করোনাকালিন কবি সাহিত্যিকদের দিনকাল

প্রকাশিত: ২:৩৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০২০ | আপডেট: ২:৩৮:অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০২০
আনোয়ার আল ফারুক। বৈশ্বিক দূর্যোগ করোনার থাবায় সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশের অবস্থায়ও ত্রাহি ত্রাহি। মধ্য মার্চ থেকে অদ্যবধি এই দূর্যোগের কবলে আমাদের প্রিয় দেশ। দেশের মানুষজন ঘর বন্দি। জীবনের সকল স্তরে নেমে আসছে এক ধরণের স্থবিরতা। দিন দিন আতংক আর উৎকন্ঠা বেড়েই চলছে। আক্রান্ত আর বিয়োগের ঘটনাও একেবারে কম নয়। সব মিলে দেশের সর্বত্র বিরাজ করছে এক অজানা আতংক ও উৎকন্ঠা। কবে এই দূর্যোগ কেটে স্বাভাবিক জীবন যাত্রা শুরু হবে তা একেবারে অনিশ্চিত। আশার কোন সুবাতাস দেখা যাচ্ছে না অদ্যবধি। এমতবস্থায় দেশের ছড়াকার, কবি, গীতিকার ও লেখকরা কেমন আছেন? কিভাবে দিনাতিপাত করছেন তার উপর আজকে এই বিশেষ প্রতিবেদনে সাথে থাকছি আমি আনোয়ার আল ফারুক
এই বিষয়ে কথা হয় বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ কবি ও গবেষক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গাজীপুরের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক  ড. ইয়াহ্ইয়া মান্নান’র সাথে তিনি জানান- এই সময়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পরিবারকে বেশ সময় দেয়ার সুযোগ হয়েছে। নিয়মিত লেখালেখির পাশাপাশি অনলাইন অফলাইনে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামেও ক্লাস নিচ্ছেন আর অংশ গ্রহণ করছেন অনলাইন সাহিত্য আড্ডায়ও। তিনি তাঁর অধিনে এমএএস ও এমফিল গবেষকদের নিবিড় তত্ত্বাবধান করছেন। করোনাকালিন এই অবসরে তরুণ লেখকদের কী কী করা উচিত এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- অধ্যয়ন-অনুশীলনের ব্যাপ্তি বৃদ্ধিকরণ, মহান রবের সান্নিধ্য অর্জনে ধর্মীয় অনুশাসন পালনে সক্রিয়তা অর্জন, সাহিত্যতত্ত্ব, রসতত্ত্ব, ছন্দ ও অলঙ্কারকে আত্মস্থ করণে সময় অতিবাহিত করা খুব বেশি জরুরী।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার ও আশির দশকের বিশিষ্ট শিশু সাহিত্যিক “রঙধনু” সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক  শাহ আলম বাদশা জানান – করোনার এই সময়েও তিনি পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পরিবারকে বেশ সময় দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। ফুরফুরে মেজাজে নিয়মিত শিশুতোষ ও রম্যছড়ার পাশাপাশি ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন ও ইসলামী বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ নিবন্ধ লিখছেন। আগামী বইমেলায় তাঁর সাহিত্য বইয়ের পাশাপাশি ইসলামী প্রবন্ধের একটি বই প্রকাশের আশাবাদও ব্যক্ত করেন। করোনার এই সময়কে তিনি বোরিং হিসেবে নেননি বরং এই সময়কে তিনি পরিবার আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশির খোঁজ খবর ও সহযোগিতার উত্তম সময় বলে মনে করছেন।  নিয়মিত আত্মীয় স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশির খোঁজ খবর নিচ্ছেন আর নিজের সাধ্যানুযায়ী অসহায়দের সহযোগিতাও করছেন। করোনা পরবর্তী সময়ের ব্যাপারে তাঁর পরিকল্পনা জানতে চাইলে তিনি জানান- করোনা পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটলে আর্থিক, মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি পোষানোর জন্য বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনাসহ ট্যুরে যাওয়ার ইচ্ছে আছে সপরিবারে।