ফেরদৌস দালালের সাথে ৫০ লক্ষ টাকার চুক্তি করেও সীমান্ত পার হতে পারেনি সাহেদ

প্রকাশিত: ১১:৩৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০২০ | আপডেট: ১২:৫৮:পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৮, ২০২০

উজ্জ্বল জীসান, ঢাকা।করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) নমুনা পরীক্ষা ও চিকিৎসায় অনিয়ম-প্রতারণার অভিযোগে গ্রেফতার রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদ ভারতে পালিয়ে যাওয়ার জন্য সবরকমের চেষ্টা করেন। এ জন্য তিনি দেশের বেশ কয়েকটি সীমান্তে দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নেন সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার শাখরা কোমরপুর সীমান্ত। সেখানে দিয়ে সাহেদ ভারতে পালিয়ে যেতে একজন দালালের সঙ্গে ৫০ লাখ টাকার চুক্তি করেছিলেন। কিন্তু তার আগেই ধরা পড়ে যান তিনি।— বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সাহেদ সম্পর্কিত এ সব তথ্য জানান র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ।

আশিক বিল্লাহ বলেন, ‘সাহেদ ভারতে পাড়ি দিতে দেবহাটা সীমান্ত এলাকার মো. ফেরদৌস নামে এক দালালের সঙ্গে ৫০ লাখ টাকা চুক্তি করেছিলেন। এর বাইরে আরও বেশ কয়েকজন দালালের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত ফেরদৌসের সঙ্গে চুক্তি হয়। ফেরদৌস তাকে এসি গাড়িতে সীমান্ত পার করে দিতে চেয়েছিলেন। তবে আগের দিন র‌্যাব সদস্যদের গতিবিধি ও চলাফেরা টের পেয়ে সাহেদ নিজেই নৌকায় বোরকা পরে অবস্থান নেন। আর পালানোর ঠিক আগ মুহূর্তে সাহেদকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।’

গ্রেফতারের পর সাহেদ র‌্যাব সদস্যদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। তাকে ছেড়ে না দিলে পরিণাম ভালো হবে না বলেও দম্ভোক্তি করেন- এসব জানিয়ে র‌্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘সাহেদ যে একজন অহংকারী লোক তা আবারও প্রমাণ হয়েছে। র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছে। এসব কিছুই ষড়যন্ত্রের অংশ বলে দাবি করেছে সাহেদ।’

ভারতে পালাতে যে দালালের সঙ্গে সাহেদ চুক্তি করেছিলেন সেই দালালকে গ্রেফতার করা হবে কি-না? জানতে চাইলে র‌্যাবের এ মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা দালালদের বিষয়ে তদন্ত করছি। তারা কোনোভাবে সাহেদকে সহায়তা করে থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।’

র‌্যাব সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদের সময় সাহেদ বারবার দম্ভোক্তি প্রকাশ করেছেন। এ সব মামলায় তার কিছুই হবে না বলে জানিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের অনেককে দেখে নিতেও চেয়েছেন।

র‌্যাবের আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, “সাহেদকে হেলিকপ্টারে করে তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরে নামানোর পর সাংবাদিকদের সামনে নিয়ে আসা হয়। এ সময় সাহেদ র‌্যাবকে বলেন, ‘হইছে, চলেন এখন গাড়িতে বসি।’ তবে র‌্যাব কর্মকর্তারা তার সেই কথায় কর্ণপাত করেননি।

এদিকে সাহেদকে ১০ দিনের রিমান্ডে পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে ঢাকা মহানগর হাকিম জসীম উদ্দিনের আদালত এই রিমান্ড দেন। এ সময় আদালতে সাহেদ বলেন, ‘করোনার দুঃসময়ে কেউ যখন এগিয়ে আসছিল না সেই সময় রিজেন্ট হাসপাতাল চিকিৎসা দিতে এগিয়ে আসে।’ এ সময় নিজেকে সে করোনা রোগী বলে দাবি করে।

গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘রিজেন্টের চেয়ারম্যান সাহেদ টেস্ট না করেই করোনার ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। গতকাল রাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রতারণার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এছাড়া হাসপাতালে র‌্যাবের অভিযানের আগে কিছু যন্ত্রপাতি সরিয়ে ফেলেছেন, অভিযান চালিয়ে তা উদ্ধার করা হবে।’

করোনা পরীক্ষার নামে ভুয়া রিপোর্ট দেওয়া ও জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে সাহেদের মালিকানাধীন রিজেন্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে। তার বিভিন্ন অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ উঠে আসে সারাবাংলার অনুসন্ধানেও। এ ছাড়া হাসপাতালটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ জমা পড়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরে।

গত ৬ জুলাই হাসপাতালটিতে অভিযান চালায় র‌্যাব। অভিযানে বিভিন্ন অনিয়ম-প্রতারণার প্রমাণ মেলে। করোনা পরীক্ষার নামে প্রতারণার অভিযোগ আসায় রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখা সিলগালা করে প্রশাসন। পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে তার করোনা পরীক্ষার অনুমোদন বাতিল করা হয়।

র‌্যাব জানায়, বাসায় গিয়ে করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহের অনুমতি না থাকলেও তারা সে কাজটি করত। আবার হাসপাতালে ভর্তি রোগীর ক্ষেত্রেও সরকারি ব্যবস্থাপনায় করোনা পরীক্ষা করা হলেও তারা এর জন্য টাকা নিতেন। রিজেন্ট হাসপাতাল সরকারিভাবে কোভিড রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য অধিদফতরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলেও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে রোগীদের কাছ থেকে।

র‌্যাবের অভিযানের পর রিজেন্ট হাসপাতালের সবধরনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। এর মধ্যে রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদসহ ১৭ জনের নামে মামলা দায়ের করে র‌্যাব। অভিযানের দিনই আটক হয়েছিলেন আটজন। পরে সাহেদের ঘনিষ্ঠ তারেক শিবলীকেও রাজধানীর নাখালপাড়া এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তবে সাহেদ পলাতক ছিলেন। হাসপাতালে অভিযানের এক সপ্তাহ পর সাতক্ষীরায় র‌্যাবের হাতে ধরা পড়ে সাহেদ।