আশুলিয়ায় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে অধ্যক্ষ গ্রেফতার

প্রকাশিত: ৭:২২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২২, ২০২১ | আপডেট: ৭:২২:অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২২, ২০২১

২২ জানুয়ারি, ২০২১ |সাভার উপজেলার আশুলিয়ায় ১১ বছরের এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (২১ জানুয়ারি) গভীর রাতে রাজধানীর মিরপুরের কাফরুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। অভিযুক্ত ওই অধ্যক্ষের নাম তৌহিদ বিন আজহার (৬৫) তার বাড়ি নাটোর জেলায় বলে জানা গেছে। শুক্রবার (২২ জানুয়ারি) দুপুরে আটক অধ্যক্ষ তৌহিদ বিন আজহারকে ধর্ষণ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ জানায়, গত ১৫ জানুয়ারি আশুলিয়া ইউনিয়নের খেজুরবাগান এলাকায় হুরে জান্নাত মহিলা মাদ্রাসা নূরে মদিনা মাদ্রাসার আবাসিক এক ছাত্রীকে চা বানানোর কথা বলে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে যায় ওই প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ তৌহিদ বিন আজহার। সেখানে ১১ বছর বয়সী ওই শিশু ছাত্রীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ এবং বিষয়টি কাউকে না জানানোর জন্য ভয়ভীতি দেখানো হয়। একপর্যায়ে মাদ্রাসার হোস্টেলে থাকা ওই ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে সে তার সহপাঠীদের মাধ্যমে বিষয়টি চিরকুট লিখে মাবাবার কাছে পাঠায়। এঘটনায় গত বুধবার পরিবারের পক্ষ থেকে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আজহারকে প্রধান আসামি করে নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনে আশুলিয়া থানায় মামলা দায়ের করা হলে গা ঢাকা দেয় ধর্ষক অধ্যক্ষ। পরে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় রাজধানীর মিরপুরের কাফরুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে আটক করে পুলিশ।

বিষয়টি নিশ্চিত করে আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আলমামুন কবির জানান, ধর্ষণের শিকার শিশুটিকে উদ্ধার করে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি এবং অভিযুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষককে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

ধর্ষণ প্রতিরোধে আমাদের করণীয়

সামাজিক আইন ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে নারী-পুরুষের যে কেউ জোরপূর্বক যৌনাচারে লিপ্ত হওয়া নিষিদ্ধ। এ ধরনের কর্মে লিপ্ত হওয়ার নাম ধর্ষণ। প্রচলিত আইনে এ ধরনের প্রমাণিত অপরাধের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড হওয়ার কথা রয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাস্তবায়নের দাবি এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ সমাজের আনাচকানাচে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলছে। নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে সব সময়। শিশু, যুবা, বৃদ্ধা কেউ বাদ যাচ্ছে না এ ধরনের ভয়ানক বিপদ থেকে। ধর্ষণের মতো বিপদ যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না আমাদের। যে কোনো পরিস্থিতিতে নিরাপদে থাকার দায়িত্ব প্রথমত ব্যক্তির নিজের। যৌন সহিংসতা, এর নেতিবাচক প্রভাব, শাস্তি এবং করণীয় সম্পর্কে সঠিক তথ্য এবং সচেতনতা প্রাক-কৈশোর ছেলেমেয়েদের থাকা জরুরি, কারণ সচেতনতা মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে। এই বয়সেই পরিবারে এবং স্কুলে ‘লিঙ্গের ভিন্নতা/যৌনতা এবং সম্পর্ক (sex and relationship) বিষয়ে ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদান সময়ের দাবি। এতে সুস্থ সম্পর্ক বিষয়ে ধারণা এবং বিপরীত লিঙ্গের প্রতি সম্মান-সহানুভূতি তৈরি হয়। যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যক্তির করণীয়সমূহঃ

প্রথমত, ধর্ষণের ঘটনা ঘটার আশঙ্কা আছে এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা। যেমন, অপরিচিত ব্যক্তি, অনিরাপদ/নিরিবিলি স্থান। পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিচিত-অপরিচিত ব্যক্তির যৌন উদ্দেশ্য সম্পর্কে বুঝতে চেষ্টা করা এবং সে অনুযায়ী নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া। আস্থাশীল বন্ধু তৈরি করা এবং দলে চলাফেরা করার চেষ্টা করা বিশেষ করে সন্ধ্যার পর। বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রস্থান করা, দৌড়ানো এবং যত জোরে সম্ভব চিত্কার করে আশপাশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। মরিচগুঁড়ো/ঝাঁঝালো স্প্রে, প্রয়োজনীয় আত্মরক্ষামূলক হাতিয়ার সঙ্গে রাখা এবং প্রয়োজনে তা ব্যবহার করা। বিপদে মাথা ঠাণ্ডা রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার চেষ্টা করা। যেমন, আক্রান্ত হবার আগেই চাবির গোছা, ব্যাগ বা হাতের কাছে যা আছে তা দিয়ে আক্রমণকারীকে আঘাত করা।

