আল্লাহ যাদেরকে ভালোবাসেন। (পর্ব দুই)।।মুফতি মুহাম্মাদ আকতার আল-হুসাইন

প্রকাশিত: ২:২৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০২০ | আপডেট: ২:৩০:অপরাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০২০

মুফতি মুহাম্মাদ আকতার আল-হুসাইন

ভালোবাসা একটি গোপন বিষয়। কারো প্রতি কারো কতটুকু ভালোবাসা আছে তা পরিমাপ করা খুব কঠিন। তবে কিছু কিছু মাপকাঠি আছে যেগুলো দিয়ে অনেক সময় বুঝা যায় বা অনুমান করা যায় কতটুকু ভালোবাসা আছে। আর তার মধ্যে অন্যতম হলো একে অপরের অবস্থা ও পারস্পরিক ব্যবহারের চিহ্ন ও লক্ষণাদি দেখে বা জেনে নেয়া। কিন্ত আল্লাহ তায়ালা কাদের ভালবাসেন সে মাপকাঠি তিনি নিজেই বলে দিয়েছেন। সেগুলো যদি কোন মানুষের মধ্যে থাকে তাহলে সে আল্লাহর ভালবাসায় শিক্ত হবে। তাহলে আসুন দেখি আমাদের মধ্যে সেই মাপকাঠি গুলো আছে কি না?

=======তৃতীয় মাপকাঠি

🕋 আল্লাহ মুত্তাকীদের ভালোবাসেন।

আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের মধ্যে থেকে যাদেরকে ভালোবাসেন তাদের মধ্যে অন্যতম এক দল হচ্ছেন যারা মুত্তাকী তথা পরহেজগার আল্লাহ ওয়ালা। সূরা আল-ইমরানের ৭৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “হ্যাঁ, অবশ্যই যে নিজ প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করে এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে ভালবাসেন”।

🔰 হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এখানে তাকওয়া বলে শিরক থেকে বেঁচে থাকা বোঝানো হয়েছে। যারা শিরক থেকে বেঁচে থাকে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে ভালবাসেন। (তাফসীরে তাবারী)

————-তাক্বওয়ার সংক্ষিপ্ত পরিচয়।

🔰 বায়হাকী শরীফের একটি হাদিসে এসেছে একদিন জনৈক ব্যক্তি হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) কে তাক্বওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন- “তুমি কি কখনো কাঁটাযুক্ত পথে চলেছ”? লোকটি বলল, হাঁ। তিনি বললেন, কিভাবে চলেছ? লোকটি বলল- “আমি কাঁটা দেখলে তা এড়িয়ে চলি। অথবা ডিঙিয়ে যাই অথবা দূরে থাকি”। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বললেন- “এটাই হলো তাক্বওয়া”।

🔰 তাফসীরে ইবনে কাসীর ও কুরতুবীতে এসেছে- আববাসীয় খলীফা মুতাওয়াক্কিল এর পৌত্র খ্যাতনামা কবি ও বিদ্বান হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুতায (রহঃ) তাক্বওয়ার অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন- “ছোট ও বড় সব গুনাহ পরিত্যাগ কর, এটাই তাক্বওয়া। চলো কাঁটা বিছানো রাস্তার পথিকের মত, যে সতর্ক হয় ঐসব থেকে, যা সে দেখতে পায়। ছোট পাপকে তুচ্ছ মনে করো না, নিশ্চয়ই পাহাড় সৃষ্টি হয়েছে ছোট ছোট কংকর থেকে”।

🔰 তাফসীরে ইবনে কাসীরে এসেছে- হযরত উমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) একদিন হযরত উবাই ইবনে কাব (রাঃ) কে তাক্বওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তখন তিনি বললেন- “আপনি কি কাঁটা যুক্ত পথে চলেননি? হযরত উমর (রাঃ) বললেন, হাঁ। তখন হযরত উবাই ইবনে কাব (রাঃ) বললেন, কিভাবে চলেছেন? হযরত উমর (রাঃ) বললেন, খুব সাবধানে ও কষ্ট করে চলেছি। তখন উবাই (রাঃ) বললেন- “ওটাই হলো তাক্বওয়া”।

🔰 ইবনে কাসীর (রহঃ) বলেন- তাক্বওয়ার মূল অর্থ হলো “অপছন্দনীয় বিষয় থেকে বেঁচে থাকা”। (তাফসীরে ইবনে কাসীর)

