দক্ষিণ এশিয়ার ট্রানজিট প্রাণকেন্দ্র হতে পারে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল

প্রকাশিত: ১১:২৮ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৭, ২০২০ | আপডেট: ১১:২৮:পূর্বাহ্ণ, জুন ২৭, ২০২০

রাজেশ রৌহাজি, এরিস নোরা, মুনেজা মেহমুদ আলম।মাঝে মাঝেই বাংলাদেশকে আঞ্চলিক লজিস্টিক এবং ট্রানজিটের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চিহ্নিত করা হয় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সেতুবন্ধন হিসেবে। বর্তমানে এই উচ্চাকাঙ্খা বাস্তবে রূপ পেতে পারে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে, যেখানে ভারতের সঙ্গে দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত শেয়ার করছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া এ অঞ্চলে আছে বড় বড় সামুদ্রিক ও স্থল বন্দর। যেমন মোংলা, পায়রা, বেনাপোল ও ভোমরা। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের ভোমরা স্থলবন্দর থেকে হাটিকুমরুল পর্যন্ত ২৬০ কিলোমিটার মহাসড়ক আধুনিকায়ন করার মাধ্যমে একটি দুই লেনের সিঙ্গেল পণ্যবাহী লেনকে পরিণত করা হবে ‘স্টেট অব দ্য আর্ট’-এ এবং জলবায়ুর সঙ্গে উপযোগী চার লেনের ডুয়েল ক্যারিজওয়েতে।
যেহেতু বৃহৎ পরিবহন বিষয়ক করিডোর উন্নততর সমৃদ্ধি এনে দিতে পারে, তাই অর্থনীতিতে তাদের পূর্ণাঙ্গতা অর্জন করতে হলে প্রয়োজন পরিপূরক হস্তক্ষেপ। এই দিক থেকে সেকেন্ডারি এবং টার্সিয়ারি সড়ক ও লজিস্টিক অবকাঠামো, যেমন স্টোরেজ এবং প্যাকেজিং ফ্যাসিলিটিজগুলো, কালেক্টিং পয়েন্ট তৈরি হতে পারে, যা করিডোর বরাবর স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আনতে পারে।

বিশ্ব ব্যাংক ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের সমর্থনে বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে ওয়েস্টার্ন ইকোনমিক করিডোর এন্ড রিজিওনাল এনহ্যান্সমেন্ট (উইকেয়ার) কর্মসুচিতে সড়কগুলোর উন্নয়ন করা হলে তা অতিক্রম করবে ১০টি জেলার ভিতর দিয়ে। এসব জেলায় বসবাস দুই কোটির ওপরে মানুষের। এতে স্থানীয় ভোক্তা ও স্থানীয় সম্প্রদায় উপকার পাবেন। বিশেষ করে সুবিধা পাবেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের কৃষক ও উদ্যোক্তা, যারা নাজুক পরিবহন ব্যবস্থা এবং দুর্বল লজিস্টিক কারণে দুর্ভোগ পোহান।

ব্যবসায় ও ভোক্তাদের সংযুক্তিকরণের ক্ষেত্রে, বাণিজ্য ও ভোক্তারা সমৃদ্ধ হবেন। এর ফলে আয় বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থান হবে। আধুনিকায়ন করা এই মহাসড়ক বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে। এ অঞ্চলটি দেশের অন্য অংশ থেকে পিছিয়ে আছে। ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে দারিদ্র্য উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে। এই দারিদ্র্য কমেছে দেশের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলীয় বিভাগগুলোতে। বাংলাদেশের অন্য অংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রবৃদ্ধির বৃদ্ধি এখানে অনেক কম।

