‘বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বাংলাদেশীদের পাখির মত গুলি করে মারছে ভারত’ দাবি বিএনপির

প্রকাশিত: ৯:০৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২১, ২০২০ | আপডেট: ৯:০৯:অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২১, ২০২০

লন্ডন টাইমস নিউজ, বিবিসি বাংলা অবলম্বনে।বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ২০২০ সালের ১১ মাসে প্রাণ হারিয়েছেন মোট ৪১ জন বাংলাদেশী বেসামরিক নাগরিক।

‘সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে’ সীমান্তে এমন হত্যাকাণ্ড ঘটছে বলে মত বিএনপির।সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যার প্রতিবাদে সোমবার কেন্দ্রীয়সহ মহানগর ও জেলা কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন কর্মসূচি পালন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ।

সীমান্তে হত্যাকান্ডের জন্য বরাবরই “সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতিকে” দায়ী করে আসছে দলটি। এ প্রতিবাদ কর্মসূচিও ছিল পূর্বনির্ধারিত।তবে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত ভার্চুয়াল সামিটের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বিবিসিকে বলেন, এ ধরনের সামিট হলে জনগণের প্রত্যাশা থাকে যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কার্যকর আলোচনা হবে।

আলমগীর বলেন, শুধু এ সামিটে নয়, গত দশ বছরে সীমান্ত হত্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়লেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতেই এ কর্মসূচি বলে জানান তিনি।

ভার্চুয়াল বৈঠকের আগে দুই দেশের মধ্যে সাতটি সমঝোতা স্মারক (এমইও) স্বাক্ষর হয় ।

শুধুমাত্র রাজনৈতিক দল নয়, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বেসামরিক নাগরিকদের গুলি করে হত্যার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে মানবাধিকার সংগঠনসহ নানা মহল। বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যেও এ নিয়ে রয়েছে ক্ষোভ।

সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবিতে এ বছরের অক্টোবর মাসে জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে কুড়িগ্রাম সীমান্ত অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন হানিফ বাংলাদেশী। তার এই অভিনব প্রতিবাদে শামিল হয় নানা সংগঠনও।

তিনি বিবিসিকে বলেন, গরু পাচার, মাদক বা অন্যান্য যেসব অভিযোগের দোহাই দিয়ে সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা করা হয়, ওই একই কাজে তো সীমানার ওপারের মানুষও নিশ্চয়ই জড়িত। একা একা তো আর কিছু পাচার করা যায় না। তাহলে কাঁটাতারের ওই পারে কখনো এমন ঘটনা ঘটেনা কেন?

মহামারিতেও কমেনি সীমান্ত হত্যা

করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে এ বছর বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত যোগাযোগ বেশ কিছু মাস বন্ধ থাকলেও সীমান্তে হত্যার মত ঘটনা কমেনি।

ভারত বারবার সীমান্তে নন-লেথাল বা প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র ব্যবহারের অঙ্গীকার করলেও তা রক্ষা করেনি।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র-এর হিসেবে গত ৫ বছরে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষাবাহিনী–বিএসএফ কমপক্ষে ১৫৩ জন বাংলাদেশী নাগরিককে গুলি করে হত্যা করেছে।

সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ উপ-পরিচালক নীনা গোস্বামী বলেন, একটি প্রশিক্ষিত বাহিনীর সৈন্যরা কিন্তু চাইলেই এমনভাবে গুলি করতে পারে যাতে অপর ব্যক্তি মারা না যায়, কিন্তু তারা এমনভাবে গুলি করছে যাতে সাথে সাথে একজন নিরস্ত্র মানুষের মৃত্যু ঘটে–এটিই সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়।

বাংলাদেশ-ভারত ভার্চুয়াল সামিটে কী হল?