🔰 কুরআনুল কারীমের বহু জায়গায় আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকীদের পরিচয়, গুনগান ও তাদেরকে ভালোবাসার কথা বর্ণনা করেছেন। যেমন কুরআনুল কারীমের শুরুতেই মুত্তাকীদের পরিচয় তুলে ধরে তিনি বলেছেন- “এটি সেই কিতাব, যার মধ্যে কোন সন্দেহ নেই”। এখানে “যালিকা” শব্দ দ্বারা কুরআনুল কারীমকে বুজানো হয়েছে। দুনিয়ার মানুষের বুদ্ধিজ্ঞান বহির্ভূত বিষয় নিয়ে ধারণা, কল্পনা ও আন্দাজ-অনুমানের ভিত্তিতে যতগুলো গ্রন্থ লিখিত হয়েছে, এগুলোর লেখকগণ নিজেদের গ্রন্থাবলীর নির্ভূলতা সম্পর্কে যত শপথই করুক না কেন তাদের গ্রন্থাবলী সন্দেহমুক্ত নয়। কিন্তু এ কুরআনুল কারীমের রচিয়তা এমন এক সত্তা যিনি সমস্ত তত্ত্ব ও তথ্যের জ্ঞান রাখেন। অতীত ও ভবিষ্যৎ সবই তাঁর নিকট বর্তমান। কাজেই এর মধ্যে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। এর পরেই মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “এটি মুত্তাকীদের জন্য হেদায়াত।”

🔰 এই পথ নির্দেশিকা গ্রন্থ থেকে হেদায়াত পেতে হলে মানুষকে মুত্তাকী হতে হবে। ভালো ও মন্দের পার্থক্য করার ক্ষমতা তার মধ্যে থাকতে হবে। ভালোকে গ্রহণ এবং মন্দকে বর্জন করা একজন মুত্তাকীর বৈশিষ্ট্য। সেই বৈশিষ্ট্য সৃষ্টিতে তাকে আগ্রহী হতে হবে। যারা দুনিয়ায় পশুর মতো জীবন যাপন করে, নিজেদের কৃতকর্ম সঠিক কিনা সে ব্যাপারে কোন চিন্তা করে না, দুনিয়ায় গড্ডালিকা প্রবাহে যারা গা ভাসিয়ে দেয়, তার নফস তাকে যেদিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে অথবা মন যেদিকে যেতে চায় সেদিকে চলতে অভ্যস্ত, তাদের জন্য কুরআনুল কারীমে কোন পথনির্দেশ নেই। ঐসব মুত্তাকীদের জন্য এ গ্রন্থ “হেদায়া” বা পথপ্রদর্শক হবে যারা কিছু মৌলিক গুণ অর্জন করতে পেরেছে। সেই গুণগুলো হলো- “যারা গায়েবের প্রতি ঈমান আনে, সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিয্ক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। আর যারা ঈমান আনে তাতে, যা তোমার প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং যা তোমার পূর্বে নাযিল করা হয়েছে। আর আখিরাতের প্রতি তারা ইয়াকীন রাখে”।

⬛ অদৃশ্যে ঈমান আনয়ন। যা দেখা যায় না, শোনা যায় না এবং অংগ ও প্রত্যংগ দ্বারা অনুভব করা যায় না, অর্থাৎ মানুষের ইন্দ্রিয়াতীত এবং মানুষের প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় ধরা পড়ে না। যেমন আল্লাহর সত্তা, গুণাবলী, ওহী, ফেরেশতা, আখেরাত, জান্নাত ও জাহান্নম ইত্যাদি। এ সত্যগুলোকে না দেখে বিশ্বাস করা এবং প্রদত্ত খবরের উপর আস্থা রেখে এগুলোকে মেনে নেয়াই হচ্ছে সেই ঈমান বিল-গায়েব বা অদৃশ্যে বিশ্বাস।

🔰 তাফসীরে ইবনে কাসীরে এসেছে- হযরত আবুল আলিয়াহ (রহঃ) বলেন- গায়েবে বিশ্বাস বলতে আল্লাহ, ফেরেশতা, আল্লাহর কিতাব সমূহ, তাঁর রাসূলগণ, বিচার দিবস, পরকাল ইত্যাদি সবকিছুকে বুঝায়। হযরত ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বলেন, জান্নাত-জাহান্নাম ইত্যাদিসহ বান্দার চোখের বাইরে যা কিছু রয়েছে এবং যা কিছু কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, সবকিছু গায়েবে বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত”।

