গল্পঃ আব্বাজান ।। জালাল উদ্দিন লস্কর শাহীন

প্রকাশিত: ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০২০ | আপডেট: ১২:৪৯:পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০২০

উজানতলী গ্রামের ফজর আলী দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর কিছুদিন আগে বাড়ী ফিরে এসেছে।বাড়ীর সাথে কোনো যোগাযোগ না থাকায় পরিবারের লোকজন ধরেই নিয়েছিল ফজর আলী হয়ত আর বেঁচে নেই।একদিন ভোর বিয়ানে তাই ফজর আলীকে দেখে বাড়ীর লোকজন ভুত দেখার মতোই চমকে উঠে।ফজর আলীর মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে।মাথায় বাবরী চুলের মাঝখানে চুপ করে বসে আছে ঝমকালো টুপি,মুখে দাঁড়ি আর হাতে সুন্দর তসবিহ।ফজর আলীর বৃদ্ধা মা জমিলা বেগম এতোদিন ধরে পুত্রশোকে প্রায় শয্যাশায়ী।ফজর আলীর আগমন সংবাদে অনেক কষ্টে বিছানায় উঠে বসেই পরম করুনাময়ের উদ্দেশ্যে শোকরানা সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন।অনেক সময় সিজদায় কাটিয়ে দিয়ে আবার সোজা হয়ে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিলেন।ফজর আলীও মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় শরীক হয়ে গেলো।মা ছেলের এই অভূতপূর্ব মিলনদৃশ্য দেখে বাড়ীর মানুষও অবাক।আশপাশের বাড়ী থেকেও নারী পুরুষ ভীড় করতে লাগলো ফজর আলীকে এক নজর দেখতে।তিন বছর আগে কাউকে কোনো কিছু না বলে বাড়ী থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল।তার মা জমিলা বেগম কত কবিরাজের কাছে গিয়েছে আর পীর ফকিরের দর্গায় ঘুরে ঘুরে চোখের পানি ফেলেছে তার কোনো হিসাব নেই।ফজর আলীর স্ত্রী সুখি বেগম কয়েক মাস পরেই নিজের পিতৃগৃহে ফিরে যায়।ফজর আলীর কোনো হদিস নেই দেখে সুখী বেগমের পিতা আরেক জায়গায় সুখি বেগমকে বিয়ে দিয়ে দেয়।বাড়ী থেকে নিরুদ্দেশ হওয়ার আগে ফজর আলী প্রায়ই রমাপুরের মোতাহার ফকিরের মাজারে যাতায়াত করতো।রাতের বেলায়ও একা একা মাজারে পড়ে থাকতো।খাওয়াদাওয়া নিয়ে তার তেমন চিন্তাভাবনা ছিল না।জনশ্রুতি আছে মোতাহার ফকির কামেল ওলী আল্লাহ টাইপের লোক ছিলেন।জীবদ্দশায় তার কাছে গিয়ে অনেকেই সৎ পরামর্শ আর উপকার লাভে ধন্য হয়েছে।নির্লোভ সংসার বিরাগী মোতাহার ফকির হঠাৎ একদিন আছরের নামাযের সময় সিজদারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে কামেল ওলী হিসাবে তার নামডাক সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।মোতাহার ফকিরের কবরকে পাকা করে মাজারের রূপ দেয় তার ছেলেরা।লোকজন মাজারে এসে মনের আশা পূরনের নিয়তে মানত করতে শুরু করে।অনেকের আশা পূরন হলে মাজারের কাছাকাছি স্থানে গরু ছাগল জবাই করে শিরনীর আয়োজনও চলতে থাকে।মাজারে আগত লোকজন মরহুম মোতাহার ফকিরের বড় ছেলে আজমান আলীকেই পীরের উত্তরসূরী ধরে নিয়ে সবকিছুতেই তার মতামত ও পরামর্শ নেওয়া শুরু করলে সমাজে হঠাৎ করেই আজমান আলীর প্রভাব বেড়ে যেতে শুরু করে।