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের চট্টগ্রাম কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত গীতিকার ও উপস্থাপক, মাসিক “শব্দ” সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক কবি মুহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী জানান – করোনাকালিন এই সময়ে তিনি পারিবারিক কাজে নিজকে বেশ ব্যস্ত রাখছেন। বাড়ির আঙিনায় সবজি বাগান ও ফুলের বাগান করছেন এবং নিয়মিত বাগান পরিচর্যায় সময় ব্যয় করছেন। সুযোগ পেলে পরিবারের জন্য রান্নাও করছেন।
লেখালেখি কেমন চলছে এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান এই সময়ে অন্য কোন ব্যস্ততা নেই বলে বাগান আর লেখালেখিতে সময় ব্যয়ের বেশ সুযোগ হয়েছে। বাইরে যেহেতু যাওয়ার কোন সুযোগ নেই তাই এই সময়ের খরচের টাকাগুলোও সঞ্চয় করছেন বলে তিনি জানান।
কথা হয় কবি ও সাংবাদিক সাহিদা সাম্য লীনার সাথে। তিনি জানান করোনা আমাদের জীবনে বলতে গেলে ভারসাম্য ফিরে আনছে। যেখানে কর্মজীবি মা বাবার সন্তানেরা মা বাবার স্নেহ মমতা থেকে খানিক বঞ্চিত ছিল তা পুষিয়ে নেয়ার সুযোগ হয়েছে। পরিবারকে পর্যাপ্ত সময় দেয়ার এটাই সুবর্ণ সুযোগ। তিনি করোনার শুরু থেকে ঢাকা লকডাউনে আটকা পড়লেও বর্তমানে ফেনী নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। লেখালেখি ও সাংবাদিকতায় বেশ সময় দিচ্ছেন। তিনি জার্নালিজমের উপর ডিপ্লোমা কোর্স করছেন। তাই একাডেমিক লেখা পড়ারও প্রচুর সময় পাচ্ছেন।  অবসরে প্রতিবেশি আত্মীয় স্বজনের খোঁজ খবর নিচ্ছেন। এই সময়কে তিনি আত্মীয়তার বন্ধনকে সুদৃঢ় করার মোক্ষম সময় বলে মনে করেন। তিনি বলেন অন্য সময় পেশাগত দায়িত্বপালন পারিবারিক ব্যস্ততায় যেটা হয়ে উঠে না এই করোনায় কিন্তু সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। করোনা পরবর্তী ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কী কী পরিকল্পনা নিয়ে ভাবছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান-  জীবন চলছে জীবনের নিয়মে। যদিও করোনা আমাদের জীবনের গতি থামিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ এমন বদ্ধ জীবন আমরা দেখিনি। তাই প্রথমে কী করবো অনেকে গুছিয়ে উঠতে পারেনি। করোনা যত সময় নিয়েছে ততো সময়ে সবার বুদ্ধিও এসে গেছে। এমন অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই শিখে গেছে। সবাই কাজ করছে কোন না কোনভাবে। আশাকরি সব ঠিক হবে। এই পরিবেশ পরিস্থিতি থাকতেই এটার সাথে আমাদের ম্যাচিং করে নিতে হবে। আমি মনে করি আমরা ঘরে বসে কিছু কাজ আগেই গুছিয়ে রাখি তাহলে করোনাত্তোর যেকোন ক্ষতি আমরা পুষিয়ে উঠতে পারি।
