অতঃপর ।।ডঃ জাহিদা মেহেরুননেসা

প্রকাশিত: ১০:১৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩০, ২০২০ | আপডেট: ১০:১৬:অপরাহ্ণ, জুলাই ৩০, ২০২০

ডঃ জাহিদা মেহেরুননেসা।

 

কলেজের কাজে প্রতিটি ছুটির দিন দখল হয়ে যায় লেকচারার ফরিদা ইয়াছমিনের।একভাবে না একভাবে এই সারা সপ্তাহের স্বপনের দিনটি চলে যাবেই। এই দিনটি তার স্বামী জুলহাসের খুব প্রিয়। সকালবেলা জুলহাসের হাতের বাঁধনকে ফাঁকি দেওয়া ভীষণ কঠিন হয় । ফাঁকি দিতে গেলেই জুলহাস টের পেয়ে যায়। কানে কানে বলে, আজ ছুটির দিন আর একটু ঘুমিয়ে নাও । এখন একদম উঠবে না ।
ফরিদা ছটফট করে উঠে যায়। কাজ থাকলে সে শুয়ে থাকতে পারে না । সংসারে কাজের অভাব নেই। কাজ করলে, আর সংসারের দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি থাকলে কাজের অভাব নেই, কাজ আর কাজ । একটা আসবাব পরিষ্কার করলে আর একটার উপরে ধুলোবালি পড়ে এক্কেবারে যা তা অবস্থা, কিন্তু সমস্যা হলো সারারাত একসাথে ঘুমিয়েও ছুটির দিনে জুলহাসের সকালে আরাম করে ঘুমানোর আকাঙ্ক্ষা গেলো না ।তবু ফরিদা বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে।
তার স্বামী জুলহাস ভীষণ বিরক্ত হয় এতে । অভিমান করে বসে থাকে । এই অভিমান ভাঙ্গতে সময় লাগে বেশ !

ফরিদা শহরের বিখ‍্যাত নূরজাহান বেগম সরকারি একটি মহাবিদ্যালয়ে চাকরি করে । সে কি এমন করে স্বামীর সাথে শুক্রবার সকালে শুয়ে ঘুমিয়ে থাকতে পারে? নাকি এভাবে ঘুমিয়ে থাকলে চলে? ফরিদা ছুটির দিন বিছানা থেকে খুব ভোরে ছটফট করতে করতে উঠে যায় । জুলহাস যত তাকে জড়িয়ে ধরে ফরিদা তত বেশি জোরে ওর বন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় । প্রায় প্রতি শুক্রবার এমন হচ্ছে । বিয়ে হয়েছে ওদের বেশিদিন হয়নি । একটু দেরিতেই বিয়েটা হয়েছে ওদের । এখন পরস্পরের প্রতি এমন গভীর সান্নিধ্য থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়াটা খুবই মুশকিল । এই নিয়ে মনটা ছটফট করতে করতে আর সুখের মুহূর্ত মনে করতে করতেই একটা আবেশের মধ্যে থেকে দিনটি কেটে যায়।

জুলহাস এ নিয়ে খুব মন খারাপ করে বসে থাকে । সে বলে দেখ আমার এ ছুটির দিনটা তুমি নষ্ট করলে । এই ছুটিটি আমার অনেক প্রিয় । সরকারি অফিসের চাকরিতে আমার এইটুকু একটু আনন্দ যাপনের সময় আর তুমি সকাল বেলা আমাকে একা বিছানায় ফেলে ফাঁকি দিয়ে চলে যাও । ফরিদার ইচ্ছে হয় বলতে, দেখ তোমরা অফিসে দুইদিন ছুটি পাও আর আমি একদিনও পাই না । আমি তো নিজের আরামের কথা ভাবি না । কাজকে কাজ মনে করি । কিন্তু ফরিদা মুখে কিছু বলে না । তার ঠোঁটের বাঁধনে কথা থেমে যায় । মনে মনে ভাবে সে তো শিক্ষক, অনর্থক কথায় তর্ক করা ঠিক নয়।

