স্বামী স্বজন নিখোঁজের ১৩ বছর-এত কষ্ট কেমনে সইবেন শাহনাজ

প্রকাশিত: ১১:৪৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০২০ | আপডেট: ১১:৪৮:অপরাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০২০

সাহাদাত হোসেন পরশ।পুরান ঢাকার শাহনাজ হকের স্বামী শামসুল হক ২০০৭ সাল থেকে ‘নিখোঁজ’। চকবাজারের হাজী বালু রোডের বাসা থেকে বের হওয়ার পর আজও খোঁজ মেলেনি তার। ১৩ বছর ধরে স্বামীর পথ চেয়ে রয়েছেন শাহনাজ। নিখোঁজের জিডিও করেছিলেন চকবাজার থানায়। তবে নিখোঁজ রহস্যের কোনো কিনারা হয়নি এখনও। স্বামীর শোকের আবহের মধ্যেই গত ঈদুল ফিতরের দিন থেকে ছোট ছেলে আবদুর রহমানও (২২) নিখোঁজ হয়ে যায়। কয়েকদিন নানা জায়গায় খোঁজাখুঁজির পর চকবাজার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তিনি।

গত ১৩ জুলাই মুক্তিপণের একটি কললিস্টের সূত্র ধরে তদন্তের পর গতকাল সোমবার মর্মন্তুদ খবরই পেলেন শাহনাজ। দীর্ঘ দুই মাস পর তিনি জানতে পারলেন যে, তার কলিজার টুকরা রহমান আর নেই। অজ্ঞাত হিসেবে তার লাশ দাফন করেছে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম।

কী ঘটেছে রহমানের ভাগ্যে : পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, গত ২৫ মে খোকন নামে এক বন্ধুর ফোন পেয়ে বাসা থেকে বের হন রহমান। এরপর বাবুবাজার ব্রিজের ঢালে রোকন নামে এক ফল ব্যবসায়ীর দোকান থেকে ছয় হাজার ৬০০ টাকার বিনিময়ে তিন বোতল মদ কেনেন। ঈদের দিন ওই মদ খেতে খোকন তার বন্ধু আকাশের যাত্রাবাড়ীর কাজলার বোনের বাসায় যান। সেখানে গিয়ে খোকন, রহমান, আকাশ ও তাদের আরেক বন্ধু ইব্রাহিম মদ পান করেন। কিছু সময় পর তারা অসুস্থবোধ করেন। তাদের মধ্যে রহমানের অবস্থা খারাপ হতে থাকায় প্রথমে তাকে স্থানীয় অনাবিল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সংকটাপন্ন দেখে ওই হাসপাতাল থেকে রহমানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হলে রহমানকে মৃত ঘোষণা করেন ডাক্তার।

এরপর খোকনের পরামর্শে তার বন্ধু আকাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রহমানের পরিচয় পাল্টে দেন। ডাক্তারের কাছে জানান, রহমানের বাবার নাম আবুল কালাম আজাদ। তার যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে খোকনের মোবাইল নম্বর লিখে দেন। এরপরই খোকন তার মোবাইল নম্বর বন্ধ করে দেন। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওই নম্বরে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়ে বিষয়টি শাহবাগ থানা পুলিশকে অবহিত করে। শাহবাগ থানা পুলিশও মোবাইল নম্বর বন্ধ পেয়ে আঞ্জুমানকে খবর দেয়। ঈদুল ফিতরের কয়েক দিন পর ওই লাশ অজ্ঞাত হিসেবে দাফন করে আঞ্জুমান।

যেভাবে ক্লু মিলল : রহমানের নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হলেও তা তদন্তে খুব বেশি তৎপর ছিল না পুলিশ। তবে কয়েক দিন আগে হঠাৎ রহমানের মায়ের মোবাইলে কল আসে। ফোনের ওপাশ থেকে বলা হয়, ‘তিন লাখ টাকা দেওয়া হলে ছেলের খোঁজ পাওয়া যাবে।’ এটা জানার পর জিডির তদন্ত কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানান রহমানের মা। তখনও তা আমলে নিচ্ছিলেন না পুলিশ কর্মকর্তা। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানালে তৎপরতা শুরু হয়। ফোনের কললিস্টের সূত্র ধরে শুক্রবার রাতে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের কালিকাপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় খোকনকে। তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের পরই রহমানের নিখোঁজ রহস্যের কিনারা হয়।