আজমান আলী কিছুদিন ধামতি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছে।তবে সে কি পাশ তা কেউ সঠিকভাবে বলতে পারে না।এক শুক্রবারে মাজারে আগত লোকজনের সংখ্যা হঠাৎ করেই বেড়ে যায়।বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেকেই গরু ছাগল নিয়ে এসেছে পীরের মাজারে শীর্নির আয়োজন করবে বলে।সবাই এসে আজমান আলীর সাথে দেখা করে পা ছুঁয়ে সালাম করে তাদের মনের আশা কিংবা নিয়ত পুরন হয়েছে বলে জানায়।কেউ কেউ পীর মোতাহার আলীকে স্বপ্নে দেখে তার কাছ থেকে কি উপদেশ পরামর্শ লাভ করেছে ইনিয়ে বিনিয়ে সে বর্ণনাও দেয়।আজমান আলী পুলকিত হয়।আজমান আলী সবাইকে জানিয়ে দেয় বাদ জুমা রান্নাবান্না শেষে সবাইকে নিয়ে সে দোয়া করবে।তাদের মনের দুঃখ বেদনা আশা আকাঙ্খার কথা মোতাহার ফকিরের ওসিলা দিয়ে মৌলার দরবারে পেশ করবে।সবাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠে।মনে মনে ভাবে যাক এতোদিনে মাজারের একজন তত্বাবধায়ক তাহলে পাওয়া গেলো। মোতাহার আলীও নিজের ভবিষ্যত পরিকল্পনা মোতাবেক নতুন পরিকল্পনা সাজাতে থাকে।

 

এই মোতাহার ফকিরের মাজারেই একদিন গভীর রাতে আধোঘুমে থাকা ফজর আলী হঠাৎই যেন শুনতে পায় কে একজন অদশ্য থেকে তাকে বলছে, ‘ ফজর আলী তুমি দিল্লীর  নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার মাজারে গিয়ে সেখানে নিজেকে খেদমতে নিয়োজিত কর।সেইদিন বেশী দূরে নয়

যখন তোমার মাধ্যমে এই এলাকা সারাদেশে পরিচিত হবে।’

ফজর আলীর সারা রাত আর ঘুম হয় না।ফজরের নামাজের শেষে মাজারে বসে অনেক কান্নাকাটি করে।দোয়া দুরুদ পড়ে।বেলা উঠলে আজমান আলীর সাথে দেখা করে রাতের ঘটনা সবিস্তারে খুলে বলে।সব শুনে আজমান আলী বলে তোমার উপর আমার আব্বাজানের নেক নজর আছে।আমিও তোমার রুহানী পিতা।এখন থেকে আমাকে তুমি আব্বা সাহেব বলে ডাকবে।আমি তোমাকে আদেশ করছি  কাল-বিলম্ব না করে তুমি দিল্লীতে যাও।

বাড়ী ফিরে আজমান কাউকে কিছু না বলে পরের দিন একটা ছোট হাত ব্যাগ সম্বল করে দিল্লীর পথে পা রাখে।অনেকটা গৌতম বুদ্ধের মতো!সংসার আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে বুদ্ধ স্ত্রী লোপা এবং একমাত্র পুত্রের মায়া আর রাজ্যাধিপতি হওয়ার বাসনা ত্যাগ করে গৃহত্যাগী হয়ে লুম্বিনীতে বোধিবৃক্ষের নিচে দীর্ঘদিন সাধনা করে নির্বাণ লাভ করেছিলেন।ফজর আলী তো দিল্লীতেই যাচ্ছে!