ফরিদা এ বিষয়ে কেনো কোনো বিষয় নিয়েই স্বামীর সাথে তর্ক করে না। কথা বললে অনেক কথা বলতে হবে । তাতে কাজের সময় নষ্ট । তাই সে চুপচাপ কলেজে চলে আসে । জুলহাস যেহেতু অফিসে চাকরি করে তাই সে বুঝবে না ফরিদা কতটা সময় মেপে চলে । সপ্তাহে একটি মাত্র ছুটির দিন সেটুকুও নানা ভাবে, নানা লোভে পড়ে চলে যায়। জুলহাসের দোষ কি? জুলহাস তো সপ্তাহে দুইদিন ছুটি ভোগ করে ।

ফরিদার আজ একটা ডিউটি করতে হচ্ছে, আর একজনের ডিউটি। হঠাৎ একজন সহকর্মীর জ্বর উঠেছে , তাই আজ ডিউটি করতে পারছে না । ফোন করে বলেছিল তাকে । একান্তই তার বিপদে সাহায্য করা। সাধারণত ফরিদা ডিউটি করতে চায় না তেমন, যদিও সামান্য কিছু হলেও এখন থেকে কিছু টাকা পাওয়া যায়। তবুও এই সব চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা নিতে বা ডিউটি করতে তার তেমন ভালো লাগে না । যখন পরীক্ষার হলে অনেকগুলো বেকার ছেলে মেয়েকে দেখে তখন সে তার বেকার ভাইবোনদের দেখতে পায় । চাকরির দরখাস্তের পিছনে এক একজন পরীক্ষার্থীকে এক এক হাজার টাকা খরচ করে দরখাস্ত করতে হয় । এসব দেখে ফরিদার তেমন ভালো লাগে না, তবু পরীক্ষা শেষে সে একটা সম্মানী পায়। এই সম্মানী তার কাছে কেমন যেন একটা প্রশ্নের মত এসে দাঁড়ায় । তবু এই টাকায় সে বাড়তি কিছু কেনাকাটা করে যা না হলেও চলে ।

ফরিদা সেদিন প্রাত্যহিক সকালবেলার কাজ ভালো করে সেরে আসতে পারেনি, নাস্তাও খেতে পারেনি । আর ওয়াশরুমের সব কাজ না সেরেই পরীক্ষার হলে ডিউটির জন্য সে ছুটে আসে কলেজে । এসে দেখে সেদিন পরীক্ষার্থী কম তাই এক রুমে একজনকে ডিউটি করতে দেওয়া হয়। পরীক্ষার্থী যে কতজনই হোক না কেনো একা ডিউটি করা যায় না । পরীক্ষা হলের দায়িত্ব কখনো আর একজনকে দেওয়া যায় না । আর মানুষের তো ওয়াশরুমে যাবার প্রয়োজন হতেই পারে । পরীক্ষার হলে এসে সে বিপদেই পড়ে গেলো ।
সে ভিতরে ওয়াশরুমে যাবার চাপ বোধ করলো, কিন্তু দেখলো পরীক্ষাটা শেষ করে ওয়াশরুমে যাওয়া যাবে।

সেদিন একটা সমস্যা হয়েই গেলো। ওয়াশরুমে গিয়ে এই রকম সমস্যা হবে সে ভাবেনি । তারপরেও মানুষেরই তো বিপদ হয় । পড়বি তো পড় একেবারে মালির ঘাড়ে ।

