ধোকা দিয়ে বোকা বানিয়ে অর্ধকোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা

প্রকাশিত: ৭:১০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৫, ২০২১ | আপডেট: ৭:১০:অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৫, ২০২১

রিপন আনসারী,মানিকগঞ্জ থেকে ।মানুষজন খুব সহজেই ধোকার কাছে বোকা হয়ে যায় সমাজে তা সচারাচরই দেখা যায়। তেমনি এক ভুয়া সমিতির ধোকার গ্যারাকলে পড়ে কয়েকশ মানুষের মাথায় হাত পড়েছে। সমিতির সদস্য বানিয়ে একেক জনকে এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকার বড় অংকের লোন দেয়ার প্রলোভনে অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ব্যবসায়ী সঞ্চয় সমিতি নামের ঔই ভুয়া এনজিওর পরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেন। ঘটনাটি ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ঘেষা মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী বাসষ্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায়। বর্তমানে ভুয়া ঔই সমিতির অফিসে ঝুলছে তালা।
বানিয়াজুরী এলাকায় ভুয়া ব্যবসায়ী সঞ্চয় সমিতির অফিসের সামনে গিয়ে দেখা যায় শতশত ভুক্তভোগী অসহায় নারী পুরুষের ভীড়। ঘটনা জানতে চাইলে অনেকেই কান্না জড়িত কণ্ঠে বলে উঠেন লোন দেয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়েছে কথিত সমিতির পরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেন।
খোজ খবর নিয়ে জানাগেছে,নিজের পরিচয় ও ঠিকানা গোপন রেখে জাহাঙ্গীর হোসেন নামে প্রতারক চলতি মাসের ১লা জানুয়ারী বানিয়াজুরী এলাকার আব্দুস সালাম মিয়ার বাড়ির কয়েকটি কক্ষ ভাড়া নেয়। খুব অল্প সময়ে স্থানীয় ও বাইরের জেলার বেশ কয়েকজন নারীকে তার সমিতিতে চাকুরী দেয়। মাঠ কর্মী হিসেবে বেশীর ভাগ নারী নিয়োগ পেলে তাদের দিয়ে প্রতারনার জ্বাল ফেলে। মুখের মিষ্টি কথায় আকৃষ্ট হয়ে মাত্র ১০-১২ দিনেই কয়েকশ নারী পুরুষ প্রতারনার ফাঁদে পড়ে সমিতির সদস্য হন। এরপর সদস্যদের মাঝে ব্যবসা করার জন্য জনপ্রতি এক লাখ এবং ওপরে ৫লাখ টাকা লোনের অফার দেয় প্রতারক জাহাঙ্গীর। সাধারন ও নিরিহ কয়েকশ মানুষ তার প্রতারনার ফাঁদে পা দিয়ে জামানত বাবদ লাখ লাখ টাকা খোয়ায়। সর্বনিম্ন ৮ হাজার এবং সর্বচ্চ ৩০ হাজার টাকা করে সদস্যদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় সমিতির পরিচালক । গত বৃহস্পতিবার সদস্যদের মাঝে লোন দেয়ার কথা ছিল। কিন্ত তার আগেই জাহাঙ্গীর মোটার অংকের টাকা বাগিয়ে নিয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। তার ঠিকানাও কারো জানা নেই। প্রতারনার ফাঁেদ পা দিয়েছে রিকসা চালক,ভ্যান চালক,ক্ষুদে দোকানী,কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষ। এছাড়া যার বাড়িটি সমিতির অফিস হিসেবে ভাড়া দেয়া হয়েছে সে বাড়ির মালিক সালাম মিয়াও জানানে ঔই প্রতারকের ঠিকানা। ভাড়া দেয়ার আগে যেসব নিয়ম কানুন থাকার কথা তার কোনটাই বাড়ির মালিক এসব ব্যাপারে অবগত হয়নি।
বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ বাড়ির মালিক সালাম মিয়াকে জিজ্ঞাবাদের জন্য থানায় নিয়ে গেলে জিজ্ঞাবাদ শেষে পরে তাকে ছেড়ে দেয়।
কথা হয় প্রতারনার শিকার বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর সাথে। ধোকার ফাঁদে পড়া তাদের একজন ঘিওর উপজেলার ছোট বৈন্যা গ্রামের ক্ষুদে মুদি দোকানদার লুৎফর মোল্লা। বলেন,৩ লাখ টাকা লোন পাওয়ার আশায় ৩০ হাজার টাকা জামানত দিয়েছি। ১৪ জানুয়ারী অর্থাৎ গত বৃহস্পতিবার লোন দেয়ার কথা ছিল। কিন্ত বুধবার অফিসে গিয়ে দেখি আমার মতো শতশত মানুষের ভীড়। সমিতির পরিচালক নাকি আমাদের সবার টাকা নিয়ে পালিয়েছে। কথাটি শোনার পরম যেনো মাথার ওপর আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতো অবস্থা।
বানিয়াজুরী বাষষ্ট্যান্ডের ব্যবসায়ী প্রদিপ সরকার বলেন,আমি ৩০ হাজার টাকা জমা দিয়েছি তিন লাখ টাকা লোন পাওয়ার আশায়। কিন্ত অফিসে এসে শুনি সবার টাকা নিয়ে সমিতির পরিচালক পালিয়ে গেছে।
ভ্যানচালক আমজাত হোসেন জানান,মানুষের কাছ থেকে ধার দেনা করে ৩০ হাজার টাকা জমা দেই। আমাকে ৩ লাখ টাকা দেবে। লোন নিতে অফিসে গিয়ে দেখি সর্বনাশ হয়ে গেছে । পালিয়ে গেছে সমিতির লোকজন। কিভাবে এই ৩০ হাজার টাকার ধার দেনা পরিশোধ করুম জানিনা।
