কোভিড-১৯: অনলাইন ক্লাস নিয়ে কুবি শিক্ষার্থীদের যত ভাবনা

প্রকাশিত: ২:৫৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০২০ | আপডেট: ২:৫৬:অপরাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০২০

 

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে প্রায় তিন মাস বন্ধ আছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনলাইন ক্লাস শুরু করার জন্য পরামর্শ দিয়ে আসছে। অবশেষে আগামী ১৬ই জুলাই থেকে অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তার ই প্রেক্ষিতে অনলাইন ক্লাস নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মতামত গ্রহণ করছেন লন্ডন টাইমস এর কুবি প্রতিনিধি খালেদুল হক——-‌‌®

১. “কোভিড-১৯ বা নোবেল করোনাভাইরাস” সারা বিশ্বে এক আতঙ্কের নাম। এ ভাইরাসটি সুন্দর,গতিশীল ও আলোকিত বিশ্বটাকে করে দিয়েছে একেবারে স্থবির। এর সাথে স্থবির হয়ে পড়ে সারাবিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থা।বর্তমানে ১৬০টির ও অধিক দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।দীর্ঘকালীন বন্ধের ফলে ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে যা অত্যন্ত চিন্তা ও ভাবনার বিষয়। এক্ষেত্রে শিক্ষামন্ত্রণালয় মনে করেন “ডিজিটাল বাংলাদেশ” এর সুযোগ ব্যবহার করেই এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলের ডিজিটাল শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীদের সমস্যা নিরসনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনেকগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তাহলোঃ- প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ই- পাঠদানের মাধ্যমে ক্লাস নেওয়া এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জুম অ্যাপ্লিকেশন বা ফেসবুক লাইভে ক্লাস নেওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।যা অতি শীঘ্রই শুরু হতে যাচ্ছে।
একজন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী হিসেবে এ সময়ে অনলাইন ক্লাস নেওয়াটা কতটা যৌক্তিক এবং আমাদের পড়ালেখার গতি সচল রাখার ক্ষেত্রে অনলাইন ক্লাস এর ভূমিকা কতটুকু তা নিচে আমার মতামত অনুসারে তুলে ধরা হলোঃ-

★সেশনজট অনেকাংশে কমানো সম্ভবঃ- করোনার দুর্যোগকালীন সময়ে এই দীর্ঘকালীন বন্ধে প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেশনজটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ সমস্যা নিরসনে অনলাইন ক্লাসে ই এখন একমাত্র মাধ্যম। অনলাইন ক্লাসে কোর্সভিত্তিক শতভাগ ক্লাস সম্পন্ন করা হলে পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর পর ই শিক্ষার্থীদের সেমিস্টার পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব।এতে তাদের সেশনজটে পড়ার আশঙ্কা কিছুটা কমবে।

★কোর্স ভিত্তিক অ্যাসাইনমেন্ট সম্পন্ন করা সম্ভবঃ- অ্যাসাইনমেন্ট এর জন্য গুগল ফরম,গুগল ডাক,গুগল ড্রাইব এবং ফেসবুকে কোর্সভিত্তিক গ্রুপে ভিডিও যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। যার মাধ্যমে প্রত্যেক কোর্সভিত্তিক আস্যাইনমেন্ট অনলাইনে সম্পন্ন করা সম্ভব বলে আমি মনে করি।

★শিক্ষার্থীদের সম্মুখিত সমস্যার সমাধান সম্ভবঃ-কোর্স ভিত্তিক আলাদা আলাদা গ্রুপে লাইভ ক্লাস নেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা সেখানে ডকুমেন্ট,প্রেজেন্টেশন,নোটিশ বিনিময় ছাড়াও লাইভ ক্লাস চলাকালে শিক্ষার্থীরা তাদের সমস্যাগুলো কমেন্টে জানাতে পারবে।এছাড়াও জুম অ্যাপ্লিকেশনে শিক্ষকের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের রেসপন্স এর সুযোগ থাকে।যার ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের সম্মুখিত সমস্যা শিক্ষকদের অবগত করে তার যথাযথ সমাধান পেতে পারে।

★ক্লাসে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের পরবর্তীতে ক্লাস করার সুবিধাঃ- ক্লাস চলাকালীন কোন শিক্ষার্থী ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে না পারলে ও অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা উক্ত ক্লাসটি করা সম্ভব।কারণ শিক্ষক ক্লাস নেওয়ার পর কোর্স ভিত্তিক গ্রুপে উক্ত লাইভ ক্লাসগুলো ভিডিও হিসেবে থেকে যায়। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের এই অনিশ্চিত বন্ধের মধ্যে YouTube হয়ে উঠেছে অনলাইন ক্লাসের এক নতুন প্ল্যাটফর্ম।শিক্ষকদের যে কোন মাধ্যমে নেওয়া ক্লাসগুলো YouTube আপলোড করা হলে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে ক্লাসগুলো করে নিতে পারবে এবং তাদের সমস্যাগুলো কমেন্টে জানাতে পারবে।