যশোরের ফুলচাষী মাসুমা সাজিদা বেগম। মার্কেট সুবিধা সহজ হওয়ার সুবিধা যে বিপুল সংখ্যক মানুষ ভোগ করবেন তিনি তাদের অন্যতম।। তিনি আরো ভালভাবে মার্কেটের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন। ফলে তিনি আরো তথ্যভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবেন। মাসুমা বলেন, বাজারে ফুলের দাম কি তা আমরা জানি না। মধ্যস্বত্বভোগী আমাদের কাছ থেকে ফুল কিনে নিয়ে মার্কেটে বিক্রি করে। তারপরেই আমরা জানতে পারি বাজারে ফুলের দাম অনেক বেশি। কিন্তু আমাদেরকে অনেক কম দামে বিক্রি করে দিতে হয়। এভাবেই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।
এই সড়ক সংযুক্তিতে ধীর গতির যানবাহনে থাকবে আলাদা লেন। ফলে এই মহাসড়ক ব্যবহারকারীরা অধিক নিরাপদ বোধ করবেন। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারকারীদের জন্যই করিডোরের দুই দিকে নির্মাণ করা হবে লেন। ডিজিটাল সংযুক্তি এবং ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমের মতো স্মার্ট সিস্টেম সমর্থনের জন্য করিডোর বরাবর স্থাপন করা হবে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল। এর মাধ্যমে জরুরি সাড়া ও ব্যবসায় অব্যাহত রাখার ধারা উন্নত হবে। কোভিড-১৯ হুমকির মুখে বাংলাদেশের কাছে এ বিষয়টি অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে। যেহেতু কোডিভ-১৯ খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইনে আরো চাপ বাড়িয়েছে, তাই এক্ষেত্রে লজিস্টিক খরচ কমাবে এই ব্যবস্থা এবং শস্য বা পণ্য ঘরে তোলার পর পরিবহনকালের ক্ষতি উল্লেখযোগভাবে কমে যাবে বলে আশা করা হয়। এই কর্মসূচিতে কম উন্নত ওই এলাকার এবং সেখানকার ঝুঁকিতে থাকা মানুষ, যেমন নারীদের এই করিডোর থেকে সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেবে।

এই কর্মসূচির প্রথম দফায়, বাংলাদেশ সরকারকে ৫০ কোটি ডলার দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। তা দিয়ে যশোর থেকে ঝিনাইদহ পর্যন্ত ৪৮ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক নির্মাণ করা হবে। ৬০০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে বিভিন্ন গ্রাম, উপজেলা ও ইউনিয়নের সড়ক সংযুুক্তিতে। এতে সংযুক্ত করা হবে প্রায় ৩২টি মার্কেটকে। নির্বাচিত কৃষিজ মূল্য আছে এমন চেইনের সঙ্গে যুক্ত থাকবে স্টোরেজ, গ্রেডিং, শর্টিং, প্যাকেজিং, কালেক্টিং এবং বিক্রয়কারী স্থাপনা।

প্রাথমিক এই বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কোভিড-১৯ মহামারির পরে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে সমর্থন দেবে, বিশেষ করে খুব ঝুঁকিতে থাকা মানুষ, যারা শুধুই দিনমজুর। প্রথম ২৪ মাসে গ্রাম এলাকায় শ্রমনির্ভর প্রায় ১ লাখ দিনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।

সবশেষে, ভুটান, নেপাল ও ভারতের জন্য প্রবেশদ্বার হিসেবে কৌশলগত ভৌগলিক অবস্থানে থাকার কারণে এর পূর্ণ সুবিধা ভোগ করতে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলকে সাহায্য করবে উইকেয়ার। এই করিডোর বেনাপোল ও ভোমরা স্থলবন্দরে চলাচল ও বাণিজ্যকে সহজতর করবে। এই দুটি স্থলবন্দর হলো বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আন্তঃসীমান্তে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত বন্দর। অধিকতর সংযুক্তিতে অভাবনীয় সুবিধা পাবে বাংলাদেশ। এতে তার বাণিজ্যিক সেবা সহজ হবে। ট্রানজিট ফি হিসেবে স্থলবন্দর এবং সড়ক পরিবহনের চার্জ থেকে আয় বাড়বে। আর তাতে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক লজিস্টিক এবং ট্রানজিটের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠতে এ দেশকে সহায়তা করবে।

 

(বিশ্বব্যাংক ওয়েব সাইট  )