ছোট বৈন্যা গ্রামের ভ্যান চালক দেলোয়ার হোসেন জানান,১লাখ টাকা দেয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকে ১০ হাজার এবং বই বাবদ দেড়শ টাকা নিয়েছে।
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার নবগ্রাম এলাকার গৃহবধু শিউলি আক্তার বলেন,দেড় লাখ টাকা লোন পাওয়ার আশায় ১০ হাজার টাকা জামানত দিয়েছি। তারা বলেছে এনজিওটি নতুন,তাই ১৪ জানুয়ারী উদ্বোধনের পর তারা আমাকে লোন দেবে। আমাদের পাশ বই ছবি সবই তারা নিয়ে এসেছে। কিন্ত এসে দেখি এনজিওর পরিচালক আমার মতো শতশত মানুষের টাকা পয়সা নিয়ে পালিয়ে গেছে। একই এলাকার সোবহান আলীর স্ত্রী রাহেল বলেন, আমাকে এক লাখ টাকা লোন দেয়ার কথা বলে ৮হাজার টাকা নিয়েছে। আমি গরীব মানুষ কৃষি কাজ করে খাই, লোনপাতি করে টাকা গুলো দিয়েছিলাম। এখন কিভাবে এই ৭ হাজার টাকার লোন পরিশোধ করবো জানিনা। এদের মতো কয়েকশ নারী পুরুষকে ধোকা দিয়ে বোকা বানিয়ে লাপাত্তা হয়েছে ভুয়া সমিতির পরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেন।
কথা হয় ্ওই ব্যবসায়ী সঞ্চয় সমিতির মাঠ কর্মী নিশা রানীর সাথে। গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ি জেলায়। চাকুরীর সুবাদে তরা গ্রামে বাসা ভাড়া করে থাকেন। বলেন, ১০ হাজার বেতনে মাঠ কর্মী হিসেবে এখানে কাজ করি। আমার মাধ্যমে ৬২ জনকে সদস্য বানিয়েছি। ২লাখ ৮৬ হাজার টাকা তাদের কাছ থেকে তুলে অফিসের পরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেনের হাতে তুলে দেই। একেক জনকে এক লাখ থেকে তিন লাখ টাকা লোন দেয়ার কথা। বৃহস্পতিবার তাদের লোন দেয়ার কথা থাকলেও তার আগেই টাকা পয়সা নিয়ে জাহাঙ্গীর সাহেব পালিয়ে গেছে। শুধু সদস্যদের ধোকা দেয়নি আমার মতো আরো বেশ কয়েকজন এখানে চাকুরী করছেন,তাদেরও ধোকা দিয়েছে। মাঠ কর্মী হিসেবে শাহানাজ এবং জান্নাত নামের দুই তরুনীকে চলতি মাসের ৭ তারিখে চাকুরী দিয়েছে সমিতির পরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেন। দুজনেই জানালেন,কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই আমাদের সাথে প্রতারনা করে পালিয়ে ্ওই ভন্ড। এখন মানুষজন আমাদেরকে দোষারোপ করছেন। কিন্ত আমরা সহজ সরল মনে চাকুরীতে ঢুকেছিলাম।
এদিকে যার বাড়িটি অফিস হিসেবে ভাড়া দেয়া হয়েছে সেই বাড়ির মালিক সালাম মিয়া কোন ধরনের ডিট কিংবা এভিডেন্টস ছাড়াই ভুয়া ্ওই সমিতির কথিত পরিচালকের কাছে বাড়িটি ভাড়া দেয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েছেন। পুলিশ বৃহস্পতিবার রাতে তাকে জিজ্ঞাবাদের জন্য থানায় নিয়ে গেলে জিজ্ঞাবাদ শেষে পরে তাকে ছেড়ে দেয়।
বাড়ির মালিক সালাম মিয়া বলেন,চলতি মাসের ১ জানুয়ারী তার বাড়িটি ভাড়া নেয় জাহাঙ্গীর হোসেন নামের এক ব্যাক্তি। ১৫ জানুয়ারী শুক্রবার ভাড়ার ডিট করার কথা ছিল। প্রতিমাসে ৮ হাজার টাকা করে ভাড়া ও তিন মাসের অীগ্রম টাকা দেয়ারও কথা। শুধু তাই নয় শুক্রবার অফিসটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে বলে ডেকোরেশস,আলোক সজ্জাসহ নানা আয়োজন করা হয়। কিন্ত তার আগেই এই ঘটনাটি ঘটেছে।
স্থানীয় বানিয়াজুরী ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মোখতারুজ্জামান বাবু বলেন, সরকারী নিয়ম এবং প্রশাসনের বিভিন্ন সময়ে নির্দেশনা থাকা সত্যেও বাড়ির মালিকরা ভাড়া দেয়ার সময় কোন ধরনের নিয়ম মানছে না । যার কারনে এই ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটে চলেছে।
এ ব্যাপারে ঘিওর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বিপ্লব জানান,ঘটনাটি জানার পরপরই আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম এবং বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। আমারা বিভিন্ন ভাবে কাজ চালিয়ে যাচিছ আশা করি শিঘ্রই মুল প্রতারককে আইনের আওতায় আনতে পারবো। এছাড়া যিনি বাড়িটি ভাড়া দিয়েছেন তিনি ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে কোন ধরনের ডকুমেন্টস রাখেনি। বাড়ি ভাড়া দিতে গেলে অবশ্যই থানাকে অবগত করা প্রয়োজন ছিল। সেটাও সে করেনি। আর কার্ডে যে নাম্বার লেখা আছে সে নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।