আল্লাহ যাদেরকে ভালোবাসেন-পর্ব তিন ।। মুফতি মুহাম্মাদ আকতার আল-হুসাইন

প্রকাশিত: ২:৩১ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০২০ | আপডেট: ২:৩১:অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০২০

ভালোবাসা একটি গোপন বিষয়। কারো প্রতি কারো কতটুকু ভালোবাসা আছে তা পরিমাপ করা খুব কঠিন। তবে কিছু কিছু মাপকাঠি আছে যেগুলো দিয়ে অনেক সময় বুঝা যায় বা অনুমান করা যায় কতটুকু ভালোবাসা আছে। আর তার মধ্যে অন্যতম হলো একে অপরের অবস্থা ও পারস্পরিক ব্যবহারের চিহ্ন ও লক্ষণাদি দেখে বা জেনে নেয়া। কিন্ত আল্লাহ তায়ালা কাদের ভালবাসেন সে মাপকাঠি তিনি নিজেই বলে দিয়েছেন। সেগুলো যদি কোন মানুষের মধ্যে থাকে তাহলে সে আল্লাহর ভালবাসায় শিক্ত হবে। তাহলে আসুন দেখি আমাদের মধ্যে সেই মাপকাঠি গুলো আছে কি না?

———– চতুর্থ মাপকাঠি

🕋 আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন ।

পবিত্রতা অর্জন করার গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ পবিত্রতা ছাড়া আপনার আমার কোন ইবাদাত আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য নয়। পবিত্রতা হাসিল করার জন্য কুরআনুল কারীমের বহু আয়াতে আল্লাহ আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বহু হাদীস রয়েছে। আর যারা পবিত্রতা অর্জনকারী তথা সব সময় সব ধরনের নাপাকী থেকে নিজেকে পবিত্র রাখেন আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। সূরা বাকারার ২২২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “আর তারা তোমাকে হায়েয সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বল, তা কষ্ট। সুতরাং তোমরা হায়েযকালে স্ত্রীদের থেকে দূরে থাক এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হবে তখন তাদের নিকট আস, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদেরকে ভালবাসেন এবং ভালবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে”।

🕋 আল্লাহ নিজেই পবিত্র।

আল্লাহ তায়ালা নিজেই পবিত্র আর পবিত্রতাকে তিনি ভালোবাসেন। তিরমিজী শরীফের হাদিসে এসেছে – “হযরত ছালেহ ইবনে আবি হাসান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র। আর পবিত্রতাকে তিনি ভালোবাসেন”।

🕋 বিশেষভাবে পবিত্র হওয়ার নির্দেশ।

নাপাকী থেকে পবিত্রতা অর্জনের বহুদিক রয়েছে। পবিত্রতা অর্জন করা কখনও ফরজ, ওয়াজিব বা সুন্নাত হয়ে থাকে। আর এগুলোর জন্য আলাদা ভাবে বিশেষ পদ্ধতিতে পবিত্রতা অর্জন করতে হয়। সূরা মায়িদার ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “এবং যদি তোমরা অপবিত্র থাক, তবে বিশেষভাবে পবিত্র হবে”।

🕋 পোশাক পবিত্র রাখা।

শারীরিকভাবে পবিত্র অর্জন করার পর নিজের পোশাক পবিত্র রাখার নির্দেশ দিয়ে সূরা মুদ্দাসসীর এর ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “আর তোমার পোশাক-পরিচ্ছদ পবিত্র কর”।

🕋 পবিত্র স্থানে নামাজ আদায় করা।

নামাজ হচ্ছে সব ইবাদাতের মূল। আর এই নামাজ কোথায় আদায় করবেন সে বিষয়টি আল্লাহ তায়ালা সূরা তাওবাহ এর ১০৮ নম্বর আয়াতে বলে দিয়েছেন- “তুমি সেখানে কখনো (সালাত কায়েম করতে) দাঁড়িও না। অবশ্যই যে মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাকওয়ার উপর প্রথম দিন থেকে তা বেশী হকদার যে, তুমি সেখানে সালাত কায়েম করতে দাঁড়াবে। সেখানে এমন লোক আছে, যারা উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করতে ভালবাসে। আর আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালবাসেন”।