ধর্ষণ-পরবর্তী করণীয় এবং বিচার

ধর্ষণের শিকার নারীকে সহানুভূতির সঙ্গে সহযোগিতা করা একটা মানবিক দায়িত্ব। কারণ ধর্ষণ নারীর দোষে ঘটে না, বরং ধর্ষক একজন ভয়ংকর অপরাধী। এ সময় যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার চাপ সহ্য করা অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে, যা আত্মহত্যায় প্ররোচিত করতে পারে। জীবন অনেক মূল্যবান, তাছাড়া আত্মহত্যা কখনো সমস্যার সমাধান নয়। ধর্ষণের শিকার নারীর কঠোর নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা নিশ্চিত করা অতি জরুরি। তার পরিচয়মূলক তথ্য কখনোই প্রকাশ করা যাবে না। ধর্ষণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ, কিন্তু ভুক্তভোগীর জীবনে ধর্ষণের তাত্ক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক-মানসিক-সামাজিক প্রভাবের তুলনায় প্রচলিত শাস্তির ধরনে পরিবর্তন দরকার মনে করি। উন্নত দেশে অপরাধীদের চলাফেরা নজরদারির জন্য এ ধরনের ডিভাইস ব্যবহার করা হয়। ধর্ষণকারীর জন্য ডিভাইসটিতে বিশেষ শব্দ যুক্ত থাকবে এবং ডিভাইসটি হাতঘড়ির মতো ব্যবহার করতে হবে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী তালাবদ্ধ করে দেবেন। এ ডিভাইস থেকে সব সময় শব্দটি সৃষ্টি হবে, যাতে নারীরা এ বিশেষ শব্দে সাবধান হয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে পারেন। চিহ্নিত অপরাধী হিসেবে সে সমাজে ঘৃণিত হবে।

দেশে শিশু ধর্ষণের পরিমাণ দিনদিন বেড়েই চলেছে। শিশুরা হলো জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার মূল হাতিয়ার। কিন্তু প্রতিদিনের খবরের কাগজে শিশু ধর্ষণের মতো ঘৃণিত অপরাধের কথা উঠে আসছে। বেশির ভাগ শিশুই ধর্ষিত হচ্ছে তাদের গৃহশিক্ষক, নিকটাত্মীয় এবং প্রতিবেশীদের দ্বারা। শিশু ধর্ষণ সমাধানে করণীয় হচ্ছে—প্রথমেই যে কাজটি করতে হবে তা হলো, শিশু ধর্ষণের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের সকলের মন-মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। তৃতীয়ত, এই জঘন্য অপরাধের জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে, শিশু ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড। আমাদের দেশেও ১২ বছরের কম বয়সি মেয়েদের ধর্ষণ করলে মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ হ্রাস পাবে। ইদানীং পত্রিকার পাতা খুললে কিংবা টিভির সংবাদের দিকে দৃষ্টিপাত করলে প্রায়ই চোখে পড়ে ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যাবিষয়ক খবরাখবর। এ সংক্রান্ত খবর পড়তে পড়তে মানুষের মন যেন আজ রীতিমতো বিষিয়ে উঠেছে। ধর্ষণের হাত থেকে প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে, গৃহবধূ, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্রী থেকে শুরু করে চার-পাঁচ বছরের কোমলমতি শিশু পর্যন্ত রেহাই পাচ্ছে না। আর বিয়ের প্রলোভন দেখিয়েও ধর্ষণ করার ঘটনা তো সমাজে অহরহই ঘটে চলেছে। আমাদের সমাজটা পচে গিয়েছে। কোথাও কোনো নারী নিরাপদ নয়। গণধর্ষণের হার বেড়েই চলেছে। এর প্রতিকার পেতে হলে সব ধর্ষককে ফাঁসি দিতে হবে। নইলে তাদেরকে চিরতরের জন্য খোঁজা করে দিতে হবে এবং সবার ভেতর সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

লেখক : তরুণ কলামিস্ট ও সাবেক শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ধর্ষণ প্রতিরোধে ইসলামি নির্দেশনা

মুফতি জাকারিয়া মাসউদ

ধর্ষণ ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক অপরাধ। ধর্ষণ থেকে ধর্ষকের যেমন বেঁচে থাকা জরুরি, তেমনই ধর্ষণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে নারীকেও ভূমিকা রাখতে হবে এবং ধর্ষণ চেষ্টাকালে নারী কারো নিকট সাহায্য প্রার্থী হলে সাহায্যও করতে হবে।

