প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সেজে পুলিশের সঙ্গে জালিয়াতি সাহেদের

প্রকাশিত: ৯:৩২ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০২০ | আপডেট: ৯:৩২:অপরাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০২০

রমেন দাশগুপ্ত, সারা বাংলা, চট্টগ্রাম ব্যুরোকরোনভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্তের ভুয়া রিপোর্ট সরবরাহ করে দেশজুড়ে আলোচিত হয়েছেন রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম। তিনিই নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিচয় দিয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রতারণা ও জালিয়াতি করেছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, চেসিস নম্বর জালিয়াতি করে বিক্রির জন্য রাখা ১৭টি সিএনজি অটোরিকশা জব্দ করে সাহেদ করিমের রোষানলে পড়েন সিএমপির গোয়েন্দা শাখার একাধিক কর্মকর্তা। সাহেদ দাপট দেখিয়ে অভিযানে থাকা চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ ঠুকে দেন পুলিশের ডিসিপ্লিন অ্যান্ড প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড (ডিএনপিএস) বিভাগে। এরপর সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) পদমর্যাদার দু’জন কর্মকর্তাকে ‘লঘু শাস্তি’ দেওয়া হয়। তৎকালীন উপপরিদর্শক (বর্তমানে পরিদর্শক) পদমর্যাদার দু’জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চলমান। তাদের গত সাড়ে তিন বছর ধরে নিয়মিত ওই অভিযোগের শুনানিতে হাজির থাকতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অটোরিকশাগুলো ছিল নগরীর ডবলমুরিং থানার ধনিয়ালাপাড়া এলাকার মেসার্স মেগা মোটরস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের। বিআরটিএ’র অনুমোদন ছাড়াই অটোরিকশাগুলোর চেসিস নম্বরের ওপর আরেকটি পাতলা টিনের আবরণ বসিয়ে আরেকটি নম্বর দিয়ে সেগুলো বিক্রির জন্য রাখা হয়েছিল কর্ণফুলী থানা এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির গুদামে। আর সাহেদ করিম ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষের ‘ঘনিষ্ঠ’। বিআরটিএ’র ভুয়া রুট পারমিট দিয়ে গাড়িগুলো বিক্রি ও রাস্তায় চলাচলের উপযোগী করেছিলেন সাহেদ করিম।

সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেলে প্রতিষ্ঠানটির মালিক জিয়া উদ্দিন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের চাচাত ভাই মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বাদী হয়ে সাহেদের বিরুদ্ধে নগরীর ডবলমুরিং থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় মেগা মোটরসের সাবেক কর্মকর্তা শহীদুল্লাহকেও (৬০) আসামি করা হয়। এতে অটোরিকশা চলাচলের জন্য বিআরটিএ’র ভুয়া রুট পারমিট সরবরাহ করে ৯১ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয় সাহেদ করিমের বিরুদ্ধে।

মূলত এই মামলার পরেই সিএমপি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাহেদ করিমের প্রতারণা ও জালিয়াতির বিভিন্ন তথ্য বেরিয়ে আসছে।

যে চার পুলিশ সদস্য সাহেদ করিমের রোষানলে পড়ে হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে, তারা হলেন— সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগে কর্মরত পরিদর্শক রাজেশ বড়ুয়া ও আফতাব হোসেন এবং এএসআই সাদেক মোহাম্মদ নাজমুল হক ও মো. আজমির শরীফ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৬ সালের ৫ নভেম্বর বিকেলে নগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার এ এ এম হুমায়ূন কবীর ও পরিদর্শক রাকিব হোসেনের নেতৃত্বে একটি টিম কর্ণফুলী এলাকায় মেগা মোটরসের গুদামে অভিযান চালিয়ে ১৭টি অটোরিকশা জব্দ করে। এসব অটোরিকশার প্রত্যেকটির দুইটি করে চেসিস নম্বর ছিল। অভিযানে ওই চার পুলিশ সদস্যও ছিলেন। অটোরিকশা জব্দের সঙ্গে তারা মেগা মোটরসের মালিক জিয়া উদ্দিন ও কর্মকর্তা শহীদুল্লাহকেও আটক করেন। অটোরিকশাগুলো মনসুরবাদে ডাম্পিং স্টেশনে রেখে রাতে অভিযানকারী দল ফিরে আসেন নগরীর লালদিঘীর পাড়ে গোয়েন্দা শাখার কার্যালয়ে।

পুলিশ পরিদর্শক আফতাব হোসেন  বলেন, ‘বিভিন্নভাবে চাপ আসায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে রাতেই আটক দু’জনকে একজন আইনজীবীর জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। একটি অটোরিকশা আলামত হিসেবে রেখে বাকি ১৬টি ফেরত দেওয়া হয়। কিন্তু আমি পরদিন পাতলা প্লেটের নিচে বডিতে আরেকটি চেসিস নম্বর থাকার কথা উল্লেখ করে জব্দ অটোরিকশাটি বিআরটিএ’র মাধ্যমে আমদানি ও পরীক্ষিত কি না এবং এর প্রকৃত চেসিস নম্বর কোনটি— তা জানতে চাই। ১ জানুয়ারি বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক তৌহিদুল হাসান ফিরতি পত্রে জানান, এই মোটরযানের কোনো রেজিস্ট্রেশন বিআরটিএ দেয়নি এবং প্রতিটি গাড়িতে শুধু একটিই চেসিস নম্বর থাকবে। এভাবে আমাদের তদন্ত এগিয়ে যায়।’