⬛ পবিত্র আয়াতে কারীমায় মুনাফিকদের একটি অত্যন্ত নোংরা ষড়যন্ত্রের কথা বর্ণিত হয়েছে। তা হলো, তারা একটি মাসজিদ নির্মাণ করে। কুরআনুল কারীমে উক্ত মাসজিদকে “মাসজিদে যিরার” নামে অভিহিত করা হয়েছে। তারা নাবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলল বৃষ্টি ও ঠাণ্ডা সহ বিভিন্ন কারণে দুর্বল ও অসুস্থ লোকেদের দূরে (মাসজিদে কুবায়) যেতে বড় কষ্ট হয়। তাদের সুবিধার্থে একটি মাসজিদ নির্মাণ করেছি। যদি সেখানে গিয়ে নামাজ আদায় করে আপনি উদ্বোধন করে দিতেন তাহলে আমরা বরকত লাভে ধন্য হতাম। নাবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে নামাজ আদায় করে উদ্বোধনের প্রতিশ্রতি দিলেন। কিন্তু ফিরার পথে আল্লাহ তায়ালা ওহী দ্বারা মুনাফিকদের অসৎ উদ্দেশ্যের কথা ফাঁস করে দিলেন। কারণ তারা মূলত এ মাসজিদ নির্মাণ করেছে মুসলিমদের ক্ষতিসাধন, কুফরীর প্রচার ও বিভেদ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে। তারা মিথ্যা শপথ করে নাবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে প্ররোচিত করতে চেয়েছিল।

আল্লাহ তায়ালা নবীজীকে তাদের চক্রান্ত ও প্রতারণা থেকে রক্ষার্থে সে মাসজিদে (যিরার) নামাজ আদায় করতে নিষেধ করলেন। আর যে মাসজিদ (কুবা/ নাববী) তাক্বওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত সেখানে নামাজ আদায় করার উৎসাহ দিলেন। কারণ সেই মাসজিদ প্রথম থেকেই পবিত্র স্থান হিসেবে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য।

🔰 উক্ত আয়াতে কারীমা সম্পর্কে সুনানে আবু দাউদ শরীফে এসেছে- “হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- এ আয়াত কুবাবাসীদের শানে নাযিল হয়েছিল। সেখানে এমন সব লোক রয়েছে যারা পাক-পবিত্র থাকতে ভালোবাসে। (সূরাহ তাওবাহ ১০৮)। কুবাবাসীরা পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করত। তাই তাদের শানে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল”।

🔰 ইবনে মাজাহ শরীফে এসেছে- “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুবাবাসীদের বললেন, হে আনসার সম্প্রদায়! আল্লাহ পবিত্রতার ব্যাপারে তোমাদের প্রশংসা করেছেন। তোমরা কিভাবে পবিত্র হও? তারা বলল, আমরা নামাজের জন্য অযু করি, জানাবাত থেকে গোসল করি এবং পানি দিয়ে পায়খানা পরিষ্কার করি”।

🕋 পবিত্রতা নামাজের চাবি।

নামাজ ছাড়া কোন মানুষের পক্ষে জান্নাতে যাওয়া সম্ভব হবে না। আর এই নামাজ আল্লাহর দরবারে ক্ববূল করাতে হলে সব দিক থেকেই পবিত্র হতে হবে। সুনানে আহমদে এসেছে- “হযরত জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- জান্নাতের চাবি হলো নামাজ। আর নামাজের চাবি হলো পবিত্রতা”।

🕋 পবিত্রতা ছাড়া নামাজ ক্ববূল হয় না।

আল্লাহর দরবারে নামাজ ক্ববূল হওয়ার জন্য অনেকগুলো শর্তের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হচ্ছে পবিত্রতা। সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে এসেছে- “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- পবিত্রতা ছাড়া নামাজ ক্ববূল হয় না। আর হারাম উপায়ে প্রাপ্ত মালের সাদকাও ক্ববূল হয় না”।

🕋 পবিত্রতা ঈমানের অংঙ্গ।

মানুষের ঈমানের অনেক শাখা রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম একটা শাখা হচ্ছে পবিত্রতা। সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে এসেছে- “হযরত মালিক ইবনে আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- পবিত্রতা হচ্ছে ঈমানের অংঙ্গ”।

