জিলহজ্জের প্রথম দশকের করণীয় (পর্ব দুই)।।মুফতি মুহাম্মাদ আকতার আল-হুসাইন

প্রকাশিত: ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২০, ২০২০ | আপডেট: ১২:২৫:পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২০, ২০২০

পবিত্র জিলহজ্জের প্রথম দশকের দুই দিন তথা আরাফার দিন ও ঈদুল আদ্বহার দিন এবং আইয়্যামে তাশরীক তথা জিলহজ্জের এগার, বার ও তের তারিখ হচ্ছে খুব ফজিলতপূর্ণ দিন। এই দিন গুলোতে আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষনা করে যে তাকবীর দেওয়া হয় সেটাকে বলে তাকবীরে তাশরীক।

🕋 তাকবীরে তাশরীক এর পরিচয়।

তাকবীর শব্দের অর্থ হলো- বড়ত্ব ঘোষণা করা। আর তাশরীক শব্দের অর্থ হলো- সূর্যের আলোতে রেখে গোশত শুকানো। আরবগণ তাদের কুরবানীর গোশত ঈদের তিনদিন পর পর্যন্ত রোদে দিয়ে শুকাতো, এজন্য এ দিনগুলো আইয়্যামে তাশরীক বলা হয়।

🕋 তাকবীরে তাশরীক হলো-

“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার। আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ”।

🕋 তাকবীরে তাশরীক এর সূচনা।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ইসলামের বিভিন্ন আমল বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতিচারণে হয়ে থাকে। যেমন সাফা-মারওয়ায় সায়ী করা, কুরবানী করা, জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ প্রভৃতি আমল হযরত ইব্রাহীম, হাজেরা ও ইসমাঈল (আঃ) এর স্মৃতিচারণে হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে তাকবীরে তাশরীক এর ঐতিহাসিক একটি সূচনা রয়েছে। যার স্মৃতিচারণ স্বরূপ এখনো তাকবীরে তাশরীক এর প্রচলন চলে আসছে। বর্ণিত আছে, যখন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে আল্লাহর রাস্তায় কুরবানী করতে উদ্যোগ নিলেন, তখন হযরত জিব্রাঈল (আঃ) একটি দুম্বা নিয়ে হাজির হয়ে বললেন- আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার। অত:পর হযরত ইব্রাহীম (আঃ) বললেন- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার। তা শুনে হযরত ইসমাঈল (আঃ) বললেন- আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ। এরপর থেকেই এটি ইসলামী শরীয়তের একটি বিধান হিসাবে নির্ধারিত হয়ে যায়। (তাফসীরে কুরতুবী, এনায়া ও শামী)

🕋 তাকবীরে তাশরীক এর গুরুত্ব ফজিলত।

প্রতিবছর ৫ দিন ব্যাপি পালনকৃত বিশেষ এই আমলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই তাকবীরের মাধ্যমে মুমিনের দিলে তাওহীদের শিক্ষাকে আরো মজবুত ও শাণিত করতেই অধিক পরিমাণে আল্লাহর যিকির করা একান্ত কর্তব্য। সূরা বাকারার ২০৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “আর তোমরা আল্লাহকে স্মরণ কর নির্দিষ্ট দিন সমূহে”। অন্যত্র সূরা হজ্জের ২৮ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন- “যাতে তারা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে”।

⬛ এখানে নির্দিষ্ট দিন বলতে আইয়্যামে তাশরীক। দলিল হচ্ছে সহীহ বুখারী শরীফের হাদীসে এসেছে- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এই আয়াতদ্বয়ে নির্দিষ্ট দিনগুলির দ্বারা আশারায়ে যিলহজ্জ এবং নির্দিষ্ট দিন দ্বারা আইয়্যামে তাশরীক উদ্দেশ্য। (ফাতহুল বারী দ্বিতীয় খন্ড)

বিশেষ করে এই দিনগুলোতে আল্লাহর যিকিরের প্রতি আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়ার কারণ সম্পর্কে হযরত আল্লামা খাত্তাবী (রাহঃ) বলেন- জাহেলী যুগের লোকেরা যুগ যুগ ধরে তাদের কথিত প্রভুদের নামে পশু-প্রাণী উৎসর্গ করত। এর প্রতি উত্তরে মুমিনদের প্রতি আদেশ করা হয়েছে তারা যেন আল্লাহর যিকির ও তাকবীরের মাধ্যমে তাওহীদ ও আনুগত্যের ঘোষণা দান করে। আল্লাহ হচ্ছেন একমাত্র ইলাহ। তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনি ছাড়া কারো নামে প্রাণী উৎসর্গ করা যাবে না। কারণ তা সুস্পষ্ট শিরক। (ফাতহুল বারী দ্বিতীয় খন্ড)

