সিলেটে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল-ইউরোপে মানব পাচার করে যে তিন চক্র

প্রকাশিত: ১১:২৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৩, ২০২০ | আপডেট: ১১:২৬:অপরাহ্ণ, জুলাই ২৩, ২০২০

ইয়াহ্ইয়া মারুফ, সিলেট।তিনটি চক্র মিলে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মানব পাচার করে। স্থানীয় চক্র উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশ গমনেচ্ছুকদের সংগ্রহ করে জাতীয় চক্রের কাছে হস্তান্তর করে।জাতীয় চক্র ভারত ও শ্রীলংকা হয়ে লিবিয়ায় আন্তর্জাতিক চক্রের কাছে হস্তান্তর করে। ২০১৯ সালের ৯ মে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি মারা যাওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামার চার্জশিটে এ কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

সিলেটের আলোচিত মানব পাচারকারী এনামুল হকসহ ২০ মানব পাচারকারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া আবদুল আজিজের ভাই ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মুহিদপুর গ্রামের মফিজ উদ্দিন।মামলাটি সিআইডির ইকোনমি ক্রাইম স্কোয়াড প্রায় এক বছর তদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দিয়েছে। সিলেটের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাওছার আহমদের আদালতে তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক শহিদুল ইসলাম খান মানব পাচার ও মানিলন্ডারিং মামলার পৃথক দুটি অভিযোগপত্র জমা দেন।

অভিযোগপত্রে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রের মূলহোতা এবং সহযোগীদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। তারা হল- সিলেটের রাজা ম্যানশনের নিউ ইয়াহিয়া ওভারসিজের মালিক ও গোলাপগঞ্জের পনাইরচক গ্রামের এনামুল হক, তার ম্যানেজার জায়েদ আহমেদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানার ছোট দেওয়ানপাড়ার রাজ্জাক হোসেন ভূইয়া, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি থানার কালিকাপুর গ্রামের লিবিয়া প্রবাসী নাসির উদ্দিন রুমান ওরফে গুডলাক ও সহযোগী দুই ভাই মনজুর হোসেন রুবেল, ইয়াকুব রিপন। এদের মধ্যে এনামুল ও রাজ্জাক কারাগারে আছে। বাকিরা পলাতক। এছাড়া অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ঢাকার সাইফুল ইসলামকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, মানব পাচারকারী স্থানীয় চক্রটি স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে বিদেশ যেতে আগ্রহীদের মাত্র চার লাখ টাকায় ইতালি গিয়ে উচ্চ বেতনের চাকরিসহ নানা প্রলোভন দেখিয়ে রাজি করায়। এনামুল বলে যে, এখন মাত্র চার লাখ টাকা দেবেন। বাকি আট লাখ টাকা ইতালি গিয়ে চাকরি করে বেতন হাতে পেয়ে দেবেন। এমন লোভনীয় অফার দিয়ে লোকজনকে রাজি করিয়ে নিয়ে যায় রাজ্জাকের কাছে।

রাজ্জাক ভারতের বেনাপোলে নিয়ে টিকিট, পাসপোর্টসহ অন্যান্য কাগজপত্র বিদেশ যেতে ইচ্ছুকদের হাতে দেয়। এরপর শ্রীলংকা হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে আন্তর্জাতিক চক্রের হোতা গুডলাকের কাছে হস্তান্তর করে।গুডলাক ও তার ভাইয়েরা মিলে লিবিয়ার অজ্ঞাত স্থানে ছোট ছোট দুটি ঘরে আটকে রেখে ইউরোপ গমনেচ্ছুকদের টাকার জন্য অমানুষিক নির্যাতন শুরু করে। আত্মীয়-স্বজনদের কাছে ছবি পাঠিয়ে জনপ্রতি আট লাখ টাকা করে দ্রুত টাকা পাঠাতে বলে। স্বজনরা যোগাযোগ করলে এনামুল জানায়, গুডলাক ও তার ভাইয়েরা খুবই খারাপ লোক। তাদের কথামতো বিকাশ অ্যাজেন্ট নাম্বারে ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দেন। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কোনো ধরনের কথা বলবেন না। কোনো উপায় না পেয়ে এনামুলের কথামতো স্বজনরা জনপ্রতি চার লাখ টাকা করে পাঠান রাজ্জাকের ব্রাদার্স গ্লোবাল নেটওয়ার্কের ব্র্যাক ব্যাংকের মতিঝিল শাখার অ্যাকাউন্টে। এ ছাড়াও গুডলাকের পাঠানো দুটি বিকাশ নাম্বারে আরও আড়াই লাখ করে টাকা দেন। মামলার বাদী চারজনকে বিদেশ পাঠাতে মানব পাচারকারী চক্রকে সর্বমোট চৌত্রিশ লাখ টাকা দিয়েছেন।