এদিকে আজমান আলীর কপাল খুলতে শুরু করেছে।মোতাহার ফকিরের মাজারে প্রতিদিন মানুষের আনাগোনা বেড়েই চলেছে।সেই সাথে আয় রোজগার বেড়ে চলেছে আজমান  আলীর। লোকজন নিজেদের নানা সমস্যার কথা বলে আজমান আলীর কাছ থেকে দোয়া নেয়।সাথে তাবিজ পড়া পানি আর ‘তাগা পড়া’।তাগা পড়া দেয় নিঃসন্তান দম্পতিদের সন্তান হওয়ার আশায়।স্বাভাবিক কারনেই যাদের সন্তান জন্ম নিতে বিলম্ব হয় তাদের অনেকে ডাক্তারের কাছে যেতে চায় না।কেউ কেউ টাকার জন্যও যেতে পারে না।তারা এখানে এসে ভীড় করে আজমান আলীর কাছে।আজমান আলীর তাগা পড়া ব্যবহারের পর অনেকেরই সন্তান জন্ম নিয়েছে! আজমান আলীর পশার বেড়ে যায়।নামডাক ছড়িয়ে পড়ে।কিছুদিন আগে উঠতি এক নেতা উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করবে বলে আজমান আলীর কাছে দোয়া নিতে আসে বিশাল গাড়ী বহর আর কর্মীর দল নিয়ে।আজমান আলী দোয়া করে দেয়।ওই নেতা ১০ টি গরু দিয়ে শিরনী করার জন্য নগদ টাকা দিয়ে যায় আজমান আলীকে।আজমান আলী ৩ টা গরু জবাই করে শিরনীর আয়োজন করে।কাকতালীয়ভাবে ওই নেতা নির্বাচনে পাশ করে উপজেলা চেয়ারম্যান হয়ে যান।আজমান আলীর প্রতি তার ভক্তি শ্রদ্ধা বহুগুন বেড়ে যায়।

কিছুদিন পরে মাজারের উন্নয়নে মোটা অংকের টাকা বরাদ্ধ দেন তিনি। আজমান আলীর কাছে মুরিদও হন।জমজমাট হয়ে উঠে আজমান আলীর পীরমুরিদী।আজমান আলী এরপর প্রভাবশালী কিছু মুরিদকে নিয়ে সভা করে সবাইকে জানিয়ে দেয় মাজারে শায়িত আল্লাহর ওলী তাকে স্বপ্নে নির্দেশ দিয়েছেন চলতি বছর থেকে নিয়মিত বার্ষিক মাহফিলের আয়োজন করতে হবে।তারিখও বলে দিয়েছেন।মাঘ মাসের শেষ সোমবারে করতে হবে বার্ষিক মাহফিল।সবাই বিনাবাক্যব্যয়ে আজমান আলীর কথা মেনে নেয়।এখন কার্তিক মাস চলছে।মাঘ আসতে ঢের দেরী।প্রত্যেক গ্রামের মুরিদানদের কাছে এই খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য উপস্থিত সবাইকে নির্দেশ দেয় আজমান আলী।পোস্টার ছাপানোর জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় করিমপুরের সালামত মাস্টারকে।পীরভক্ত সালামত মাস্টার খুবই সহজ সরল মানুষ।এখন সর্বসাকুল্যে দশ হাজার মুরিদ আছে আজমান আলীর।এ সংখ্যাটাকে বছর দুয়েকের মধ্যেই লাখে নেওয়ার টার্গেট আজমান আলীর মনে।বার্ষিক মাহফিলের প্রধান অতিথি করা হয় উপজেলা চেয়ারম্যান করিম মিয়াকে।পোস্টারেও সে কথা লিখে দেওয়া হয়।সারা এলাকায় সাড়া পড়ে যায়।আজমান আলী মানুষের এমন অন্ধ বিশ্বাস আর বোকামী দেখে নিজের উপর ভরসা পায়।মনে মনে হাসে।

 