সর্বোপরি বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমি বলতে চাই যে, করোনা দুর্যোগ প্রাক্কালে অনলাইন ক্লাসে ই একমাত্র মাধ্যম যা আমাদের পড়ালেখার গতিকে সচল রাখতে পারে। যদি ও অনলাইন ক্লাসের অনেকগুলো সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা মোকাবেলা করে আমাদের বাস্তবায়নযোগ্য ও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহন করাটাই হবে যুক্তিযুক্ত।

তানজিনা ইসলাম
শিক্ষার্থী,ইংরেজি বিভাগ।

২.করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকতে পারে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ ইঙ্গিত থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ( ইউজিসি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। বর্তমান বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের যুগে এটি একটি যুগ উপযোগী ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত বলে মনে করি। কিন্তু অনলাইনে ক্লাস করতে গেলে দরকার দ্রুতগতি সম্পন্ন ইন্টারনেট ব্যবস্থা ও স্মার্ট ফোন, কম্পিউটার বা লেপ্টপ প্রয়োজন। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষ করে গ্রাম অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা কল্পনা অতীত। করোনা পরিস্থিতিতে টিউশনহীন দরিদ্র পরিবারের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের পকেটের কথা (ইন্টারনেট খরচ) না হয় বাদ ই দিলাম। সাথে এক বেলা বন-কলা ও অন্য বেলা ডাল-ভাত দিয়ে দিন পার করা শিক্ষার্থীর স্মার্ট ফোন বা লেপ্টপ এর ক্রয় ক্ষমতা মুখে তুলা অপ্রাসঙ্গিক।আমার মনে হয় অনলাইনে ক্লাস নিলে যারা উচ্চ ও মধ্য ভৃত্য পরিবারের সন্তান এবং যারা বিভাগীয় বা জেলা শহরে বসবাস করে তারা উপকৃত হবে। নিম্ন মধ্য ভৃত্য ও নিম্ন ভৃত্য পরিবারের সন্তান এবং যারা গ্রামে বাস করে তাদের বিশাল একটা অংশ এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।অতএব সবার জন্য উচ্চগতি সম্পন্ন ফ্রি ইন্টারনেট সুবিধা ও নিতান্তই প্রয়োজন এমন শিক্ষার্থীদের কে ফ্রি স্মার্ট ফোন সরবরাহ করতে না পারলে এই সিদ্ধান্ত বিলাসিতা বৈ কিছুই নয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিৎ অনলাইন ক্লাসে না গিয়ে সীমিত আকারে বিশ্ববিদ্যালয় খোলা রেখে করোনার কারণে যাদের রেজাল্ট আটকে আছে বিশেষ করে অনার্স ফাইনাল ও মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ারের রেজাল্ট প্রকাশের ব্যবস্থা করা। কারণ করোনার কারণে কোন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থেমে নেই। ধন্যবাদ।