আর এ সময় হত্যার মতো কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেলে তাতেও সমর্থন দিয়েছে ইসলাম। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিরোধকারীদের জন্য রয়েছে পুরস্কার।

হযরত সাঈদ ইবনে জায়েদ (রা) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে যে ব্যক্তি নিহত হয়েছে সে শহিদ। জীবন রক্ষা করতে গিয়ে যে ব্যক্তি নিহত হয়েছে সে শহিদ। দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে যে ব্যক্তি নিহত হয়েছে সে শহিদ। আর সম্ভ্রম রক্ষা করতে গিয়ে যে ব্যক্তি নিহত হয়েছে সেও শহিদ। (আবু দাউদ, তিরমিযি)

ধর্ষণ সৃষ্টি হয় অবৈধ কামভাব (যৌনচাহিদা) তাড়িত বিষয় থেকে। এটি মূলত তারাই করতে পারে যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় নেই। ধর্ষণ, ব্যভিচারসহ সব প্রকারের অপকর্ম থেকে বাঁচার সহজ উপায় হলো অন্তরে আল্লাহর ভয়কে ধারণ করা। আর আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হবে তার ক্ষমতা এবং অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞাত হলে। আল্লাহ সবসময় সর্বত্র পর্যবেক্ষণকারী এবং প্রত্যেক বিষয়ের বিচারক। এই বিশ্বাস যদি কোনো ব্যক্তি তার অন্তরে ধারণ করতে পারে তাহলে নিশ্চিতভাবে কোনো অন্যায়ে লিপ্ত হতে পারে না। কেননা কোনো ব্যক্তি প্রশাসনের সামনে অপরাধ করে না। কারণ তার প্রশাসনের ক্ষমতা সম্পর্কে জ্ঞান আছে।

আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, আর আল্লাহকে ভয় করতে থাকো। সন্দেহাতীতভাবে জেনে রাখো আল্লাহর আজাব বড়ই কঠিন। (সুরা বাকারা,আয়াত ১৯৬)

ইসলামে ধর্ষকের শাস্তি :ইসলামে যেমন ব্যভিচার বা জেনার শাস্তি রয়েছে, তেমনি জেনার সমগোত্রীয় ধর্ষণেরও কঠোর শাস্তির বিধান রেখেছে ইসলাম। তবে ব্যভিচার সংঘটিত হয় উভয়ের সম্মতিতে, তাই ব্যভিচারের ক্ষেত্রে উভয়েরই শাস্তি রয়েছে। আর ধর্ষণ সংঘটিত হয় এক পক্ষের বল প্রয়োগের মাধ্যমে, তাই এ ক্ষেত্রে শাস্তি হবে ধর্ষকের, ধর্ষিতার নয়। কেননা ধর্ষিতা এখানে জুলুমের শিকার, তথা মাজলুম বা অত্যাচারিত আর ইসলামে মাজলুমের কোনো শাস্তি নেই। ধর্ষণের ক্ষেত্রে দুইটি বিষয় সংঘটিত হয়। ১) জিনা বা ব্যভিচার। ২) বল প্রয়োগে সম্ভ্রম লুণ্ঠন।

ইসলামে ব্যভিচারের যে শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে তা হলো দুই প্রকার। অবিবাহিত নারী-পুরুষের জন্য ১০০ বেত্রাঘাত এবং বিবাহিত নারী-পুরুষের জন্য পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ, তাদের প্রত্যেককে ১০০ করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকর করণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকো। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। (সুরা নুর, আয়াত :০২)

হাদিসে রাসুল (স.) বলেন, অবিবাহিত পুরুষ-নারীর ক্ষেত্রে শাস্তি ১০০ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের জন্য দেশান্তর । আর বিবাহিত পুরুষ-নারীর ক্ষেত্রে ১০০ বেত্রাঘাত এবং রজম মেরে হত্যা। (মুসলিম)

এ হাদিসের আলোকে ইসলামি আইন বিশারদগণ ভিন্ন ভিন্ন মতের দিকে গেছেন। কোনো বিশারদ ব্যভিচারীর শাস্তি দুইটিকেই গ্রহণ করেছেন। অর্থাত্ বেত্রাঘাত এবং দেশান্তর। তবে হানাফি মাজহাবের আইনবিদগণ কোরআন বর্ণিত শাস্তির মতটিকেই গ্রহণ করেছেন। ধর্ষণের মধ্যে যেহেতু দুইটি অপরাধ পাওয়া যায় সুতরাং প্রথমটির জন্য ব্যভিচারের শাস্তিই হবে। আর পরের অপরাধের জন্য কোনো কোনো আলেম মুহারাবার শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন।