⬛ উক্ত কিতাবে আরো রয়েছে- অন্যান্য দিনের তুলনায় এই দিনগুলায় ইবাদাত অধিক ফজিলতপূর্ণ হওয়ার রহস্য হলো যে, অন্য সময় অপেক্ষা গাফলতির সময়গুলোতে ইবাদাতের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। এবং সাধারণত তাশরীকের দিনগুলো (যা ঈদের পরদিন থেকেই শুরু হয় এবং যে দিনগুলোয় রোজা রাখা হারাম) হলো গাফলতির দিন। তাই অন্যান্য সময় ইবাদাতকারীর চাইতে গাফলতির সময়ে ইবাদাতকারীর অধিক শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে, যেমনিভাবে বেশিরভাগ মানুষ ঘুমন্ত থাকাবস্থায় (যা মূলত গাফলতির সময়) শেষ রাত্রিতে নামাজ আদায়কারীর ফজিলত রয়েছে। (ফাতহুল বারী দ্বিতীয় খণ্ড)

⬛ আরো বর্ণিত হয়েছে- আইয়্যামে তাশরীক অধিক ফজিলতপূর্ণ হওয়ার আরেকটি কারণ হলো যে, এই দিনগুলোতে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) তাঁর সন্তানকে আল্লাহর রাস্তায় কুরবানীর পরীক্ষা দিয়ে জান্নাতি একটি জন্তুর বিনিময়ে আল্লাহর অনুগ্রহে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এর দ্বারাই আইয়্যামে তাশরীকের ফজিলত প্রমাণিত হয়। (ফাতহুল বারী দ্বিতীয় খণ্ড)

⬛ জিলহজ্জের শুরু হতে বেশি বেশি যিকিরের যে আদেশ কুরআনে এসেছে এ ব্যাপারে হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- “আল্লাহর নিকট আমলের দিক থেকে আশরায়ে যিলহজ্ব হতে শ্রেষ্ঠ ও অধিক প্রিয় কোনো দিন নেই। অতএব তোমরা এতে তাহমীদ, তাহলীল ও তাকবীর বেশি বেশি করো”। (মুসনাদে আহমদ ও তাবারানী মুজামে কাবীর)

🕋 তাহমীদ, তাহলীল ও তাকবীরের ফজিলত।

তাহমীদ হলো আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা ও শুকরীয়া জ্ঞাপন করা। আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা বা শুকরীয়া আদায় করলে তিনি বান্দার উপর নিয়ামতের পরিমাণ বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ তায়ালা প্রশংসাজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে আল-হামদুলিল্লাহ বলার অগণিত সওয়াব বর্ণিত আছে। সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে এসেছে- “আল-হামদুলিল্লাহ নেকীর পাল্লাকে পরিপূর্ণ করে”।

তাহলীল তথা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ হলো তাওহীদের বাণী। তাহলীলের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদের ঘোষণা প্রচারিত হয়। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা ইসলামের শাখাসমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। এ প্রসঙ্গে সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে এসেছে- “ঈমানের ৭০ এর অধিক শাখা-প্রশাখা রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোত্তম হলো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা। আর সর্বনিম্ন হচ্ছে- রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা”।

তাকবীর তথা আল্লাহু আকবার বলা হলো আল্লাহ তায়ালার শ্রেষ্ঠত্ব, মহত্ব ও বড়ত্ব ঘোষণা করা। আল্লাহ তায়ালা তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করার আদেশ প্রদান করে সূরা মুদ্দাসসির এর ৩ নম্বর আয়াতে বলেছেন- “আর তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর”।

আল্লাহু আকবার আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রিয় বাক্যসমূহের মধ্যে অন্যতম। হাদীস শরীফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- চারটি বাক্য আল্লাহ তায়ালার কাছে সর্বাধিক প্রিয়। তা হলো- সুবহান আল্লাহ, আল-হামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু এবং আল্লাহু আকবার। এছাড়াও বিভিন্ন হাদীসে তাকবীরের গুরুত্ব ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।