এদিকে ফজর আলী পতঙ্গের আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার মতোই এক সন্ধ্যার আঁধারে রহিতখোলা সীমান্তে পৌঁছে যায়।সীমান্ত রক্ষীদের কড়া চোখ ফাঁকি দিয়ে দালালের সহায়তায় সীমানা অতিক্রম করে ভারতীয় ভূখন্ডে পা রাখে।দিল্লীর মাজারে যাবে শুনে দালালেরও মন নরম হয়।খুব কম খরচাপাতি নেয় ফজর আলীর কাছ থেকে।অচেনা অজানা দেশে কিভাবে দিল্লী যাবে ফজর আলী জানে না।রহিতখোলা থেকে বলতে গেলে তার অজানা অচেনা মুল্লুক শুরু হয়।খুব বেশী টাকা পয়সাও সাথে নেই।চোখের টাহরে মসজিদ খুঁজে নিয়ে রাত কাটাতে থাকে মসজিদের বারান্দায়।লোকজন তেমন বিরক্তও করে না।ভাষার সমস্যায় পরতে হয় নাফজর আলীকে।এখানকার প্রায় সবাই শুদ্ধ বাংলায় কথা বলে।কথার মূলভাব ধরতে পারলেও সে নিজে তো আর সেভাবে কথা বলতে পারে না।স্থানীয় দুএকজনের সাথে ভাব জমিয়ে দিল্লী যাওয়ার বিষয়ে কিছুটা ধারণা লাভ করে।এখান থেকে বাসে চড়ে কোলকাতা হয়ে তারপর ট্রেনে দিল্লী।একদিন সকাল সকাল শান্তিমোড়া বাস টার্মিনাল থেকে কোলকাতার বাসে চেপে বসে ফজর আলী।কোলকাতা পৌঁছতে পৌঁছতে বেশ রাত হয়ে যায়।রেল স্টেশন কোথায় জানা নেই ফজর আলীর।বেশভূষাও তেমন ভালো নয়।সন্দেহজনক ঘোরফেরার কারনে পুলিশ তাকে আটক করে।ফজর আলীর কাছে পাসপোর্ট ভিসা কিছুই না পেয়ে তার বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশের অপরাধে ফরেনার্স অ্যাক্টে  মামলা দিয়ে পরদিন কোর্টে চালান দেয় পুলিশ।কোর্ট  ম্যাজিস্ট্রেট তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।কারাগারে তার দিন কাটতে থাকে।কখন দিন হয় আর কখন রাত হয় ফজর আলী জানে না।এভাবেই তিন বছর কেটে যায়। একটি মানবাধিকার সংগঠনের নজরে আসে কোলকাতা সেন্ট্রাল জেলে বছরের পর বছর ধরে বিনাবিচারে আটক থেকে মানবেতর জীবন যাপন করছে শতাধিক বন্দী! বিষয়টি পত্রিকাতে ফলাও করে প্রচার করা হয়।দেশ জুড়ে হৈ চৈ পড়ে যায়।বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আসে।হাইকোর্ট স্বপ্রনোদিত হয়ে রুল জারী করে।কিছুদিনের মধ্যেই রুলের নিস্পত্তি হয়।সব বন্দীকে বিনা শর্তে মুক্তির আদেশ দেন হাইকোর্ট।অন্য সব বন্দীদের সাথে ফজর আলীও মুক্তি পায়।দুইদিন পর ভোর বেলায়  ফজর আলী চোখের বাঁধন খুলে নিজেকে এক অচেনা জনমানবহীণ জায়গায় আবিষ্কার করে।কিভাবে সে এখানে এসেছে আর কারাই বা তাকে এখানে নিয়ে এসেছে সেসবের কিছুই বুঝে উঠতে পারে না সে।এ সময় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর লোকজন এসে তাকে ধরে নিয়ে যায় তাদের ক্যাম্পে।ক্যাম্পে তার মতোই আরো কয়েকজনকে দেখতে পায় সে।কিছুই বুঝে উঠতে পারে না ফজর আলী।দুপুরে সবাইকে খাবার দেওয়া হয়।ক্যাম্পে আনার পর কেউ  কিছু জিজ্ঞাসাও করে না।রাতে সবাইকে নিয়ে আসা হয় সীমান্তের একদম কাছে।অতর্কিতে তাদের সীমানা পার করে (পুশ ব্যাক)দেওয়া হয়।তারা বাংলাদেশ ভূখন্ডে পা রাখে।খুব দ্রুততার সাথে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে সবাই।এখান থেকে কিভাবে নিজের এলাকায় যাওয়া যাবে সেই চিন্তায় অস্থির ফজর আলী খবর নিয়ে স্থাণীয় ইউনিয়ন অফিসে গিয়ে চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে দেখা করে।সবিস্তারে সব বলে চেয়ারম্যানের সাহায্য চায়।সব শুনে চেয়ারম্যান ফজর আলীর জন্য প্রথমেই নতুন কাপড় চোপড়ের ব্যবস্থা করেন।তারপর ফজর আলীর ঠিকানা গন্তব্য সব জেনে কিছু অর্থ সাহায্যও করেন যাতে সে ঠিকঠাক বাড়ী পৌঁছাতে পারে।এখান থেকে কয়েক মাইল দূরের বাস স্টপেজে গিয়ে ফজর আলী তার নিজের এলাকায় যাওয়ার জন্য বাসে চেপে বসে।৫০ মাইল গিয়ে তাকে আবার বাস বদল করে নিজ জেলা সুনামগঞ্জের বাস ধরতে হবে।বাড়ী পৌঁছাতে পৌঁছাতে পরের দিন সকাল হয়ে যাবে।বাস থেকে নেমে তার বাড়ী মাত্র আধা ঘন্টার পথ।বাড়ী গিয়ে সে কি বলবে! তার রূহানী পিতা আজমান আলীকে কি জানাবে।তার তো দিল্লী যাওয়াই হয় নি!সে সিদ্ধান্তে আসে গত তিন বছরে তার জীবনে ঘটে যাওয়া কোনকিছুই কোথাও বলবে না।সবকিছু বেমালুম চেপে যাবে।নিজের মনে সে এক নতুন গল্পের মহড়া দিতে শুরু করে।জেলে থেকে তার মাথা বেশ খুলেছে।