মুহারাবার শাস্তি হলো—অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ডাকাতির যে শাস্তি তাই। মুহারাবার শাস্তির ব্যাপারে কোরআন পাকে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের সঙ্গে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে, তাদেরকে হত্যা করা হবে, অথবা শূলে চড়ানো হবে, অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়া হবে, অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হলো—তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। (সুরা মায়িদা, আয়াত :৩৩)

এ আয়াতের ভিত্তিতে বিচারক ধর্ষকের জন্য ব্যভিচারের শাস্তির সঙ্গে উল্লেখিত চার ধরনের শাস্তির যে কোনোটি দিতে পারেন। তবে যখন সমাজে ধর্ষণ মহামারি রূপ ধারণ করে, তখন সমাজকে কলুষমুক্ত করতে মুহারাবার মতো কঠোর শাস্তি দেওয়া জরুরি। আর ধর্ষণের কারণে অথবা ধর্ষণ পরবর্তী হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলে তার একমাত্র শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড প্রদান।

ধর্ষণ প্রতিরোধে বিবাহের গুরুত্ব :আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমাদের মধ্যে যারা ‘আইয়িম’ বিপত্নীক বা বিধবা মহিলা তাদের বিবাহ সম্পাদন কর এবং তোমাদের দাসদাসীদের মধ্যে যারা সত্ তাদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাব দূর করে দিবেন। আল্লাহ তো প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। ( সুরা আন নুর, আয়াত ৩২) পরের আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, যাদের বিয়ের সামর্থ্য নেই আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে। (সুরা আন নুর, আয়াত ৩৩)।

বিবাহের ব্যাপারে ইসলামি আইনবিদদের অভিমত হলো—যে ব্যক্তি বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে তার জন্য বিয়ে করা ওয়াজিব। দলিল হিসেবে তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিম্নের বানিটি গ্রহণ করেছেন, হে যুবকের দল তোমাদের মধ্যে যে বিবাহ করার ক্ষমতা রাখে সে যেন বিয়ে করে। বিয়ে হলো—দৃষ্টিকে নিম্নমুখীকারী এবং লজ্জাস্থানকে রক্ষাকারী। আর যে বিয়ে করার ক্ষমতা রাখে না, সে যেন সিয়াম পালন করে। এটাই তার জন্য আত্মরক্ষাকারী। (মুসলিম, ২/১০১৯) তাফসিরে ইবনে কাসীর।

উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহতায়ালা বিবাহের প্রতি উত্সাহ প্রদান করে বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি বিবাহ করে তাকে আল্লাহতায়ালা নিজ অনুগ্রহে সম্পদশালী করে দিবেন। আর বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, বিবাহ হলো দৃষ্টির ও লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী সুতরাং যখন কোনো পুরুষ-নারীর বিবাহের প্রয়োজন সঠিক সময়ে বিবাহ হলে তার দ্বারা সমাজে জেনা, ধর্ষণ বা মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার মতো অপরাধ সংঘটিত হবে না।

ধর্ষিতার প্রতি ইসলামিক দৃষ্টি :বর্তমান সমাজ ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীকে বাঁকা চোখে দেখে। তার প্রতি অবহেলা ও নানান কটূক্তি করে থাকে যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কেননা ধর্ষিতা যেহেতু অত্যাচারিত, তাই ইসলাম তাকে শাস্তি থেকে যেমন বিরত রেখেছে, তেমনই তার প্রতি খারাপ দৃষ্টিভঙ্গি দিতেও নিষেধ করেছে।

এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেন, নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা আমার উম্মতের ভুলবসত করা অপরাধ, ভুলে যাওয়া কাজ এবং বলপ্রয়োগকৃত বিষয় ক্ষমা করে দিয়েছেন। (ইবনে মাজাহ) অর্থাত্ এখানে যে ব্যক্তি সত্যিকারের ধর্ষণের শিকার তার গুনাহ হয় না । তাহলে তাকে যারা কটূক্তি করবে তারাই অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে।

মোটকথা, সমাজে যখন ধর্ষণ মহামারি আকার ধারণ করবে তখন সব ধরনের আইন প্রয়োগসহ প্রতিরোধ গড়ে তোলে এ মহামারি থেকে সমাজকে রক্ষা করা সবাইর কর্তব্য। তাই আসুন আমরা এ ঘৃণ্য অপরাধের বিরুদ্ধে নিজ নিজ স্থান থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে তওফিক দান করেন। আমিন

 

লেখক : প্রধান মুফতি, কাশফুল উলুম নেছারীয়া মাদ্রাসা কমপ্ল্লেক্স, নেছারীবাদ, সিংড়া, নাটোর ও খতিব, চকসিংড়া উত্তরপাড়া জামে মসজিদ, সিংড়া, নাটোর