🔰 মুসতাদরাকে হাকীমে এসেছে – হযরত আব্দুর রহমান ইবনে ইয়াযীদ (রহঃ) বলেন- একদিন আমরা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) এর নিকটে বসেছিলাম। এ সময় আমরা আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবীগণ সম্পর্কে এবং কোন বিষয়ে তাঁরা অগ্রণী ছিলেন, সে সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বললেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাজ-কর্ম পরিষ্কার ছিল যারা তাঁকে দেখেছেন। সেই সত্তার কসম করে আমি বলছি, যিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, এর পর তিনি বলেন- “অদৃশ্যে বিশ্বাস স্থাপনের চাইতে বড় ঈমান আর নেই”। অতঃপর তিনি ‘আলিফ লাম মীম’ থেকে ‘মুফলিহূন’ পর্যন্ত পাঁচটি আয়াত তেলাওয়াত করেন।

🔰 মুসনাদে আহমদ ও মিশকাত শরীফে এসেছে- হযরত আবু জুমআহ আনছারী (রাঃ) বলেন- আমরা একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে দুপুরের খানা খাচ্ছিলাম। এ সময় হযরত আবু ওবায়দাহ ইবনুল জাররাহ (রহঃ) আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমাদের চাইতে উত্তম কেউ আছে কি? আমরা আপনার কাছে ইসলাম কবুল করেছি এবং আপনার সাথে জিহাদ করেছি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- “হ্যাঁ। তারা হলো আমার পরবর্তী লোকেরা, যারা আমার উপরে বিশ্বাস স্থাপন করবে অথচ তারা আমাকে দেখেনি”।

🔰 মুসনাদে আহমাদে এসেছে – একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীগণের মাঝে অবস্থানকালে বললেন- “আমি আমার ভাইদের সাথে সাক্ষাতের আকাংখা পোষণ করছি। সাহাবীগণ বললেন, আমরা কি আপনার ভাই নই? তিনি বললেন- “তোমরা আমার সাথী। আর আমার ভাই হলো তারা, যারা আমাকে না দেখেই আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে”।

🔰 ইমাম কুরতুবী বলেন, আলোচ্য আয়াতে “ঈমান বিল গায়েব” বলতে ‘ঈমানে শারঈ’ বুঝানো হয়েছে, যা হাদীসে জিব্রীলে বর্ণিত হয়েছে। যেখানে হযরত জিব্রাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে প্রশ্ন করেছিলেন ঈমান কি? জিব্রীলের এমন প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন- “তুমি বিশ্বাস স্থাপন করবে আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাগণের উপরে, তাঁর কিতাব সমূহের উপরে, তাঁর রাসূলগণের উপরে, বিচার দিবসের উপরে এবং তুমি বিশ্বাস স্থাপন করবে তাক্বদীরের ভাল-মন্দের উপরে। জিব্রীল বলেন, আপনি সঠিক বলেছেন”। (মুসলিম শরীফ)

⬛ নামায কায়েম করা। কোন নির্দিষ্ট স্থানে আযানের দ্বারা প্রকাশ্যভাবে নামাজের জন্য মানুষকে আহবান জানিয়ে সামষ্টিকভাবে জামায়াতবদ্ধ হয়ে নামায পড়াকে ইকামতে সালাত বলে। আল্লাহ আনুগত্যের বাস্তব ও স্থায়ী নমুনা হচ্ছে নামায। মুয়াযযিন প্রতিদিন পাঁচবার নামাযের জন্য আহবান জানায়, ঈমানের দাবিদার কোন ব্যক্তি এ আহবানে সাড়া না দিলে বুঝা যায় যে, সে আল্লাহর আনুগত্য ত্যাগ করেছে। কোন লোকালয়ে প্রত্যেকে ব্যক্তিগতভাবে নিয়মিত নামায আদায় করে, কিন্তু জামায়াতের সাথে ফরয নামায পড়ার ব্যবস্থা না করে থাকে, তবে সেখানে নামায কায়েম আছে, একথা বলা যায় না।

🔰 তাফসীরে ইবনে কাসীরে এসেছে- হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত ক্বাতাদাহ (রাঃ) সহ অনেকেই বলেছেন- মুত্তাক্বী তারাই যারা নামাজের ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত, কিয়াম-কুঊদ, রুকূ-সুজূদ, ওযূ এবং নামাজের ওয়াক্তের যথাযথ হেফাযত করে।