আরেক কবি ও সাংবাদিক আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন জানান- করোনায় জীবনের বেশ ছন্দপতন ঘটিয়েছে। বলতে গেলে সব এলোমেলো করে দিয়েছে। অনেকে নিরবে আর্থিক কষ্ট সয়ে যাচ্ছেন। তবে তিনি এই সময় পুরোটাই পরিবার কেন্দ্রিক ব্যস্ত। সন্তানদের লেখাপড়া ও নিজের অধ্যয়নে ব্যয় করছেন। তিনি বলেন আমরা স্বামী স্ত্রী দুজনই কর্মজীবি হওয়ায় বাচ্চাদের খুব একটা সময় দিতে পারিনি। করোনাকালিন সময়ে এখন তাদের বেশ সময় দিতে পারছি। তাদের লেখপড়ায় নিয়মিত সহযোগিতা করতে পারছি। করোনা পরবর্তী আমাদের জীবন যাত্রার মান কেমন হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- করোনা পরবর্তী সময়টা হবে আমাদের টিকে থাকার ক্ষেত্রে অস্তিত্বের লড়াই। এখনো বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে পড়ছে। চাকুরী হারাচ্ছে অনেকে। আবার কবে নাগাদ স্থীতিশীল পরিবেশ গড়ে উঠে আঁচ করাও যাচ্ছে না। সবমিলে আমরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। এই ক্ষেত্রে আমাদের খুব সাবধানে সুদৃঢ় কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এই অসময়ে কবি সাহিত্যিকরা কেমন আছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- এই সময়ে সবচেয়ে বেশি আর্থিক কষ্টে আছে দেশের কবি সাহিত্যকরা।
কথা হয় কবি জাকির হোসেন কামাল’র সাথে। তিনি জানান ভিন্ন কথা, কোথায় করোনার অবকাশ সেটাইতো দেখিনি। সারাদিন কর্মব্যস্ত এই মানুষটি সরকারী বিদ্যুৎ বিভাগে কর্মরত আছেন। অবসরের ফাঁকে দিব্যি লিখে চলছেন পদ্য কবিতা। নিয়মিত পত্রিকার ছাপছে তাঁর কবিতা। তিনি মনে করেন যারা এই লক ডাউনে কিছুটা অবসর পাচ্ছেন তারা অন্তত পরিবার আত্মীয় স্বজনকে সময় দেয়া উচিত। অসহায়দের প্রতি হাত বাড়ানোসহ সমাজের দায়বোধ আদায়ে সচেতন হওয়া দরকার। এই অবসর সময়ে নবীন লেখকদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন- নবীনদের লেখার চেয়ে পড়তে হবে অনেক বেশি। লেখার ক্ষেত্রে প্রচুর অধ্যয়নের বিকল্প নেই। তিনি নবীনদের ছন্দ তালের জ্ঞান ও শব্দের যুৎসই গাঁথুনির দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জনের আহবান জানান।
কথা হয় প্রবাসী তরুণ কবি আমিন আফসারীর সাথে, তিনি এই করোনাকে ইতিবাচক মনোভাবে দেখতে চান। তিনি বলেন করোনা প্রকৃতির জন্য আর্শিবাদ। আমরা প্রকৃতির উপর বেশ অবিচার করে ফেলছি। প্রকৃতি এখন অদৃশ্য ইশারায় সতেজতায় মগ্ন।অন্যদিকে আমরা যারা কর্ম কর্মসংস্থানের দোহাইয়ে ঘর সংসার বৌ বাচ্চাকে খুব একটা সময় না দিয়ে শুধু অর্থ উপার্জনের পিছে দৌড়াচ্ছিলাম তারা এখন বাধ্য হয়ে ঘর সংসার বৌ বাচ্চাদের সময় দিচ্ছি।  খানিক সুযোগ পেলে রান্না বান্নায় সহযোগিতা করছি।করোনা না আসলে গৃহীনীদের কঠিন কষ্ট অনুভব করতে পারতাম না। আমরাতো ঘরে বাইরে দিব্যি আছি আর মহিলারাতো বলতে গেলে জীবনভরই লকডাউনে। এই করোনায় তাদের কষ্ট বুঝার সুযোগ হয়েছে।লেখালেখির পাশাপাশি বাচ্চাদের লেখা পড়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে সময় কাটাচ্ছেন এই কবি।
করোনা কেটে যাবে একদিন। আতংক উৎকন্ঠার অবসান ঘটবে। ব্যবস্যা বাণিজ্যে স্থবিরতা কেটে প্রাণসাঞ্চলতা ফিরে আসবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠবে। হাট বাজার আবার লোক লোকারণ্যে ভরপুর হবে। মানুষের জীবন যাত্রার মান স্থীতিশীল স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। ধীরে ধীরে ক্ষয় ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সক্ষম হবে সকল স্তরের মানুষ। কবি সাহিত্যিকদের আড্ডাগুলোও আবার জমে উঠবে ঠিক আগের মত এই হোক আজকের প্রত্যাশা।#
গ্রন্থনায়ঃআনোয়ার আল ফারুক,সম্পাদক, বর্ণমালা ম্যাগাজিন