বন্যা আর ভাঙনে নিঃস্ব হচ্ছে যমুনাপারের মানুষ

প্রকাশিত: ২:০৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০২০ | আপডেট: ২:০৯:অপরাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০২০

প্রতিনিধি, সিরাজগঞ্জ ।যমুনার পানিতে তলিয়ে গেছে বসতবাড়ি। বেশির ভাগ বাড়িতেই ঘরের মধ্যে অথই পানি। গ্রামের মানুষ বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিয়েছে উঁচু বাঁধে। তবে কিছু মানুষ কষ্ট করে রয়ে গেছে বাড়িতেই। কেউ কেউ এখনো পানি ভেঙে মালামাল নিয়ে ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে।এই চিত্র সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার খোকসা বাড়ি ইউনিয়নের যমুনা পাড়ের গুনেরগাঁতী গ্রামের। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে গেলে বন্যার্ত মানুষের অবর্ণনীয় এই দুর্ভোগ চোখে পড়ে।

গুনেরগাঁতী গ্রামের আছিয়া বেগম (৬০) অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসায় গত বছর বসতভিটা বিক্রি করে দেলবার হোসেন নামের এক প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। এবারের বন্যায় প্রথমেই ডুবে গেছে তাঁর ঘরটি। আশপাশের কোনো বাঁধ বা উঁচু জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে পরিবারের তিন সদস্য নিয়ে ডুবে যাওয়া ঘরেই রয়েছেন তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আছিয়া বেগম বলেন, ‘‍আমরা কিব্যা আছি সেডা কেডো দেহে? স্বামী অসুস্থ। পরের বাড়িত মেলা কষ্টে থাকি তার মদ্যে আবার বন্যা। একমাত্র বেটা হে তেলের কারখানায় কাম কইরা সংসার চালায়। বন্যা আর করোনা এ সবেরনিগ্যা কারখানা বন্দ। এহুন ওবি কোনোরহমে এক বেলা খাএ্যয়া না খাএ্যয়া বাইচা আছি।’আছিয়া বেগমের মতো গুনেরগাঁতী গ্রামের অনেকেই তাঁদের দুর্ভোগের কথা জানালেন। পানি বাড়তে থাকায় যমুনাপারের হাজারো মানুষ এখনো কোনো রকমে পলিথিন ও ভাঙা টিন দিয়ে চালা বানিয়ে বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। কিছুদিন আগেও যে গ্রামে ছিল হাজারো মানুষের বাস, সেখানে এখন শুধুই সুনসান নীরবতা। জনশূন্য গ্রামটিতে থেকে থেকে পানিতে ভাসছে বসতঘর।

গুনেরগাঁতী বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন আছিয়া বেগম (৪৫) নামের আরেক নারী। তিনি বলেন, ‘এহেনে টিউবয়েলের পানির ব্যবস্থা না থাকায় নদীর পানিই খাইতেছি। অনেক কষ্ট কইরা প্রস্রাব–পায়খানার কাম চালাইতে ওইছে। হুনছি গ্রামে গ্রামে নাকি সরকার সাহায্য দিতেছে, আমরা এহুনও পাই ন্যাই।’উপজেলার চর খোকসা বাড়ি, রাণিগ্রাম ও গুনেরগাঁতী গ্রামে এখন বেশির ভাগ বাড়িতে অথই পানি। আবার অনেক বাড়িতে টিনের চালা পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিতে ভেসে গেছে গুনেরগাঁতী গ্রামের বেশ কয়েকটি মুরগির খামার। খামারি লিয়াকত আলী (৪৮) বলেন, তাঁর দুটি ঘরেই পানি ওঠায় এক ঘরের মুরগি কম দামে বিক্রি করে দিয়েছেন। অন্য ঘরেও এখন হাঁটুপানি। তাই খাঁচা ইট দিয়ে একটু উঁচু করে মুরগিগুলো বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ‘জানি না পানি আরও বাড়বে কি না। এখন পানি বাড়লে আমরা যে মরে যাব।’

গুনেরগাঁতী ঘাট থেকে নৌকাযোগে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে খোকসাবাড়ি ইউনিয়নের চর খোকসাবাড়ি গ্রামে যাওয়ার পথে চোখে পড়ে শুধুই দুর্ভোগের দৃশ্য। বেশির ভাগ বাড়ির গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি এনে উঁচু বাঁধে খোলা আকাশের নিচে রাখা হয়েছে।চর খোকসাবাড়ি গ্রামের আবু হাসেম বলেন, ‘আমার চাইরডা গরু নিয়্যা বাঁধে আশ্রয় নিছি কোথায় যামু? বাড়িত তো পানি। এ্যাত দিন গরুর দুধ বেইচ্যাই সংসার চলছে। বন্যার কারণে ঠিকমতো খাইব্যার দিব্যার পারি ন্যা, তাই ঠিকমতো দুধ অয় না। নিজেগোরে খাইব্যার জোগার করবার পারিন্যা, গরুক খাওয়ামু কী?’

সদর উপজেলার পাঁচ ঠাকুরী এলাকায় গেলে ৭০ বছরের বেলাল হোসেন বলেন, ‘যমুনার পানিত ডোবে আবার এ্যালা জাইগ্যা উঠলেই শুর অয় বাঙ্গন। এমন রঙ্গলীলা দেখতে দেখতেই আমাগোরে জীবনটা কাইট্যা গেল। দুই যুগ আগে বাপ-দাদার ভিটামাটি হারাইচি।’গত জুন মাসে প্রথম দফায় যমুনার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্লাবিত হয় জেলার নিম্নাঞ্চল। এরপর যমুনার পানি নামতে থাকে। জুলাইয়ের প্রথম থেকে আবারও বাড়তে শুরু করে পানি। আবারও পানিবন্দী হয়ে পড়েন তীরবর্তী মানুষেরা। দিনমজুর শ্রেণির এই পরিবারগুলোতে এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি বলে অভিযোগ।

এ বিষয়ে ছোনগাছা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শহীদুল আলম বলেন, চলতি বন্যায় তাঁর ইউনিয়নের ২ হাজার ৭০০ পরিবারের ১৩ হাজার ৭০০ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ভাঙন ও বন্যাকবলিত এলাকার প্রায় ৭০০ পরিবার বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছে। তাদের তালিকা করে উপজেলায় পাঠানো হয়েছে।খোকসাবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান আবদুর রসিদ বলেন, সামান্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে কী করে সবাইকে সামলানো যায়?

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরকার অসীম কুমার বলেন, এর আগে প্রাথমিকভাবে বন্যার্তদের মাঝে পাঁচ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। নতুন করে চার টন চাল বিতরণ করার প্রস্তুতি চলছে। বাঁধে আশ্রয় নেওয়া মানুষের জন্য ১২টি পায়খানা ও ১২টি নলকূপ স্থাপনের কাজ শুরু করা হয়েছে।