 

উজানতনলিতে ফিরে আসার পর সবার মনে একটা প্রশ্নই ঘুরছে এতদিন তবে ফজর আলী কোথায় ছিল!বাহ্যিক বেশভূষা দেখে যে কারোরই মনে হবে যেখানেই থাকুক ফজর আলী বেশ ভালই ছিল।ফজর আলীর প্রতি সবার মনে এক অদ্ভুত সম্ভ্রমবোধ ও সমীহ জেগে উঠে।তার স্ত্রী সুখী বেগমের অন্যত্র বিয়ে হয়ে যাওয়ার খবরে ফজর আলীর মনটা বিষিয়ে উঠে।খোঁজ নিয়ে জানতে পারে পাশের গ্রামের তজমুলের সাথেই সুখী বেগমের বিয়ে হয়েছে।সে স্বামীর ঘরে সুখী বেগমের এক ছেলে সন্তানও জন্ম নিয়েছে।ফজর আলী পণ করে যে করেই হউক তজমুলের ঘর থেকে সুখী বেগমকে খুইয়ে আনতে হবে।তবে এর আগে রমাপুরে গিয়ে আজমান আলী হুজুরের সাথে দেখা করা দরকার।দেখা করতে পারলে সব আলাপ হবে।সুখী বেগমের বিষয়টাও।

 