সূত্রমতে, তদন্ত চলমান অবস্থায় সাহেদ করিম ২০১৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সিএমপিতে আসেন। তিনি নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে পরিচয় দেন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তাকে পাঠানো হয়েছে বলে তিনি জানান। কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে বের হওয়ার পর লালদিঘীর পাড়ে সিএমপি কমিশনারের কার্যালয়ের সামনে সাহেদ করিমের সামনে পড়েন রাজেশ ও আফতাব। এসময় সাহেদ তাদের হুমকি দেন এবং তাদের বিরুদ্ধে ঢাকায় গিয়ে পুলিশের ‘সিকিউরিটি সেলে’ অভিযোগ করবেন বলে জানান। হুমকি-ধমকির বিষয়ে সাহেদের বিরুদ্ধে আফতাব হোসেন অভ্যন্তরীণ জিডি করেন।

পুলিশ পরিদর্শক রাজেশ বড়ুয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘সাহেদ করিম নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিচয় দিয়ে আমাদের হুমকি-ধমকি দিতে শুরু করেন। বলেন, জুনিয়র অফিসার— তোমরা এত সাহস কোত্থেকে পাও? এই সামান্য কাজের জন্য আমাকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আসতে হয়েছে, আমার হাত মন্ত্রী-এমপি-সচিব পর্যন্ত, সিকিউরিটি সেল আমার হাতের মুঠোয়। এরপর তিনি ঢাকায় গিয়ে আমাদের নামে হয়রানির অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগের তদন্ত এখনো চলছে। এই সপ্তাহেও আমাদের ঢাকায় গিয়ে অভিযোগের শুনানিতে হাজির থাকতে হয়েছে। কোনো দোষ না করেও আমাদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।’

সূত্র জানায়, সাহেদ করিম চট্টগ্রামে আসার পর যে অটোরিকশাটি জব্দ অবস্থায় ছিল, সেটিও ফেরত দেওয়া হয়। কার্যত পুরো ঘটনাই কাগজে-কলমে ধামাচাপা দিতে বাধ্য হয় সিএমপি। এরপরও সাহেদ করিম নিজে অথবা প্রতিনিধির মাধ্যমে পুলিশের ডিএনপিএস বিভাগে চার জনের বিরুদ্ধে বৈধ অটোরিকশা আটকে হয়রানি এবং ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ আনেন। প্রাথমিক অনুসন্ধানে হয়রানির অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা বলা হয়। তবে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির কোনো অভিযোগের সত্যতা মেলেনি বলে উল্লেখ করা হয়। দুই এএসআইকে তিরস্কারের মাধ্যমে লঘু শাস্তি দেওয়া হয়। পরিদর্শক রাজেশ ও আফতাবের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান আছে। শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আব্দুস সালাম তদন্ত করছেন।

সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার পলাশ কান্তি নাথ  বলেন, ‘আমাদের দু’জন অফিসার কেবল সাহেদ করিমের রোষানলে পড়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সাহেদ করিম নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিচয় দিয়ে সিএমপিতে এসে দাপট দেখান। একটি সাধারণ অভিযানের কারণে আমাদের দু’জন এএসআই লঘু শাস্তি অলরেডি পেয়েছেন। দু’জন পরিদর্শককে এখনো নিয়মিত ঢাকায় গিয়ে হাজিরা দিতে হচ্ছে। এককথায় বলতে গেলে, তারা সাহেদের জালিয়াতির শিকার হয়েছেন।’

মেগা মোটরসের অটোরিকশা জব্দের সেই ঘটনা পুনঃতদন্তের পক্ষেও মত দিয়েছেন সিএমপি কর্মকর্তাদের কেউ কেউ।

এদিকে মেগা মোটরসের মালিকের প্রতিনিধি মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন  জানিয়েছেন, যে ১৭টি অটোরিকশা জব্দ করা হয়েছিল, সেগুলো পরে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

সাইফুদ্দিন বলেন, ‘এটা পুলিশের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। সেজন্য পুলিশ গাড়িগুলো আটক করেও পরে আবার ছেড়ে দিয়েছে। সেগুলো ভারতের পুনে থেকে আমদানি করা। একটিই চেসিস নম্বর ছিল। পরে বিআরটিএ আামদের লিখিত দিয়েছে যে গাড়িগুলো বাংলাদেশের রাস্তায় চলাচলের উপযোগী। সাহেদ করিম বিআরটিএ থেকে রুট পারমিট নিয়ে দিতে আমাদের সহযোগিতা করেছিলেন। তবে তিনি যে সিএমপিতে এসেছিলেন, সেটার বিষয় আমরা জানি না। আমাদের কর্মকর্তা শহীদুল্লাহ জানতেন, তাকে পরে আমরা চাকরিচ্যুত করেছি। শহীদুল্লাহর সঙ্গে সিএমপিতে গিয়ে আমাদের আস্থা অর্জন করে সে আমাদের কাছ থেকে ৯১ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।’