🕋 সাহাবায়ে কেরামদের আমল।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীগণ এই দিনগুলোতে সর্বদা আল্লাহু আকবারের ধ্বনি তুলতেন। সহীহ বুখারী শরীফের হাদীসে এসেছে- “হযরত ইবনে উমর (রাঃ) ও আবু হুরায়রা (রাঃ) বাজারে গিয়ে তাকবীরের আওয়াজ তুলতেন। শুনে শুনে লোকেরাও তাদের সাথে তাকবীরের সুর তুলত”।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান- তাকবীর, তাহলীল ও তাহমীদ সমন্বিত ‘তাকবীরে তাশরীক’ অত্যন্ত গুরুত্ব ও ফযিলতের একটি আমল।

🕋 মাসআলায়ে তাকবীরে তাশরীক।

তাকবীরে তাশরীকের কিছু মাসআলা রয়েছে যেগুলো জানা প্রত্যেক নামাজী ব্যাক্তির জন্য জরুরী। তাই কিছু মাসআলা নিচে উপস্থাপন করা হলো।

✍ হযরত ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ (রহঃ) মতে ফরয নামায আদায়কারী প্রত্যেক মুসলমান, চাই সে পুরুষ হোক কিংবা মহিলা হোক, গোলাম হোক, কিংবা স্বাধীন হোক, মুসাফির হোক, কিংবা মুকীম হোক, একাকী আদায়কারী হোক কিংবা জামায়াতে আদায়কারী হোক বা মাসবুক হোক সবার জন্য তাকবীরে তাশরীক ওয়াজিব। (নুরুল ইজাহ, মারাকিল ফালাহ ও দুররুল মুখতার)

✍ ৯ জিলহজ্জ ফজরের নামাজ হতে ১৩ জিলহজ্জ আসর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরয নামাযের পরক্ষণেই অনতিবিলম্বে তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা ওয়াজিব। (নুরুল ইজাহ ও দুররুল মুখতার)

✍ছাহেবাইনের মতে একবার বলা ওয়াজীব। এর চেয়ে বেশি বলা উত্তম। (দুররুল মুখতার)

✍ পুরুষগন উচ্চ আওয়াজে আর মহিলাগন নিম্ন আওয়াজে তাকবীর পাঠ করবে। (তাহতাবী)

✍ ইমাম সাহেব যদি তাকবীর পাঠ করতে ভূলে যান তাহলে যে কোন মুক্তদি তাকবীর পাঠ করবে। (হেদায়া)

✍ মুস্তাহাব হলো মুক্তাদীগন ইমাম সাহেবের সাথে তাকবীর বলবেন। তবে কেউ যদি ইমাম সাহেবের আগেই শুরু করে দেন তাহলে কোন গুনাহ হবে না। (আলমগীরী)

✍ যদি সবাই অথবা কোন একজন তাকবীর বলতে ভুলে যাওয়ার পর মাসজিদে থাকা অবস্থান মনে পড়ে তাহলে তাকবীর আদায় করে নিবে। আর যদি মাসজিদ থেকে বের হয়ে যায় তাহলে এই ওয়াজিব ছুটে যাবে। এই ওয়াজিবের কোনো কাযা নেই এবং ওয়াজিব ছেড়ে দেওয়ার কারণে ঐ ব্যক্তি গুনাহগার হবে। (মাবসূত সারাখসী, বাদায়েউস সানায়ে ও ফাতাওয়া হিন্দিয়া)

✍ আইয়্যামে তাশরীকের পাঁচ দিনের মধ্যে কোন নামাজ কাযা হয়ে গেলে তা যদি এ পাঁচ দিনের মধ্যেই আদায় করা হয় তাহলে এ কাযা নামাযের পর তাকবীরে তাশরীক বলতে হবে। কিন্তু পূর্বের কোন কাযা নামাজ আইয়্যামে তাশরীকে আদায় করলে তাকবীরে তাশরীক বলবে না। (আল-বাহরুর রায়েক, আল-মুহীতুল বুরহানী ও ফাতাওয়া হিন্দিয়া)

✍ ফরয নামাজের সালাম ফিরানোর পর যদি কারো ওযু নষ্ট হয়ে যায় তাহলে নতুন ওযু করা লাগবে না। ওযু ছাড়া তাকবীর পাঠ করে নিবে। (আলমগীরী)

🤲 আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই সম্মানিত দিন সমূহে বেশি বেশি তার যিকির ও তাকবীর পাঠ করার তৌফিক দান করুন। (আমিন)

চলবে ইনশা আল্লাহ

 

লেখক: ইমাম ও খতিব ওল্ডহাম জামে মাসজিদ, যুক্তরাজ্য।