⬛ আল্লাহর রাস্তায় খরচ করা। সমস্ত রিযিক আল্লাহ দিয়েছেন তা থেকে খরচ করা- বান্দা প্রথমেই স্বীকার করে নেয় যে, তাদের ধন-সম্পদ যা কিছু আছে তা আল্লাহ প্রদত্ত, তাদের নিজেদের সৃষ্ট বা উপার্জিত নয়। কাজেই এ সম্পদে আল্লাহ ও বান্দার অধিকার রয়েছে। আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার আান্দোলনে খরচ করা প্রথম কর্তব্য। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী হকদার হচ্ছে তার পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিত ব্যক্তিরা। অত:পর দূরের লোক। প্রথমে সাধারণ দান-সদকার বিধান প্রবর্তিত হয়েছিল। পরে যাকাত একটা স্বতন্ত্র বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে নাযিল হয়। কিন্তু সাধারণ দান-সদকাও এর পাশাপাশি চালু থাকে। আল্লাহ তায়ালা সূরা তাগাবুনের ১৭-১৮ নং আয়াতে বলেছেন- “যারা দিলের সংকীর্ণতা থেকে বেঁচে আছে তারাই কামিয়াব। তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দিলে তিনি তা তোমাদের জন্য কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে ফেরৎ দিবেন”।

আল্লাহ তায়ালা সূরা মুনাফিকূনের ১১ নং আয়াতে বলেছেন- “আমি তোমাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তোমরা তা থেকে তোমাদের কারো মৃত্যু আসার আগেই খরচ কর”।

🔰 সুতরাং সংকীর্ণমনা ও অর্থলোলুপ না হয়ে মানুষকে হতে হবে আল্লাহর ও বান্দার হক আদায়কারী। বাখিলী চরিত্রের লোকদের মত ঈমানদার ব্যক্তি হাত গুটিয়ে রাখবে না। সে আল্লাহর পথে বে-হিসাব ব্যয় করবে, আর এ বিশ্বাস রাখবে যে, আল্লাহর ভাণ্ডার অফুরন্তু। তিনি বান্দাকে পরীক্ষা করেন মাত্র। তিনি এই দুনিয়ায়ই বান্দাকে তার ব্যয়িত সম্পদ কয়েক গুণ বেশী করে ফেরৎ দিতে পারেন।

⬛ সমস্ত কিতাবের উপর ঈমান আনা। আল্লাহ তায়ালা ওহীর মাধ্যমে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও পূর্ববর্তী নবীগণের উপর বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন স্থানে যে সকল কিতাব নাযিল করেছেন সেসবের উপরও ঈমান আনতে হবে। যারা এগুলোকে বাদ দিয়ে নিজেদের মনগড়া মতবাদকে আল্লাহর বিধান বলে চালিয়ে দেয় এবং তাদের বাপ-দাদারা যেগুলোকে মেনে আসছে সেগুলো ছাড়া অন্যগুলোকে অস্বীকার করে তাদের সকলের জন্য আল-কুরআনের হেদায়াতের দরজা বন্ধ। আল-কুরআন তার অনুগ্রহ কেবলমাত্র তাদের উপর বর্ষণ করে যারা নিজেদেরকে আল্লাহর বিধানের মুখাপেক্ষী মনে করে। যারা বংশ, গোত্র বা জাতি প্রীতিতে লিপ্ত হয় না, বরং নির্ভেজাল সত্যের প্রতি অনুগত, সত্য যেখানে যে আকৃতিতে আবির্ভূত হোক তার সামনে তার মাথা নত করে দেয়।

🔰  সহীহ বুখারী, তারীখে কাবীর ও সিলসিলা সহীহাহ সহ বহু কিতাবে এসেছে- হযরত মুয়ায বিন জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত একটি ঘটনা, যেখানে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছ থেকে জানতে চেয়েছিলেন- “ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের চাইতে অধিক পুরস্কারের অধিকারী কেউ আছে কি? আমরা আপনার উপরে বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং আপনার পদাংক অনুসরণ করেছি। জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- “ঐ মহাপুরষ্কার থেকে তোমাদের কে বাধা দিবে? এমতাবস্থায় যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের মধ্যে আছেন, যিনি তোমাদের নিকটে আসমান থেকে ‘অহী’ নিয়ে আসছেন। বরং অধিক পুরষ্কারের মালিক হবে তারাই, যারা তোমাদের পরে আসবে। যাদের নিকটে দুই মলাটে মোড়ানো কিতাব (কুরআন) আসবে, যার উপরে তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং সে অনুযায়ী আমল করবে। তারা তোমাদের চাইতে দ্বিগুণ পুরস্কারের মালিক হবে”।

