রিজেন্ট সিলগালা করার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন দিয়েছিল সাহেদ

প্রকাশিত: ৭:৩৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২০ | আপডেট: ৭:৩৬:অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২০

আজাদ সুলায়মান ॥ র‌্যাবের অভিযানের সময় রিজেন্ট হাসপাতাল সিলগালা করার বিষয়টি আঁচ করতে পেরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন দিয়েছিলেন ভয়ঙ্কর প্রতারক সাহেদ। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে পাত্তা না দিয়ে উল্টো শাসিয়ে বলেছিলেন, নিশ্চয় আপনি অপরাধ করেছেন, সে জন্য সিলগালা করা হচ্ছে।

এদিকে সাহেদের সহযোগী তরিকুল ইসলাম ওরফে তারেক শিবলীর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। তার কাছ থেকে ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে উত্তরা পশ্চিম থানার পুলিশ। র‌্যাব জানিয়েছে, সাহেদের আরও দুই ঘনিষ্ঠজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আজকালের মধ্যে তার স্ত্রী সাদিয়া আরাবিয়া রিম্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তলব করা হতে পারে। বিশেষ করে সাহেদের বাবা মারা যাবার পর গত দুদিন সাহেদের স্বজনদের ওপর নজরদারি রাখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। স্বজনদের মারফত জানা গেছে, পরিবারের ধারণা ছিল সাহেদ হয়তো আত্মসমপর্ণ করে শেষ বারের মতো বাবা সিরাজুল ইসলামের মরদেহ দেখতে আসতে পারেন। কিন্তু সেটা আর সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর সাহেদের বাবাকে আজিমপুর গোরস্থানে দাফন করা হয়। বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিরাজুল ইসলাম মারা যান। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডাঃ আশীষ কুমার চক্রবর্তী জানান, সিরাজুল ইসলাম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। তিনি তাদের হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য জটিলতা ছিল। গত ৪ জুলাই সাহেদ তার বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করান। ভর্তির পর প্রথম দুইদিন সাহেদ তার বাবার খোঁজ নিয়েছেন। এরপর তার হাসপাতালে র‌্যাবের অভিযানের পর থেকে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে আত্মগোপনে থেকেও হাসপাতালের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতেন বলে জানিয়েছে হাসপাতাল সূত্র।

এদিকে পলাতক সাহেদকে খুব শীঘ্রই গ্রেফতার করা সম্ভব হবে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। শুক্রবার ধানম-ির নিজ বাসায় সাংবাদিকদের সামনে এ ঘটনায় তিনি বেশ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানিয়েছেন, তিনি নিজে একজন রোগীকে ভর্তি করার জন্য ক’দিন আগে সাহেদকে ফোন করেছিলেন। সে সুবাদে সাহেদ ঘটনার দিন ৭ জুলাই নিরুপায় তাকে ফোন করে র‌্যাবের অভিযান সম্পর্কে নালিশ করেন এবং সিলগালার কথা জানান। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কঠোর ভাষায় জবাব দেন,‘আপনি নিশ্চয়ই কোন অন্যায় কাজ করেছেন, এজন্য সিল করছে। বিনা কারণে তো সিল করে না।

সাহেদের গ্রেফতারের বিষয়ে শীঘ্রই তথ্য দিতে পারবেন বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন’ যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, অপরাধ প্রমাণ হলে সাহেদকে ছাড় দেয়ার প্রশ্নই আসে না। তিনি বলেন, আমি ফোন দিয়ে তার হাসপাতালে রোগী ভর্তি করি, সেই সুবাধে আমাকে ফোন দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, হাসপাতাল সিল করে দিচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সে বলল আমি তাহলে কী করব? আমি বললাম, হয় আপনি ফেস করেন, নতুবা কোর্টে গিয়ে আপনার যদি কিছু বলার থাকে কোর্টে যান। এইটুকুই আমি বলেছি।

আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) তার সংসদ সদস্যকে ছাড় দেননি, তার দলীয় নেতাদেরও তিনি ছাড় দিচ্ছেন না। যার (শাহেদ) কথা বলেছেন, যদি প্রমাণ হয়, তাকে ছাড় দেয়ার প্রশ্নই আসে না। সে যতই ক্ষমতাবান হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। তাকে ধরার জন্য অনুসন্ধান চলছে। র‌্যাব এবং পুলিশ উভয়েই খুঁজছে। আমরা মনে করি খুব শীঘ্রই আমরা তথ্য দিতে পারব।

এদিকে শুক্রবার শিবলীকে আদালতে হাজির করে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তার সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার পুলিশ পরিদর্শক আলমগীর গাজী। পরে আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এ মামলায় আরও ৫ আসামি ৭ দিনের রিমান্ডে রয়েছে। তারা হলেন, রিজেন্ট হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আহসান হাবীব, হেলথ টেকনিশিয়ান আহসান হাবীব, হেলথ টেকনোলজিস্ট হাতিম আলী, রিজেন্ট গ্রুপের প্রকল্প প্রশাসক মোঃ রাকিবুল ইসলাম, রিজেন্ট গ্রুপের মানবসম্পদ কর্মকর্তা অমিত বণিক, রিজেন্ট গ্রুপের গাড়িচালক আবদুস সালাম ও হাসপাতালের কর্মী আবদুর রশিদ খান জুয়েল। অন্যদিকে রিজেন্ট হাসপাতালের অভ্যর্থনাকারী কামরুল ইসলাম নামে এক আসামি শিশু হওয়ায় তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর হাকিম সাদবীর ইয়াসির আহসান চৌধুরী তাকে গাজীপুরের কিশোর সংশোধনীতে পাঠানোর আদেশ দেন।

করোনার অজুহাতে নানা অনিয়ম, প্রতারণা, সরকারের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ, করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট, চিকিৎসায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতালের প্রধান কার্যালয়, উত্তরা ও মিরপুর শাখা সিলগালা করে দিয়েছে র‌্যাব। তার আগের দিনেই গা-ঢাকা দিয়েছেন হাসপাতালের মালিক সাহেদ। সাহেদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে মোট ৩৬টি মামলা। এ সব মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পুলিশ। সাহেদ নিজেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপ কমিটির সদস্য বলে পরিচয় দিতেন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সাহেদ একসময় বিএনপি করতেন। বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তার তোলা ছবি ভেসে আসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।