পরে আন্তর্জাতিক চক্র ছোট ছোট দুটি নৌকায় ৮২ জন যাত্রী তুলে ভূ-মধ্যসাগর দিয়ে তিউনিশিয়া উপকূল হয়ে ইতালির উদ্দেশ্যে পাঠায়। ধারণক্ষমতার অধিক যাত্রী তুলে ভূ-মধ্যসাগর দিয়ে তিউনিশিয়া উপকূলে গিয়ে নৌকাডুবিতে বাংলাদেশিসহ অন্তত ৬৫ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

এদের মধ্যে মামলার বাদীর ভাই আবদুল আজিজ, চাচাতো ভাই লিটন মিয়া ও ফুফাতো ভাই আহমদ হোসাইন রয়েছেন। বাদীর চাচা বেলাল আহমদ তিউনিশিয়ার একটি ফিশিং নৌকার সহযোগিতায় বেঁচে যান। আন্তর্জাতিক একটি মানবাধিকার সংস্থা তাকে দেশে পাঠায়। তিনি সুস্থ হয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।

এ ছাড়াও অভিযুক্ত সবার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মানব পাচার ও মানিলন্ডারিং মামলা রয়েছে। গুডলাক, রিপন ও রুবেল দেশে অবস্থানকালে রাজধানীর ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় ছদ্ম নামে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। এলাকায় গিয়ে পরিচয় দেয় তারা ঢাকায় সাংবাদিকতা করে। অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়- প্রাথমিকভাবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মানব পাচার ও মানিলন্ডারিং অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে।

এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, মামলার এজাহার হয়েছিল পাঁচজনের বিরুদ্ধে। তদন্ত শেষে ছয়জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোপত্র দাখিল করেছি। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় একজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছি।

তিনি বলেন, তদন্তে আমরা তিনটি চক্রের সন্ধান পেয়েছি। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় চক্রের কাছ থেকে স্থানীয় চক্র জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা করে কমিশন পেত। আসামি এনাম এবং রাজ্জাকও সবকিছু শিকার করে। এছাড়া ইতোমধ্যে রাজ্জাক ও গুডলাকের টাকা সংগ্রহকারী বিকাশের অ্যাজেন্ট হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের ইমন টেলিকমের মালিক আবদুল কুদ্দুস ধনু মিয়া ও তার শ্যালক রাবেত মিয়া আদালতে শিকারোক্তি দিয়েছে।

শহিদুল ইসলাম খান জানান, মামলায় দুই আসামি, দুই সাক্ষী ও এক যাত্রী আদালতে শিকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ২ নং আসামি জায়েদ বর্তমানে দুবাই পলাতক আছে।

আন্তর্জাতিক চক্রের মূলহোতা গুডলাক লিবিয়া এবং ইতালিতে যাতায়াত করে। তার ছোট ভাই রুবেল লিবিয়ায় অবস্থান করছে। অপর ছোট ভাই রিপন মাঝে মধ্যে বাংলাদেশে এসে স্থানীয় এবং জাতীয় চক্রের কাছ থেকে টাকা পয়সা সংগ্রহ করে ইন্ডিয়া চলে যায়। সব আসামিকে আমরা গ্রেফতারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।