আল্লাহ যাদেরকে ভালোবাসেন (পর্ব এক)

প্রকাশিত: ৯:১১ অপরাহ্ণ, জুলাই ৯, ২০২০ | আপডেট: ১১:২১:পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২০

মুফতি মুহাম্মাদ আকতার আল-হুসাইন।

ভালোবাসা একটি গোপন বিষয়। কারো প্রতি কারো কতটুকু ভালোবাসা আছে তা পরিমাপ করা খুব কঠিন। তবে কিছু কিছু মাপকাঠি আছে যেগুলো দিয়ে অনেক সময় বুঝা যায় বা অনুমান করা যায় কতটুকু ভালোবাসা আছে। আর তার মধ্যে অন্যতম হলো একে অপরের অবস্থা ও পারস্পরিক ব্যবহারের চিহ্ন ও লক্ষণাদি দেখে বা জেনে নেয়া। কিন্ত আল্লাহ তায়ালা কাদের ভালবাসেন সে মাপকাঠি তিনি নিজেই বলে দিয়েছেন। সেগুলো যদি কোন মানুষের মধ্যে থাকে তাহলে সে আল্লাহর ভালবাসায় শিক্ত হবে। তাহলে আসুন দেখি আমাদের মধ্যে সেই মাপকাঠি গুলো আছে কি না?

🕋 প্রথম মাপকাঠি-

——-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসরণ করা।

আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসার পাত্র হওয়ার জন্য প্রথম যে যোগ্যতা বা মাপকাঠি থাকতে হবে সেটা হলো তার হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসরণ করা। সূরা আল-ইমরানের ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-“হে রাসূল! আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর। তাহলে আল্লাহ তায়ালাও তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দেবেন”।

🔰 যারা আল্লাহ তায়ালা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে প্রকৃতপক্ষে ভালোবাসে এ আয়াত তাদের জন্য মাপকাঠি। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ হল একচ্ছত্রভাবে তাঁর অনুসরণ করা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে অনুসরণ করা আল্লাহ তায়ালাকে অনুসরণ করার শামিল। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে ভালোবাসা হলো আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসার নামান্তর। সূরা নিসার ৮০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “কেউ রাসূলের আনুগত্য করলে সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল”। অবার সূরা মুহাম্মাদের ৩৩ নম্বর আয়াতে বলেছেন- “আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য স্বীকার কর। আর নিজেদের আমল নষ্ট কর‎ না”। অন্যত্র আল্লাহ বলেছেন- “তোমরা আল্লাহ এবং রাসূলের আনুগত্য কর”।

⬛ এরূপ অনেক আয়াতে একমাত্র আল্লাহ তায়ালা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসরণ করার গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আবার এ সমস্ত আয়াতের পক্ষে অনেক হাদীস ও রয়েছে। সহিহ বুখারী শরীফের হাদিসে এসেছে- “হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- আমার সকল উম্মতই জান্নাতে প্রবেশ করবে, কিন্তু যে অস্বীকার করে। তারা বললেন, কে অস্বীকার করবে। তিনি বললেন, যারা আমার অনুসরণ করবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার অবাধ্য হবে সেই অস্বীকার করবে”।

⬛ এ রকম আয়াতে কারীমা ও হাদীসের আলোকে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য করার সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনুগত্য করার প্রতি যে গুরুত্বারোপ হয়েছে তা বাস্তবায়ন করার একমাত্র পথ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন এবং সুন্নাহ হিসেবে যা রেখে গেছেন এসব অনুসরণ করে মেনে চলা। আর এর মধ্যেই রয়েছে আমাদের মুক্তিরপথ ও আল্লাহর ভালোবাসার পাত্র হওয়ার পথ। সূরা হাশরের ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “রাসূলুল্লাহ যা নিয়ে এসেছেন, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন, তা হতে বিরত থাক। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর”।

🔰 মুয়াত্ত্বা- ইমাম মালিকের মধ্য এসেছে- “হযরত মালিক ইবনে আনাস (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- আমি তোমাদের মধ্যে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতক্ষণ তোমরা সে দুটি জিনিস আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না। তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহ”।

⬛ সুতরাং আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ ও সুন্নাতের বাস্তবায়ন করতে হবে। আর এটা করলেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রকৃত অনুসরণ ও অনুকরণ করা হবে। এবং আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া যাবে। পক্ষান্তরে যারা দল, মত ও তরিকার দোহাই দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রকৃত অনুরসণ থেকে বিমুখ হবে তারা এমন কুফরীর পর্যায়ে চলে যাবে, যে কুফরীর কারণে আল্লাহ তায়ালা কাফিরদের ভালবাসেন না।