হেলাল উদ্দিন
শিক্ষার্থী,অর্থনীতি বিভাগ।

৩.বাস্তবিকপক্ষে আমরা এখন খুব কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। একটু পিছনে ফিরে তাকালে ইতিহাস আমাদের জানান দেয় যুগে যুগে কোভিড-১৯ এর মত কিছু রিজিওনাল ফ্লু (স্প্যানিশ ফ্লু,সার্স ভাইরাস,ইবোলা ভাইরাস….)ছিল। ঐসব ফ্লুগুলি যেমন স্থায়ী ছিল না হয়তো কোভিড-১৯ ও স্থায়ী হবে না।
কোভিড-১৯ নিয়ে যে প্রশ্নটা বার বার উকি দিচ্ছে তা হল কোভিড-১৯ আমাদের জন্য কি নিয়ে এসেছে???যদি বলতে চাই কোভিড-১৯ আমাদের সক্ষমতা বহুগুনে বাড়িয়ে দিয়েছে,আমার আমিটাকে জানার,চেনার,কাজে লাগানোর সুযোগ করে দিয়েছে,ধৈর্যশীল করেছে,বিচক্ষণ করেছে সহমর্মিতা করেছে,প্রজ্ঞাবান করেছে আরো কত কি তাহলে কি ভুল হবে???
আমরা সব পারি। যেকোনো পরিস্থিতিতে খাঁপ খাইয়ে চলতে পারি এটাই তার প্রমাণ। যদিও একটু কষ্ট হচ্ছে।এই পৃথিবীতে ঠিকে থাকার জন্য আমাদেরকেই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।আর সেই সংগ্রামটা হবে নিজেকে আলাদা রাখার সংগ্রাম। এই মহাদূর্যোগে আমরা আমাদের অনেক প্রিয়জনকে হারিয়েছি।কিন্তু এটা মেনে নিতে হবে।আমাদের পড়াশোনায় সাময়িক ব্যাঘাত ঘঠেছে।কিন্তু এভাবে বসে থাকলে হবে না।জিবন মানেই সামনে এগিয়ে চলা।অবশ্যই এর বিকল্প পথ খুজে বের করতে হবে।যা এখন অনলাইন পাঠদান প্রকৃয়া করছে।হয়তো কিছু কিছু জায়গায় পর্যাপ্ত নেটওয়ার্ক না থাকার কারণে অসুবিধা হচ্ছে।কিন্তু এখানেও বিকল্প কিছু করা যায়।যারা নিয়মিত হতে পারছে না তাদেরকে ভিডিও টিওটোরিয়াল দিয়ে,পিডিএফ দিয়ে,ডাটা প্যাক সাপোর্ট দিয়ে হলেও কার্যক্রম চালানো যায়।যেটা আমাদের ডিপার্টমেন্ট করছে।
সর্বোপরি এটাই বলতে চাই আমরা সহসাই এই দূর্যোগ কাটিয়ে উটবো ইনশাআল্লাহ।আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুস্থ থাকার মত তোফিক দান করুন।
(আমিন)

এমডি মুরাদ,
শিক্ষার্থী,রসায়ন বিভাগ।

আজকের পৃথিবী এক চরম দুঃসময় অতিক্রম করছে। কোভিড-১৯ এর ভয়াল থাবায় সারা পৃথিবী স্তব্ধ : দিশেহারা। প্রতি ঘন্টায় টেলিভিশনের নিউজ, সংবাদমাধ্যম, অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শতসহস্র মৃত্যু আর আক্রান্তের সংবাদ। সকাল থেকে রাত অবধি ব্যস্ত মানুষটিও আজ কোয়ারান্টাইনে গৃহবন্দী।
তবুও পৃথিবী তার আগের অবস্থানে বসে নেই। কোভিড-১৯ আমাদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে বহুগুনে। নিজেকে জানার ও নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভা কাজে লাগানোর সুযোগ করে দিয়েছে।
আমাদের জীবনযাত্রায় যোগ করে দিয়েছে নতুন মাত্রা। আমরা চাইলেই যেকোনো পরিস্থিতিতে খাঁপ খাইয়ে চলতে পারি। নশ্বর এই পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য আমাদেরকে প্রতিনিয়তই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়। এই দুর্যোগ পরিস্থিতিতে ও আমরা হয়েছি অনেক ধৈর্যশীল, অধ্যাবসায়ী ও কঠোর পরিশ্রমী।
কোভিড-১৯ এ আমরা অনেক কিছু হারিয়েছি সত্ত্বেও তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারে এগিয়ে গেছি বহুদূর। আন্তর্জাতিক দুনিয়ার সকল কর্মকান্ড এখন অনলাইনেই সম্পন্ন হচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সবকিছুই এখন অনলাইন নির্ভর।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ও অনলাইনে পাঠদান এখন সময়ের দাবী। স্কুল, কলেজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ও অনলাইনে ক্লাস শুরু করে দিয়েছে। হয়তো কিছু কিছু জায়গায় পর্যাপ্ত নেটওয়ার্ক না থাকার কারণে অসুবিধা হচ্ছে। কিন্তু এখানেও বিকল্প কিছু করা যায়। যারা অনলাইনে নিয়মিত হতে পারছে না তাদেরকে ভিডিও টিওটোরিয়াল দিয়ে, পি.ডি.এফ. ফাইল দিয়ে, ডাটা প্যাক সাপোর্ট দিয়ে হলেও অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালানো দরকার।
সর্বোপরি সুন্দর একটি (করোনামুক্ত) ভোরের প্রত্যাশা করছি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ভালো রাখুন, সুস্থ রাখুন। আবারও আমাদের ক্যাম্পাস মুখরিত হবে শতসহস্র প্রাণের মিলনে, সেই প্রত্যাশায়…

ইউসুফ ইসলাহী
শিক্ষার্থী,লোক প্রশাসন বিভাগ।