পরদিন সকাল সকাল ফজর আলী রমাপুরের উদ্দেশ্য রওয়ানা হয়ে যায়।বেশ দূরের পথ।হাঁটা রাস্তা।রমাপুর পৌঁছাতে পৌঁছাতে ফজর আলীর বারোটা বেজে যায়।তিন বছর আগের অতি পরিচিত জায়গা এবং পরিবেশটা তার কাছে কেমন জানি অচেনা অচেনা লাগে।মোতাহার ফকিরের মাজার থেকে একটু দুরে বেশ বড়সড় একটা দালান।সেখানে অনেক লোক আজমান আলী হুজুরের দেখা পাওয়ার আশায় বসে আছে।ঘর ভর্তি নানান তোহফা,হাদিয়া।গাছে পাকা শবরী কলার ছড়ি,ঠিল্লা ভর্তি খাঁটি দুধ,চালকুমড়া,দেশী মোরগ আরো কত কি।সবার ইচ্ছা নিজ হাতে হুজুরের হাতে দেবে।হুজুর খুশী হলেই লাভ।নিয়ত পুরা হয়ে যাবে সহজে।ফজর আলী কাউকে চিনতে পারে না।কয়েকজনকে দেখলো খুব ব্যস্ততার সাথে এদিক সেদিক ছুটাছুটি করছে।এরা এখানকার খাদেম ফজর আলী জানতে পারলো।জোহরের নামাজের পর আজমান আলী পীর সাহেব এলেন।জেল্লাদার চেহারায় নতুন রোশনাই।কারো দিকে না তাকিয়ে নিজের সিংহাসনরূপী আসনে গিয়ে বসলেন।তার পা ছুঁয়ে সালাম করতে উপস্থিত মানুষজন হুড়মুড়িয়ে পড়লো।আজমান আলী চোখ বন্ধ করে বসে আছেন।মুরিদদের ধারণা তিনি চোখ বন্ধ করে অনেক কিছু দেখেন!ফজর আলীর বিস্ময়ের সীমা থাকে না।হুড়োহুড়ি কমে আসলে ফজর আলীও আজমান আলীকে সালাম করতে এগিয়ে যায়।আজমান আলী চোখ খুলছেন না।

পিনপতন নিস্তবদ্ধতা ভেঙে আজমান আলী চোখ বন্ধ অবস্থায়ই হঠাৎ বলে উঠেন আমার এক মুরীদ তিন বছর দিল্লীর নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার মাজারে খেদমত আঞ্জাম দিয়ে দেশে ফিরেছে।সবাই মাশাল্লাহ কন মিয়ারা।আজমান আলীর এমন কেরামতিতে ফজর আলীও চমকিত হয়।অতপর চোখ খুলেন আজমান আলী।ফজর আলীর মাথায় হাত বুলিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলেন এই সেই মুরিদ যে আমার আজ্ঞা পালন করতে সংসারের মায়া ত্যাগ করে দেশ ছেড়ে দিল্লীতে গিয়ে নিজাম উদ্দিন(রঃ) এর মাজারের খেদমত আঞ্জাম দিয়ে এসেছে।উপস্থিত লোকজন পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ী করতে থাকে।ফজর আলী নিজেকে গুরুত্বপূর্ন মুরিদ  ভাবতে থাকে! অনেক সময় নিয়ে  দোয়া হয়।সকলের নেক মকসুদ পুরনের জন্য বিশেষ দোয়া।এর আগে কার কি মকসুদ মোনাজাতের সময় সেই অনুযায়ী মনে মনে নিয়ত করতে বলে দেন আজমান আলী হুজুর।

 