মিলল মদের কারখানাও : খোকন পুলিশকে জানায়, রোকনের কাছ থেকেই মদ কিনেছেন তারা। পরে রোববার পুরান ঢাকায় রোকনের ফলের দোকানে অভিযান চালানো হয়। তার দোকানে লুকিয়ে রাখা কয়েক বোতল মদ পাওয়া যায়। রোকন পুলিশকে জানান, বংশালের ১৩২/২ মাজেদ সরকার লেনের একটি বাড়িতে নকল মদ তৈরির কারখানা রয়েছে। ওই কারখানা থেকেই মদ কিনে বাইরে বিক্রি করেন তিনি। এরপর রোববার রাতেই ওই কারখানায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে নকল মদ তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে চকবাজার থানা পুলিশ। একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে দুই বছর ধরে নকল মদ তৈরি করে আসছিলেন জুয়েল।

কারখানার ভেতর থেকে ৫৫ বোতল মদ, ৫৯টি খালি বোতল ও অসংখ্য নকল লেবেল পাওয়া গেছে। কারখানার মালিক জুয়েল গ্রেপ্তারের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানান, বিদেশি খালি মদের বোতল ও লেবেল সংগ্রহ করে বিভিন্ন কেমিক্যাল মিশিয়ে নকল মদ তৈরি করে আসছেন তিনি। এ ঘটনায় চকবাজার থানায় জুয়েলসহ কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে।

শাহনাজের সন্দেহ : রহমানের মা শাহনাজ সমকালকে বলেন, স্বামীর ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা ১৩ বছর ধরে জানেন না। তার স্বামী মাছের ব্যবসা করতেন। পাশাপাশি তাবলিগেও যেতেন। তার কোনো শক্র থাকার কথা নয়। স্বামীকে নিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্যেই ছেলের মৃত্যুর খবর এলো। যে ছেলেকে কখনও সিগারেট খেতেও দেখেননি, সে নাকি নকল মদ খেতে নিয়ে মারা গেছে।

তার ছেলে রহমান একসময় ফ্ল্যাক্সিলোডের ব্যবসা করতেন। সর্বশেষ একটি পলিথিন ব্যাগের কারখানায় মাসে ১২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন তিনি। পরিকল্পিতভাবে মদ খাইয়ে তাকে কেউ মেরে ফেলেছে কিনা, তা তদন্ত হওয়া দরকার।

তিনি বলেন, মৃত্যুর পর ছেলের মুখটাও দেখতে পেলাম না। কোথায় লাশ দাফন করেছে, তাও জানি না। ঘটনার পরপরই ছেলের পরিচিত এক বন্ধু ফোন করে বলেছিল, রহমান ঢাকা মেডিকেলে রয়েছে। তখন যদি ওই ফোন কলের সূত্র ধরে জিডির তদন্ত কর্মকর্তা খোঁজ নিতেন তাহলে হয়তো ছেলে মৃত মুখটা অন্তত দেখতে পেতাম।

চাঁদার টাকায় ব্যবসায়ের পরিকল্পনা : লালবাগ বিভাগের ডিসি বিপ্লব বিজয় তালুকদার বলেন, নিখোঁজ আর মুক্তিপণের সূত্র ধরেই নকল মদের কারখানার খোঁজ পাওয়া গেছে। এর পেছনে আর কেউ রয়েছে কিনা, তার তদন্ত চলছে। দুটি মামলা হয়েছে। একটি মুক্তিপণ ও চাঁদা দাবির ঘটনায়। অন্যটি মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে।

চকবাজার থানার ওসি (তদন্ত) কবির হোসেন বলেন, অপরাধ লুকাতেই রহমানের বন্ধু খোকন প্রথম থেকে জালিয়াতির আশ্রয় নেয়। শেষ পর্যন্ত তার মায়ের কাছ থেকেও টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। মুক্তিপণের টাকা দিয়ে গ্রামে কোনো ব্যবসা ও মৃত বন্ধুর নামে দান-খয়রাত করার পরিকল্পনা ছিল খোকনের।