাই বলুক লঞ্চডুবিতে ১৩ঘণ্টা পর উদ্ধার হওয়া সুমন বেপারি আর রানা প্লাজার ধসের ১৭ দিন পর ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া রেশমার কাহিনীক্রম একই। রানা প্লাজা ধ্বংসস্তূপ থেকে রেশমা উদ্ধার হওয়ার সময়েই এদেশের বৃহত্তর জনগণ ও পন্ডিতগন বলেছিল যে, রানা প্লাজা ধ্বংস প্রায় দেড় হাজার মানুষের মৃত্যুকে ভুলিয়ে দিতে ধ্বংসলীলার কথোপকথন থেকে মোড় ঘুরিয়ে নিতেই রেশমা নাটকের আবির্ভাব ঘটেছে।

এবার লঞ্চ ডুবিতে ৩২ জনের প্রাণহানির ঘটনা থেকে বাঙালিকে বের করে আনতেই সুমন বেপারী কাহিনীর সূত্রপাত! রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় ১৩শ’র বেশি নারী-পুরুষের মৃত্যু হয়। আমরা সেদিকে আফসোসের বদলে রেশমা রেশমা করতে থাকি। রেশমাকে নিয়ে ছুটতে গিয়ে ১৩শ মানুষকে নির্দ্বিধায়, বেমালুম ভুলে গেছি। অনেকেই রেশমাকে দেখতে গেছি কিন্তু হতাহতদের দেখতে বা আফসোস পর্যন্ত করেনি।

সে রকম আরেকটি নাটকের সৃষ্টি হয়েছে লঞ্চডুবির বেলায়। ১৩ ঘণ্টা পর কিভাবে অন্ধকারে পানির নিচ থেকে উঠে আসে সুমণ বেপারি! ৩২ জন মানুষের মৃত্যু, লাশের দীর্ঘ সারি রেখে আমাদেরকে সুমন বেপারি নাটকের দৃশ্য আকৃষ্ট করতে লাগলো। এসব কাহিনীর জন্ম হয় শুধুমাত্র অবোধ বাঙালিকে প্রকৃত ঘটনার আড়ালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সুমণ বেপারি ১৩ ঘন্টা পানির নিচে থাকলেও তাকে আদৌ অসুস্থ, ক্লান্ত, অজ্ঞান হতে দেখা যায়নি। সে স্বাভাবিক মানুষের মতোই ১৩ ঘণ্টা পানিতে ছিল। সাংবাদিকের কাছে বলেছে -১৩ ঘন্টা পানির নিচে থাকা তার কাছে ১০ মিনিটের মত। তাহলে বাঙালি কি কোনো ঘটনার আঁচ করতে পেরেছে! সে আরো বলেছে -এই ১৩ ঘন্টায় সে পানির নিচে থেকে পানি খেয়েছে, প্রস্রাব করেছে,নিশ্চিন্ত বসে আছে।

তারপরও আমরা কি সুন্দর ভাবে তাকে বিশ্বাস করি সে ডুবন্ত লঞ্চের যাত্রী। এই নিয়ে কেউ কেউ পক্ষে-বিপক্ষে সাফাই গাওয়া শুরু করেছে। হায় বাঙালি! হায় বিবেক!
নানা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি-

১. সুমন ১৩ ঘণ্টা পর ডুবন্ত লঞ্চ থেকে উদ্ধার হলে তার বিমূর্ষতার চাপ কি কেউ দেখতে পেয়েছিল?

২. প্রথমে তাকে বলা হয়েছিল উদ্ধারকারীদের একজন আহত হয়েছে। মুহূর্তেই সে ধারা বর্ণনার মোড় ঘুরিয়ে বলা হচ্ছে নতুন একজন যাত্রী উদ্ধার হল। তা কে তাকে উদ্ধার করল সে বিষয়ে অধ্যবধি কোন কিছুই প্রকাশ হলো না!

৩. উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি কি নিজে নিজে পানির নিচ থেকে, ডুবন্ত লঞ্চ থেকে বেরিয়ে এলো? যদি আসে তাহলে সে কেন সারা দিনের মধ্যে বেরিয়ে আসতে পারল না?

৪. সুমন বেপারি যদি হকার হয় তাহলে সে ধূর্ত চালাক ও বহু টেকনিক জানার কথা। যখন লঞ্চের উপর লঞ্চ উঠে গেল তখন অন্য সব যাত্রীরা হাউমাউ করে পানিতে তলিয়ে গেলেও হকার তো তলিয়ে যাওয়ার কথা নয়। সে জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসার কথা। সে তা পারল না কেন?

৫. ৩২ জন মানুষের লাশ, হাহাকার, স্বজনের বিলাপকে ম্রীয় করে দিয়ে শুধুমাত্র সুমন ব্যাপারিকে নিয়ে কেন উঠে পড়ে লেগেছে মিডিয়া? তাকে উদ্ধার হওয়া যাত্রী করে সমর্থন পাইয়ে দিতে কেন এত বেশি তার ফলাও প্রচার হচ্ছে?