আস্তে আস্তে ভীড় কমতে থাকে।দূরদূরান্ত থেকে আসা মুরিদানেরা যার যার গন্তব্যে রওয়ানা দেওয়ার আগে যার যার সাধ্য অনুযায়ী হুজুরের হাতে নগদ হাদিয়া দিয়ে আরেকবার দোয়া নিয়ে যায়।সবাই চলে গেলে আজমান আলী হুজুর ফজর আলীকে নিয়ে বাড়ীর ভেতরে চলে যান।আগেই খবর দেওয়া হয়েছে হুজুরের সাথে একজন বিশেষ মেহমান খাবেন!খেতে খেতে আজমান আলী দিল্লীর নিজাম উদ্দিনের দরগাহে থাকাকালীন সময়ের অনেক কিছুই ফজর আলীর কাছে জানতে চান।ফজর আলী কল্পনায় ভর করে অনেককিছুই বলে যায়।স্বপ্নে কয়েকদিন কয়েকজন সৌম্যকান্তি দরবেশ আজমান আলীর কথা জানতে চেয়েছেন তার কাছে।শুনে আজমান আলী যারপর নাই খুশী হন।ফজর আলীকে জানিয়ে দেন যেন লোকমুখে এ কথা সবখানে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।লোকেরা আজমান আলীর আধ্যাত্মিক ক্ষমতা সম্পর্কে জানুক!একই সাথে ফজর আলীকে দরবারের প্রধান খাদেম পদে আসীন করে দেন।ফজর আলীর গুরুত্ব বেড়ে যায় সকলের কাছে।প্রতিদিন দরবারে আগত লোকজনের কাছে কায়দা করে ফজর আলী তার স্বপ্নের কথা বলে যায়।লোকজন বুঝে না বুঝে ওঃ আহ করে চোখে পানি আনার চেষ্টা করে নিজেদের মধ্যে এক অদ্ভুত প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হয়।সবার ইচ্ছা কার চেয়ে কে বেশী হুজুরের নেক নজরে থাকবে।দিনেদিনে ফুলেফেঁপে উঠে আজমান আলী হুজুরের দরবার।

 

ফজর আলী হুজুরের খেদমতেই থাকে।সাধ্যমত হুজুরের মন খুশী রাখার চেষ্টার কমতি নেই তার।

হুজুরও তাকে অনেক বেশী  মায়া করেন।হাতখরছের টাকাও দেন।তারপরও ফজর আলীর মনে শান্তি নেই।সুখী বেগমের জন্য তার প্রাণ কাঁদে।আজ যদি সুখী বেগম থাকতো কতোই না খুশী হতো!চিন্তা করে হুজুরের কাছে কথাটা বলবে।হুজুরের দোয়ায় যদি সুখী বেগম আবার তার ঘরে ফিরে আসে।আবার নিজের মনে নিজেই হুজুরের কেরামতি নিয়ে নানান প্রশ্ন করতে থাকে।সে যে কোলকতায় তিন বছর জেলে ছিল এটাই ধরতে পারলেন না! তার বলা মিথ্যা কথা,মিথ্যা স্বপ্ন সব বিশ্বাস করে নিলেন।মানুষের কাছে আবার প্রচারও করছেন এসব!

যাক এতো ভেবে লাভ নেই।নিজের কোনো কামাই রুজির মুরোদ নেই এটা ফজর আলীও জানে।পেট চালাতে হবে না?কে খাওয়াবে তাকে?ঘরে মা আছে।বিধবা একটা বোনও আছে।

 

একদিন একসাথে খেতে বসে আজমান আলী হুজুর ফজর আলীকে বলেনঃ

‘ প্রায় সময়ই তোমাকে মন খারাপ করে থাকতে দেখি।বিষয় কি ফজর আলী মিয়া?

-কোনো সমস্যা নাই আমার আব্বাজান।তয় একটা কষ্ট আছে আমার মনে।সেবার দিল্লীতে যাওনের পর আমার স্ত্রী সুখী বেগম আরেক জায়গায় বিয়ে করেছে। আমি সুখীরে অনেক ভালবাসতাম।এখনও বাসি।ভুলতে পারি না।

-সব ঠিক হয়ে যাবে ফজর আলী।আমি তোমাকে এমন তদবীর দেবো তোমার সুখী উড়ে উড়ে তোমার পায়ে এসে পড়বে।

-তাই দেন আব্বাজান।

মনেমনে হুজুরের কেরামতী সম্বন্ধে সন্দেহ বাড়তে থাকা ফজর আলীর বিশ্বাস হয় না যে সুখী বেগম আবার স্ত্রী রূপে তার ঘরে ফিরে আসবে।

 

