জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব কি ।। শাকিল হাসান

প্রকাশিত: ২:৪৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০২০ | আপডেট: ২:৪৯:অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০২০
বেশ কিছুদিন যাবত ভার্চুয়াল ওয়ালে কিছু ছবি ও ভিডিও অনবরত ঘুরেফিরে চোখের সামনে আসছে। ছবিগুলো নগরীর জলাবদ্ধতার। ভিডিও গুলোতে দেখছি কিভাবে রাস্তাঘাট বিশাল সমুদ্রে পরিণত হয়েছে। বরাবরের মতই পাব্লিক সরকারকে দোষারোপ করে বিভিন্ন ঠাট্টা-বিদ্রুপ ও ট্রল করা শুরু করে দিয়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে আগে কিছু না বললেও এবার আর চুপ থাকা গেলোনা। ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে কিছু বিষয় সামনে আসলো। যেগুলো ঠিকঠাক বাস্তবায়ন হলে এই সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধান সম্ভব বলে মনে হয়। প্রথমটা হল পরিকল্পিত ডিস্পোজাল সিস্টেম (যে কয়েকটা আছে সেগুলো কার্যত কোন কাজের নয়) তৈরি করা। শিল্প বর্জ্য এবং ঘরবাড়ির বর্জ্য উভয় ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য থাকবে। মুখ্য বিষয় হচ্ছে এই বর্জ্যগুলো যাবে কোথায়। সে জন্য প্রতিটি জেলা ভিত্তিক একটি সুনির্দিষ্ট ডাম্পিং গ্রাউন্ড তৈরি করা যেতে পারে যেটা লোকালয় থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকবে। পর্যাপ্ত যানবাহন এবং জনশক্তির প্রয়োজন হবে যা দ্বারা প্রতিদিন এই সমস্ত গৃহস্থলী এবং শিল্প আবর্জনা যথাযথভাবে সংগ্রহ করে এই ডাম্পিং গ্রাউন্ড পর্যন্ত পৌঁছানো যায়। আর এটা কার্যকর করতে সাধারণ জনগণকে আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আবর্জনা যেখানে সেখানে না ফেলে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখতে হবে যেখান থেকে সহজেই সেগুলো সংগ্রহ করা যায়। আমি বলতে চাচ্ছি একটা সামগ্রিক পরিবর্তনের কথা যেটা হয়তো আপাত দৃষ্টিতে অবাস্তব মনে হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন মানুষ চাইলেই অনেক কিছু করতে পারে,আর আমরাতো সদা পরিবর্তনশীল। এখন ফিরে আসি মূল আলোচনায়। সংগৃহীত বর্জ্যগুলোকে কি করা যায়? সে ক্ষেত্রে আমরা সিঙ্গাপুরের তুয়াস ডাম্পিং গ্রাউন্ডের উদাহরণ টানতে পারি। তারা বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে অনেক পর্যালোচনা এবং গবেষণার মাধ্যমে বের করে নেন কোন বর্জ্য গুলো পুনর্ব্যবহার সম্ভব। এই সমস্ত বর্জ্য থেকে তারা বেশ ভালো পরিমাণের বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম। কিছু অংশকে প্রসেসিং এর মাধ্যমে জৈবিক সারে রূপান্তরিত করে,যা  দেশের সমস্ত মানবসৃষ্ট বন এবং রাস্তার ধারে লাগানো গাছের পরিচর্যায় ব্যবহৃত হয়।আর  এগুলোর কোনটাই বিনামূল্যে নয়। যে অংশটুকু ব্যবহারের অযোগ্য সেটা তারা পুড়িয়ে ফেলে এবং এই পোড়ানোর কারনে সৃষ্ট  ধোঁয়া কে  অনেক উঁচু একটা চিমনির মাধ্যমে উড়িয়ে দেয়া হয় যাতে করে সেটা প্রকৃতিতে কোনো বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করতে না পারে। আমি জানিনা এগুলো বাংলাদেশের সম্ভব কিনা কিন্তু আমি স্বপ্ন দেখতে ভালবাসি।আর কে জানে হয়তো এই স্বপ্ন কোন একদিন বাস্তবে দেখা দিবে।
এবার দ্বিতীয় বিষয়টায় দৃষ্টিপাত করা যাক। একটি পরিকল্পিত এবং বাস্তবায়নযোগ্য ড্রেনেজ সিস্টেম এই জলাবদ্ধতা নিরাময়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে পারে। সেটা কোন আবাসিক এলাকার খাল হোক অথবা রাস্তার পাশে করা ছোট ড্রেন হোক। সরকারিভাবে সেটা করা সম্ভব বলে মনে করি। এক্ষেত্রেও সাধারণ জনগণ ছোট কিন্তু সবচাইতে প্রয়োজনীয় ভূমিকাটা রাখতে পারে। সেটা হচ্ছে কোনরকম প্লাস্টিক অথবা ময়লা যেন এসমস্ত খাল ও ড্রেনে কেউ না ফেলে। এই ড্রেনগুলোর প্রবাহ স্বাভাবিক থাকলে জলাবদ্ধতার সুযোগ খুবই কম থাকে যদি না সেটা বন্যা অথবা কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হয়। দেশের পৌরসভা গুলো এগুলো মনিটর করতে পারে। বাকি রইল শিল্প কারখানার তরল বর্জ্য। এগুলোকে অনেকে বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্যও বলে থাকেন। যে বর্জ্যের কারণে রাজধানীর বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানি বছরের প্রায় অধিকাংশ সময় কালো এবং দুর্গন্ধযুক্ত থাকে। সে ক্ষেত্রে শিল্প মন্ত্রণালয় একটি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনার মাধ্যমে এই সমস্ত অব্যবস্থাপনা কে কন্ট্রোল করতে পারে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে এধরনের বর্জ্য সরাসরি কোন জলাশয় অথবা নদীতে ফেলার অনুমতি দেয়া হয় না। প্রথমে সেগুলো শোধন করে তারপর ডিস্পোজ করা হয়। এই প্রক্রিয়াটা কিছুটা ব্যয়বহুল,যার কারণে আমাদের দেশের শিল্প কারখানার মালিকেরা সাধারণত তা ব্যবহার করতে চান না। সরকারিভাবে এগুলো ঠিকঠাক পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ না করলে এক সময় নদীতে শুধুমাত্র কেমিক্যাল’ই থাকবে, পানি নয়।
পরিশেষে বলতে চাই আমি এবং আমার মতো যারা প্রবাসে থাকেন বিশেষ করে উন্নত রাষ্ট্রে, তাদের অভিজ্ঞতা এবং মেধাকে কাজে লাগিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনের মত অনেক প্রাত্যহিক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। আমরা অন্য দেশকে সুন্দর রাখতে এত শ্রম দিয়ে যাচ্ছি,আর সেটা যদি নিজের দেশের জন্য হয় তাহলে বোধহয় সর্বোচ্চ ডেডিকেশন টা পাওয়া যাবে। বাংলাদেশকে কাল্পনিক ভাবে নয়,বাস্তবিক অবস্থায় ইউরোপ,সিঙ্গাপুরের চেয়েও সুন্দর ও গোছানো দেখতে চাই।
সিঙ্গাপুর থেকে।