🕋 দ্বিতীয় মাপকাঠি-

———————সৎকর্মশীল হওয়া

আল্লাহ তায়ালা যাদের ভালোবাসেন তাদের দুই নম্বর মাপকাঠি হচ্ছে। সৎকর্ম করা। সূরা বাকারার ১৯৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর এবং নিজ হাতে নিজদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না। আর সৎকর্ম কর। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদেরকে ভালোবাসেন”।

🔰 হযরত ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন- এ আয়াতটি ব্যয় করার ব্যাপারে নাযিল হয়। (বুখারী শরীফ)

🔰 হযরত আবূ আইয়ূব আল-আনসারী (রাঃ) বলেন এ আয়াতটি আমাদের আনসারদের ব্যাপারে নাযিল হয়। আবু দাউদ শরীফের হাদিসে এসেছে – “হযরত আবূ ইমরান আসলাম ইবনে ইয়াযীদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা মাদীনাহ হতে কনস্টান্টিনোপলে অভিমুখে বের হলাম। আমাদের সেনাপতি ছিলেন হযরত আব্দুর রাহমান ইবনু খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রাঃ)। রোমের সৈন্যবাহিনী শহরের প্রাচীর-বেষ্টনীর বহির্ভাগ থেকে প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত ছিল। জনৈক মুসলিম সৈনিক শত্রুবাহিনীর উপর হামলা করে বসলো। লোকেরা বললো, হায়, থামো! লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। সে নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তখন হযরত আবূ আইউব আল-আনসারী (রাঃ) বললেন, এ আয়াত আমাদের আনসার সম্প্রদায় সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছিলো। আল্লাহ যখন তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সাহায্য করলেন এবং দ্বীন ইসলামকে বিজয়ী করলেন, আমরা মনে মনে বললাম, এসো! এবার আমরা নিজেদের ধন-সম্পদ দেখাশুনা ও ঠিকঠাকে মনোযোগ দেই। মহান আল্লাহ তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করলেন- “তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করো এবং নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না”। (সূরাহ আল-বাক্বারাহ, আয়াত ১৯৫)। এখানে আমাদের নিজেদের হাতকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করার অর্থ হচ্ছে, ধন-সম্পদ নিয়েই ব্যস্ত থাকা, এর পরিবৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করা এবং জিহাদ ছেড়ে দেয়া। হযরত আবূ ইমরান (রাঃ) বলেন, এরপর থেকে হযরত আবূ আইউব আল-আনসারী (রাঃ) সর্বদা আল্লাহর পথে জিহাদে শরীক হতেন, অবশেষে তিনি জিহাদ করতে করতে কুস্ত্তনতুনিয়াতে সমাহিত হন।

🔰 হযরত হাসান বসরী (রহঃ) বলেন, এখানে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া হল, কৃপণতা করা।

🔰 নুমান বিন বাশির (রহঃ) বলেন, এটা হল, ঐ ব্যক্তির ক্ষেত্রে যে গুনাহ করেছে অতঃপর এ বিশ্বাস করে যে, তাকে ক্ষমা করা হবে না, তখন সে আরো বেশি বেশি গুনাহ করে নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। (তাফসীর ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)

⚠️ এ আয়াত দিয়ে অনেকেই দলিল পেশ করেন, এমন কিছু খাওয়া ও পান করা যা নিজের শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয় তা হারাম। যেমন ধূমপান করা ও অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্য ইত্যাদি।

🔰 এখানে “তোমরা এহসান কর” এর দ্বারা সকল প্রকার ইহসান অন্তর্ভুক্ত। কেননা এটা বিশেষ কোন বস্তুর সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া হয়নি। অতএব সম্পদের ক্ষেত্রে ইহসান, সম্মানের ক্ষেত্রে ইহসান ও শাফায়াতের ক্ষেত্রে ইহসান সবই শামিল। (তাফসীরে ফাতহুল মাজিদ)

🔰সকল ধরনের ইবাদাতের ক্ষেত্রে ইহসান কি বা মুহসিন কারা সে বিষয়ে সহিহ বুখারী ও মুসলিম শরীফের হাদীসে জীবরাঈলে এসেছে- “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- ইহসান হচ্ছে আল্লাহর ইবাদাত এমন নিষ্ঠার সঙ্গে করবে, যেন তুমি তাঁকে দেখছ। আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তবে (জানবে) আল্লাহ তোমাকে দেখছেন”।

⬛ এছাড়াও সৎকর্মশীলদের ভালোবাসার কথা আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-ইমরানের ১৩৪ ও ১৪৮ এবং সূরা মায়িদার ৯৩ নম্বর আয়াতসহ কুরআনুল কারীমের বহু জায়গাতেই সৎকর্মশীলদের গুনগানও পুরষ্কারের কথা বর্ণিত হয়েছে।

————পরের পর্ব আসবে ইনশা আল্লাহ

 

লেখক: ইমাম ও খতিব ওল্ডহাম জামে মাসজিদ, যুক্তরাজ্য