🕋 অপবিত্র ব্যাক্তি জান্নাতে যাবে না।

জান্নাত হচ্ছে পবিত্র স্থান। তাই সেখানে কোন অপবিত্র ব্যাক্তি প্রবেশ করতে পারবে না। তাবরানী শরীফের হাদীসে এসেছে- “হযরত আয়শা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- ইসলাম হচ্ছে পবিত্রতার ধর্ম। আর কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না পবিত্রতা ছাড়া”।

🕋 অপবিত্রতা কবরের শাস্তির কারণ।

পবিত্রতা অর্জন করা সবার জন্য খুব জরুরী। কারণ এই পবিত্রতা ছাড়া যেভাবে কোন ইবাদাত ক্ববূল হয় না, ঠিক তেমনিভাবেই এর জন্য শাস্তিও পেতে হবে। সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফের হাদীসে এসেছে- “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুটি কবরের পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন- নিশ্চ্য়ই এ দুজন কবরবাসীকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। তবে বড় কোন গুনাহের কারণে কবরে তাদের আযাব দেয়া হচ্ছে না। এই কবরবাসী প্রস্রাব করার সময় সতর্ক থাকত না। আর ঐ কবরবাসী গীবত করে বেড়াত। এরপর তিনি খেজুরের একটি কাঁচা ডাল আনিয়ে সেটি দুটুকরো করে এক টুকরো এক কবরের উপর এবং এক টুকরো অন্য কবরের উপর গেড়ে দিলেন। তারপর বললেন, এ ডালের টুকরো দুটি শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই তাদের শাস্তি কমিয়ে দিবেন”।

🕋 অন্তরের পবিত্রতা।

আল্লাহ তায়ালা মানুষের অন্তর এবং নিয়ত দেখে থাকেন। আমরা ভাল কাজ যতই করি না কেন হৃদয় যদি স্বচ্ছ না হয় এবং অন্তর যদি পবিত্র না হয় তাহলে এসব ভালো কাজ কোনো কাজেই লাগবে না। সূরা আল-ইমরানের ২৯ ও ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “হে নাবী আপনি বলুন, তোমরা যদি তোমাদের অন্তরসমূহে যা আছে তা গোপন কর অথবা প্রকাশ কর, আল্লাহ তা জানেন। আর আসমানসমূহে যা কিছু আছে ও জমীনে যা আছে, তাও তিনি জানেন। আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। যেদিন প্রত্যেকে উপস্থিত পাবে যে ভাল আমল সে করেছে এবং যে মন্দ আমল সে করেছে তা। তখন সে কামনা করবে, যদি মন্দ কাজ ও তার মধ্যে বহুদূর ব্যবধান হত! আর আল্লাহ তোমাদেরকে তার নিজের ব্যাপারে সাবধান করছেন এবং আল্লাহ বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল”।

🔰 সহীহ বুখারী শরীফের হাদীসে এসেছে- “হযরত নুমান ইবনে বশীর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- জেনে রাখ শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখ, সে গোশতের টুকরোটি হল ক্বলব (অন্তর)”।

🔰 সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে এসেছে- “হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের দেহকায় ও বাহ্যিক আকৃতির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না। বরং তিনি তোমাদের অন্তরসমূহের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। এ বলে তিনি তাঁর আঙ্গুলের মাধ্যমে স্বীয় বক্ষের দিকে ইঙ্গিত করেন”।

⬛ সর্বোপরি আমাদের যে কোন ইবাদাত আল্লাহর কাছে মকবুলিয়াত পেতে হলে বাহ্যিক পবিত্রতা অর্জন করার পূর্বে আমাদের হৃদয়কে পবিত্র করতে হবে। কেননা অন্তরের পবিত্রতা ছাড়া বাহিরের পবিত্রতার কোন মূল্য নেই। আর অন্তর পবিত্র হবে তখনই যখন আমরা বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করব। আল্লাহর জিকিরে সময় অতিবাহিত করব। কারণ আল্লাহর জিকির ও ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যম পরিশুদ্ধ আত্মা গঠন করা সম্ভব। আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে তার সান্নিধ্য লাভ করা যায়।

🤲 আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তার স্মরণ, নামাজ কায়েম ও কুরআন অধ্যয়নের মাধ্যমে নিজেদের আত্মাকে পবিত্র করার তৌফিক দান করুন। (আমিন)

————পরের পর্ব আসবে ইনশা আল্লাহ

লেখক: ইমাম ও খতিব ওল্ডহাম জামে মাসজিদ, যুক্তরাজ্য