বাবার লাশ সামনে রেখে অঝোরে কাঁদলেন ডঃ এমাজউদ্দীনপুত্র জিয়াউল

প্রকাশিত: ১১:১৫ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০২০ | আপডেট: ১১:১৫:পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০২০

লন্ডন টাইমস নিউজ।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক উপাচার্য, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জানাজার আগে লাশ সামনে রেখে বাবার স্মৃতি স্মরণ করে অঝোরে কান্না করেছেন তার বড় ছেলে জিয়াউল হাসান ইবনে আহমদ।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘বাবার সঙ্গে এই মসজিদে (রাজধানীর কাঁটাবনের মসজিদে মুনাওঅর) বহু বছর ধরে নামাজ আদায় করছি। মসজিদে বাবা আর আসবেন না, কিন্তু আমি আসব।’

শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর কাঁটাবনের এই মসজিদে এমাজউদ্দীন আহমদের জানাজা হয়। এ সময় বাবার রুহের মাগফেরাত কামনায় দোয়া চেয়ে সংক্ষিপ্ত কথা বলেন জিয়াউল।

তিনি বলেন, করোনার কারণে কয়েক মাস ধরে বাবা এই মসজিদে আসতে পারতেন না। এ জন্য তিনি অনেক অনুশোচনা করতেন। আফসোস করে তিনি আমার কাছে জানতে চাইতেন, মসজিদে না যাওয়ার কারণে আল্লাহ তাকে (বাবা) ক্ষমা করবেন কিনা? তখন আমি বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতাম, বাবা করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমরা আবার মসজিদে যাব। অথচ, আর তার মসজিদে যাওয়া হবে না।

এমাজউদ্দীনের বড় ছেলে বলেন, বাবা এই মসজিদে জুমা ও ওয়াক্তের নামাজগুলো নিয়মিত আদায় করতেন। বহুদিন ধরে তিনি এই মসজিদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন। এই মসজিদে তার হাজারো স্মৃতি রয়েছে। এ কারণে উনার প্রথম জানাজা এই মসজিদেই আদায় করা হয়। অনেকেই বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে প্রথম জানাজা পড়ানোর জন্য। কিন্তু আমরা সেখানে তাকে নিইনি। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

জিয়াউল হাসান সবার কাছে দোয়া চেয়ে বলেন, আল্লাহ বাবাকে ঈমানের সঙ্গে নিয়ে গেছেন। আপনারা সবাই তাকে ক্ষমা করবেন। আর তার কাছে কোনো দেনা-পাওনা থাকলে আমাকে জানাবেন। আমি সব পরিশোধ করে দেব।

জানাজায় উপস্থিত ছিলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, বিএফইউজের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এ বি এম আবদুল্লাহ, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, কবি আবদুল হাই সিকদারসহ দলীয় নেতাকর্মী, আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা।

এরপর বাদ আসর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে এমাজউদ্দীন আহমদের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে মিরপুরে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তার স্ত্রী সেলিনা আহমদের কবরে দাফন করা হবে।

বৃহস্পতিবার রাত ২টায় স্ট্রোক করলে অধ্যাপক এমাজউদ্দীনকে রাজধানীর ল্যাব এইড হাসপাতালে নেয়া হয়। ভোর ৬টার দিকে সেখানে মারা যান তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।

তার স্ত্রী সেলিমা আহমদ ২০১৬ সালেই মারা গেছেন। অধ্যাপক দিলরুবা শওকতা আরা ইয়াসমিন ও অধ্যাপক দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন তাদের দুই মেয়ে। দুই ছেলের মধ্যে জিয়া হাসান ইবনে আহমদ সরকারি কর্মকর্তা, তানভীর ইকবাল ইবনে আহমদ একজন চিকিৎসক।

প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমদ ১৯৩২ সালের ১৫ ডিসেম্বর তৎকালীন মালদাহ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ভারতের কিছু অংশ) জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের ‘গোহাল বাড়ি’ এলাকায় পরিবারসহ দীর্ঘদিন বসবাস করেন প্রফেসর এমাজউদ্দীন। তিনি শিবগঞ্জের আদিনা সরকারি ফজলুল হক কলেজ ও রাজশাহী কলেজের প্রাক্তণ ছাত্র।

মহান ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে, ১৯৫২ এর পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রনেতা হিসেবে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ কারাবরণও করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য এবং উপাচার্য (১ নভেম্বর ১৯৯২-৩১ আগস্ট ১৯৯৬) হিসেবে দীর্ঘদিন সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইউডা) ভিসি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তুলনামূলক রাজনীতি, প্রশাসন-ব্যবস্থা, বাংলাদেশের রাজনীতি, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক বাহিনী সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। এসব ক্ষেত্রে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় তিনি বিশেষজ্ঞ হিসেবেও প্রখ্যাত। তার লিখিত গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। দেশ বিদেশের খ্যাতনামা জার্নালে তার প্রকাশিত গবেষণামূলক প্রবন্ধের সংখ্যা শতাধিক।

শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান এবং সৃজনশীল লেখার জন্যে তিনি দেশ ও বিদেশে বিশেষভাবে সম্মানিত হয়েছেন। সৃষ্টিশীল গবেষণা ও আলেখ্য রচনার জন্য ‘মহাকাল কৃষ্টি চিন্তা সংঘ স্বর্ণপদক’, জাতীয় সাহিত্য সংসদ স্বর্ণপদক, জিয়া সাংস্কৃতিক স্বর্ণপদক অর্জন করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ১৯৯২ সালে একুশে পদক, মাইকেল মধুসুদন দত্ত গোল্ড মডেল, শেরে বাংলা স্মৃতি স্বর্ণপদক, ঢাকা সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক স্বর্ণপদক, বাংলাদেশ যুব ফ্রন্ট গোল্ড মেডেল, রাজশাহী বিভাগীয় উন্নয়ন ফোরাম স্বর্ণপদকসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বহু পুরস্কার-সম্মাননা অর্জন করেন।

তিনি বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিএনপিকে বিভিন্ন সময় গঠনমূলক পরামর্শ দিয়েছেন। বিএনপিও বিভিন্ন ইস্যুতে তার মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হতো।