সপ্তাহখানেক পরের একদিন দুপুরের একটু আগে ফজর আলী দেখতে পায় কোলে ফুটফুটে এক শিশু নিয়ে একটা কম বয়সী মহিলা হুজুরের বাড়ীর অন্দর মহলের দিকে যাচ্ছে।অবিকল সুখী বেগমের মতো। এসব সে কি ভাবছে!কতোমানুষই এখানে হুজুরের কাছে আসে।হুজুরের খাসকামড়ায়ও ফজর আলীর প্রবেশাধিকার আছে।সিদ্ধান্ত নেয় সে কিছুই জানে না এমন ভাব করে খাসকামড়ায় যাবে।দেখতে চেষ্টা করবে আসলেই সে সুখী বেগম কি না।খাসকামড়ার পাশে দাঁড়িয়ে ফজর আলী শুনতে পায় হুজুরের কাছে সুখী বেগম বলছে তার স্বামী তার খোঁজখবর নেয় না।কই যায় কই থাকে।হুজুরের কাছে দোয়া চাইতে এসেছে।সুখী বেগমকে দেখে হুজুরের চোখ চকচক করে উঠে।তার ভেতরের সাপটা হিসহিস করে উঠে।তাকে সাহস দিয়ে বলেন সব ঠিক হয়ে যাবে।সুখী বেগমকে আজ রাতে থাকতে হবে।নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে।কেউ তার কোনো অনিষ্ট করতে পারবে না।এ সময় ফজর আলী গলা খাকাড়ি দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে।আরে তার ধারণাই তো ঠিক।এ যে সুখী বেগম।তার এক সময়ের অনেক

আদরের স্ত্রী।ফজর আলীকে দেখে সুখী বেগম মাথায় ঘোমটা টানে।

আজমান আলী হুজুর ফজর আলীকে বলেনঃ

-এই মেয়েটার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা কর।ও আজ রাতে থাকবে।রাত বারটায় বিশেষ তদবীরের মাধ্যমে কিরগিজিস্তান থেকে জ্বীনের মাধ্যমে রাজমোহিনী কবজ আনিয়ে দিতে হবে।

মেয়েটা খুব অসহায়।ওর কাছ থেকে কোনো খরচাপাতি নিও না ফজর আলী।

সুখী বেগম হুজুরের এমন মহানুভবতা দেখে মুগ্ধ হয়।হুজুরকে খুব ভালো মানুষ বলেই মনে হয় তার কাছে।

হুজুরের নির্দেশ মতো ফজর আলী একটা বিশেষ কামড়ায় সুখী বেগমের থাকার ব্যবস্থা করে।খাবারদাবারও আসে সময়মতো।এখানে হুজুরের ইচ্ছার বাইরে কিছুই হয় না।এর মধ্যে সুখী বেগমের কাছে আর কেউই আসে নি।

রাত সাড়ে এগারোটায় ফজর আলীকে ডেকে হুজুর আজমান আলী জানান সুখী বেগম যেখানে আছে সেই কামড়ায় গোলাপজল ছিটানো হউক।আগরবাতি জ্বালানো হউক।পবিত্র একটা আবহ তৈরী হয়েছে সেই কামড়াটিতে।বারোটা বাজার ঠিক এক মিনিট আগে আজমান আলী এসে কামড়াতে ঢুকে দরজা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিলেন।

ফজর আলীকে দরজা পাহড়ায় লাগিয়ে গেলেন।বলে গেলেন কেউ যেন তাকে বিরক্ত না করে!

পরদিন সকাল সকাল হুজুরের দেওয়া জীনের তাবিজ আর কিছু অদ্ভুত স্মৃতি নিয়ে রমাপুর ছেড়ে যায় সুখী বেগম।

 

 

 

#ডিসক্লেইমারঃ গল্পে বর্ণিত ঘটনা, স্থান, কাল এবং পাত্র পাত্রী সব কাল্পনিক।বাস্তবতার সাথে কোন মিল নেই।

 

জালাল উদ্দিন লস্কর শাহীন।সহকারী শিক্ষক,উপজেলা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়।মাধবপুর,হবিগঞ্জ।