🔰 যারা আখেরাতের উপর ঈমান আনে তারাই মুত্তাকী। এখানে আখেরাত একটি ব্যাপক ও পরিপূর্ণ অর্থবোধক শব্দ। আকীদা-বিশ্বাসের বিভিন্ন উপাদানের সমষ্টির ভিত্তিতে এ আখেরাতের ভাবধারা গড়ে উঠেছে। বিশ্বাসের নিম্নোক্ত উপাদানগুলো এর অন্তর্ভূক্ত। এ সমগ্র আকীদা-বিশ্বাসগুলোকে যারা মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি তারা কুরআন থেকে কোনক্রমেই উপকৃত হতে পারবে না। কারণ এ বিষয়গুলো অস্বীকার করা তো দূরের কথা, এগুলো সম্পকেৃ কারো মনে যদি সামান্যতম দ্বিধা ও সন্দেহ থেকে থাকে, তাহলে মানুষের জীবনের জন্য কুরআন যে পথ নির্দেশ করেছে সে পথে তারা চলতে পারবে না।

⬛ তারাই সফলকাম। আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকীদের কিছু পরিচয় দেওয়ার পর বলছেন- “ঐ সকল মানুষ তাদের প্রভুর দেখানো পথের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং তারাই সফলকাম”। তাফসীরে কুরতুবীতে এসেছে- “সফলকাম” অর্থ হচ্ছে জান্নাতের অধিকারী ও সেখানে অবস্থানকারী”।

⬛ চুক্তি বজায় রাখা মুত্তাকীদের বৈশিষ্ট্য। সূরা তাওবাহ এর ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নিজেই বলেছেন- “তবে মুশরিকদের মধ্য থেকে যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছ, অতঃপর তারা তোমাদের সাথে কোন ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করেনি, তোমরা তাদেরকে দেয়া চুক্তি তাদের নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত পূর্ণ কর। নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকীদের ভালবাসেন”।

⬛ অঙ্গীকার পালন করা হচ্ছে মুত্তাকীর আরো একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সূরা তাওবাহ এর ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “কীভাবে মুশরিকদের জন্য অঙ্গীকার থাকবে আল্লাহর কাছে ও তাঁর রাসূলের কাছে? অবশ্য যাদের সাথে মসজিদে হারামে তোমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছ তাদের কথা আলাদা। অতএব যতক্ষণ তারা তোমাদের জন্য ঠিক থাকে, ততক্ষণ তোমরাও তাদের জন্য ঠিক থাক। নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকীদের ভালবাসেন”।

🔰 অঙ্গীকার পালন করার অর্থ হল, সেই অঙ্গীকার রক্ষা করা যা আহলে-কিতাব (ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান) এবং প্রত্যেক নবীর মাধ্যমে তাঁদের নিজ নিজ উম্মতের কাছ থেকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর ঈমান আনার ব্যাপারে নেওয়া হয়েছে। আর ‘সংযত হয়ে চলা’ (বা আল্লাহভীরুতা অবলম্বন করা)র অর্থ হল, মহান আল্লাহ কর্তৃক হারামকৃত জিনিস থেকে দূরে থাকা এবং রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক নির্দেশিত সমস্ত বিষয়ের উপর আমল করা। যারা এ রকম করে, তারা অবশ্যই আল্লাহর পাকড়াও থেকে রক্ষা পাবে এবং তাঁর প্রিয় বান্দা বলেও গণ্য হবে। তথা সব ধরনের চুক্তি বা অঙ্গীকার বজায় রাখা আল্লাহর নিকট বড় পছন্দনীয় কাজ। অতএব তার প্রতি যত্ন রাখা জরুরী। (আহসানুল বয়ান)

⬛ এরকম মুত্তাকীদের অনেক গুন কুরআন-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। যেগুলো একজন ঈমাদার মুসলিম হিসেবে অর্জন করা একান্ত প্রয়োজন। আর যখনি এগুলো অর্জন করা সম্ভব হবে তখনী আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসার পাত্র হওয়া সম্ভব হবে।

পর্ব তিন আসবে ইনশা আল্লাহ

 

লেখক: ইমাম ও খতিব ওল্ডহাম জামে মাসজিদ, যুক্তরাজ্য