৬. সে যদি সত্যিকারের ডুবন্ত লঞ্চের যাত্রী হয় তাহলে সে কেন মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যাবে? চিকিত্সকেরা বলছেন সে সুস্থ হয়েছে, তাকে রিলিজ দেয়া হয়েছে। তবে একজন ব্যক্তি ১৩ ঘণ্টা লঞ্চের ভেতর পানির নিচে থাকার পর এত দ্রুত কি করে সুস্থ হবেন? এত দ্রুত মিডিয়ায় সাথে কথা বলবেন? তা আদৌ সম্ভব কি?

৭. উদ্ধার হওয়া ব্যক্তির সাথে অন্য কারো চেহারা সাদৃশ্যতা রয়েছে কিনা তার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পুলিশ ফায়ার অগ্নি মাঝি জেলে কামার কুমারের যোগান দিতে হবে? এতে বড়গলা দেখাতে কার এত বেশি ইন্ধন রয়েছে?

৮. রেশমা সুমন বেপারী নামের নাটকের রচয়িতা কে সে মহান ব্যক্তি? যার নাটকের থিম এর সাথে নিরীহ মানুষের মৃত্যুর খেলা যুক্ত থাকে!

৯. এখন কোথায় রয়েছে এসব নাটকের নায়ক নায়িকা? রেশমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলেও সুমন ব্যাপারীর ভাগ্যাহত বলে জানা যায়। তার ভাগ্য কখন খুলবে? কখন হকার থেকে বড় কোন বাহিনীতে চাকরি হয়ে যাবে সাহসিকতা, দম আটকে রাখা, পানির নিচে বসে খাওয়া প্রস্রাব করার পুরস্কার হিসেবে!

১০. মৃত্যুপুরী নিয়ে নাটকের মূল পরিকল্পনাকারী কে? তার কি কোন হদিস মিলবে? বাঙালি জাতি কি সে মহান ব্যক্তির মুখ দর্শন করে সৌভাগ্য জাতিতে রূপান্তরিত হতে পারবে কখনো?

যাই হোক স্বর্ণ দিয়ে তৈরি খাবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা খেয়েছেন কিনা তা জানা না গেলেও হাসপাতালে শুধুমাত্র চিকিৎসকদের খাবার খরচ ২০ কোটি টাকার খবর জানতে পেরেছি। যে দেশে একটি বালিশ দোতালায় উঠানোর খরচ ৮শ টাকা, জানালার একটি পর্দার দাম ৩৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা সেদেশে কলাকে স্বর্ণ দিয়ে তৈরি করে খেতে অসুবিধা কোথায়?

গরিব একটি রাষ্ট্রকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্র বলে চালিয়ে দেয়া যেতে পারে, লুটপাট করে আত্মউন্নয়ন করা যেতে পারে, রাজনীতির সুবাদে বিদেশে বাড়ি-গাড়ি ব্যাংক ব্যালেন্স করা যেতে পারে, কল কারখানা তৈরি করা যেতে পারে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে দেশের উন্নয়ন করা যেতে পারে না। দেশের মানুষের জ্ঞান বিবেক-বুদ্ধি আটকে রাখা যাবে না। গলা টিপে ধরে রাখা যাবেনা, শ্বাসরোধ করে রাখা যাবে না।

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে দেশের উন্নয়ন হচ্ছে ঠিকই, তবে তা একসনা উন্নয়ন। মানে রাস্তা পুল কালভার্ট ভবন নির্মানে এত নিম্নমানের কাজ হয়, যে এবছর করলে দু’বছর পরে খসে পড়ে, তিন বছর পর সংস্কার করতে হয়। চার বছর পর সংস্কার অনুপযোগী হয়ে পড়ে, পাঁচ বছর পরে ঝুঁকিপূর্ণ আর ৬-৭ বছর পরে পুরোটাই ব্যবহার অনুপোযোগী। সরকারের স্বপ্ন আশা টেকসই উন্নয়ন পার্সেন্টিজ খাওয়া অসৎ চেয়ারঅলা, রাজনৈতিক
লোকের দুর্নীতি ও লুটপাটের কারনে ছাপা পড়ে যায়।

এই যদি দেশের উন্নয়ন হয় তাহলে মানুষের মৃত্যু নিয়ে খেলা তো মামুলিক বিষয়!

রেশমা সুমন নাটক মঞ্চায়ন শেষে এবার কোন নাটকের অপেক্ষায় বাংলাদেশ?

অ আ আবীর আকাশ :লেখক কবি প্রাবন্ধিক কলামিস্ট ও সাংবাদিক।সম্পাদক : আবীর আকাশ জার্নাল