বাংলাদেশ ও ভারত পরস্পরকে বরাবরই ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ হিসেবে অভিহিত করে আসছে। গত ১৭ই ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত ভার্চুয়াল সামিটেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

ওই সামিটে গণভবন থেকে শেখ হাসিনা ও দিল্লি থেকে নরেন্দ্র মোদি বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বৈঠকের বিষয় অবহিত করতে সংবাদ সম্মেলন করেন।

তিনি জানান, দুই দেশের সীমান্তে হত্যা বন্ধের বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একমত হয়েছেন। সীমান্তে হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে অঙ্গীকার করেছেন।

সীমান্তে বিএসএফ মারণাস্ত্র ব্যবহার করবে না বলেও তিনি অঙ্গীকার করেছেন।

তবে, এর দুই দিন পরেই আরেকটি সংবাদ সম্মেলনে মি. মোমেন বলেন, ‘সীমান্তে যাতে একজনও মারা না যায়, সে ব্যাপারে ভারত অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হচ্ছে, সীমান্ত হত্যা ঘটছে। তাই আমরা উদ্বিগ্ন।’

বিজিবি মহাপরিচালকের বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা

সীমান্ত হত্যা বন্ধে কূটনৈতিকভাবে এবং বিজিবির পক্ষ থেকে চেষ্টা চলছে বলে জানান বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ সাফিনুল ইসলাম।

রোববার বিজিবি দিবস ২০২০ উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সীমান্তবর্তী জনগণকে শিক্ষাদীক্ষায় এবং অর্থনৈতিকভাবে যদি স্বাবলম্বী করতে পারি, তাহলেই সীমান্ত হত্যা কমে যাবে।’

বাংলাদেশ-ভারত সীমানার ২১১৬ মাইল জুড়ে ৩ মিটার উঁচু কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে ভারত।
ছবির ক্যাপশান,বাংলাদেশ-ভারত সীমানার ২১১৬ মাইল জুড়ে ৩ মিটার উঁচু কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে ভারত।

তাঁর এই বক্তব্যে সমালোচনার ঝড় ওঠে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

মানবাধিকার কর্মী নীনা গোস্বামী এমন বক্তব্যকে সরকারের নমনীয় পররাষ্ট্রনীতির বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন।

তিনি বলেন, এত বড় সীমান্তের বিপুল জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করতে তো অনেক সময় লাগবে, ততদিন কি তাহলে সীমান্তে হত্যা চলতেই থাকবে?

সীমান্তে হত্যা থামছে না কেন?

ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত কিংবা ভারত-চীন সীমান্তে দুই দেশের বৈরি সম্পর্কের কারণে চরম উত্তেজনা থাকলেও বেসামরিক লোকের প্রাণহানির ঘটনা সেখানে কদাচিৎ ঘটে।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মত এমন বিপদজনক সীমান্ত পুরো পৃথিবীতে বিরল – যেখানে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে কোন যুদ্ধ বা সংঘাত ছাড়াই এক দেশের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর হাতে অন্য দেশের এত বেসামরিক লোক প্রতি বছর প্রাণ হারায় ।

অ্যাকটিভিস্ট হানিফ বাংলাদেশী বলেন, আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে ক্ষমতায় থাকার জন্য ভারতের সাথে সুসম্পর্ক থাকা জরুরি। এইজন্যই সরকার নিজ দেশের নাগরিকদের এমন চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় নিশ্চুপ ।

সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে ভারত
ছবির ক্যাপশান,সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে ভারত

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ উপ-পরিচালক নীনা গোস্বামী মনে করেন, শুধু দুই দেশের সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আন্তরিকতা থাকলে চলবে না, ভারতকে বুঝতে হবে তাদের আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ তাদের সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ডেও যেন প্রতিফলিত হয় ।

দীর্ঘদিন ধরেই ভারত ও বাংলাদেশের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বৈঠক কিংবা সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর বৈঠকে বারবার সীমান্তে নন লেথাল বা প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

জরুরি মুহূর্ত ছাড়া এমন অস্ত্র ব্যবহার না করার অঙ্গীকারও করেছে বিএসএফ।

এসব প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও সীমান্তে বেসামরিক বাংলাদেশী হত্যার ঘটনা বারবার ঘটলেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো জোরালো প্রতিবাদ বা পদক্ষেপ- কোনটিই দেখা যায়নি।