গুরুতর অভিযোগ উঠল ফরিদার বিরুদ্ধে । তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হল পরীক্ষা শেষ করে খাতা জমা দিতে দেরি হয়ে গেছে। খাতা বা উত্তরপত্র জন্য দেবার আগেই ও প্রকৃতির কাজে সাড়া দিতে গেছে । কয়েক মিনিট পার হবার পরে প্রিন্সিপাল ফোনে তাকে পায়নি । কারণ পরীক্ষার হলে তার ফোন বন্ধ ছিল । শেষে পিয়ন পাঠিয়ে তাড়াতাড়ি করে উত্তর পত্র জমা দেবার ব‍্যবস্থা করা হয়েছে । ফরিদাকে ফোন করে পাবে কীভাবে? ফোন তো বন্ধ ‌করে রাখতে হয় । পিয়ন পাঠিয়ে অধ‍্যক্ষ মহোদয় ডেকে পাঠালেন । ফরিদা যথারীতি হাজির হল । কিন্তু পিয়ন দিয়ে ডেকে পাঠিয়েছেন বলে কেমন যেন নিজেকে আসামি আসামি মনে হল ।
স‍্যারের সামনে উপস্থিত হয়ে নিজেকে নিজে মনে মনে বলে উঠলো , আসামীর হাজির ।
পিয়ন দিয়ে ডাকায় ভীষণ রকমের একটা অস্বস্তি বোধ হল। অপমান বোধ হল । হয়তো এটা ওনাদের কাছে স্বাভাবিক । তিনি বললেন আপনার খাতা নিয়ে ফেরত আসতে এত দেরি হল কেন ?
ফরিদা বলল, স্যার, ওয়াশরুমে ছিলাম তাই দেরি হয়েছে ।
:খাতা দিয়ে তো ওয়াশরুমে যেতে পারতেন।
ফরিদা বলল, স‍্যার, ওয়াশরুমে যাওয়াটা আমার জন‍্য খুব জরুরী ছিল ।
: জমা দিয়ে তারপর যেতে পারতেন, না হলে আর যিনি ডিউটিতে ছিলেন তাকে দিয়ে পাঠাতেন ।
: স্যার আর কেউ ডিউটিতে ছিল না । আমি একাই ছিলাম ।
: তাহলে আপনি সরাসরি খাতা নিয়ে চলে আসলেন না কেনো?আপনার উচিত ছিল কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া ।
: আমি তো একা ডিউটি করেছি তাও আবার আর একজনের ডিউটি।সুতরাং কাউকে দিয়ে পাঠাতে পারিনি ।
:তবে চারতলা থেকে নিচে নেমে এসে জমা দিয়ে তারপর ওয়াশরুমে যেতেন ।

: ব‍্যাপারটা জরুরী ছিল স‍্যার ।

আপনার এত জরুরী কি ছিল যে আপনি এতক্ষণ ওয়াশরুমে ছিলেন ? এইসব খাতায় যদি আপনি কিছু লিখে দিয়ে থাকেন তাহলে সেটার কৈফিয়ত কী?

চারিদিকে প্রশ্ন ফাঁসের হিড়িক পড়েছে সে দায় কি ফরিদার মত একজন সৎ শিক্ষকের হতে পারে ? অধ‍্যক্ষ ‌বা সহকর্মীদের নর্মস চেনাটাও তো তাঁর বিচক্ষণতার মধ‍্যে পড়ে। কে কী করতে পারে না পারে সেটা কি তার বোঝা উচিত না? তিনি কি ভুলে গেলেন একদিন এই অধ্যক্ষ স্যার আর ফরিদা এক রুমে ডিউটি করেছে । কতদিন স্যার ডিউটি না করে বসে ছিলেন, পায়ের ব্যথা ছিল বলে , সে সময় ফরিদা একা তার ডিউটি করে দিয়েছে । কী করে আজ অধ্যক্ষ হয়ে তিনি চোখ উল্টিয়ে ফেলেছেন? তিনি কি ফরিদাকে নতুন দেখলেন! একজন শিক্ষক কীভাবে আর একজন শিক্ষককে এইভাবে অবমূল্যায়ন করে? বড়ো পদে বসলে কি মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ?

ফরিদা তাকে কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু অধ্যক্ষ মহোদয় তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ দিল না । তাই সে নিজেকে শান্ত করে । মনে মনে ভাবে নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক ভক্তের কথা । সান্তাহারে আর একজন ‌শিক্ষকের ম্যাজিস্ট্রেট এর পা ধরে ক্ষমা চাইবার কথা । হুমায়ুন আজাদ স‍্যারের কথা । এত অপমান তো এরা সহ‍্য করেছে । ফরিদা তো এদের তুলনায় কিছু না । কত শিক্ষক নীতি রক্ষার জন্য কতভাবে ছাত্রদের হাতে নাজেহাল হচ্ছেন। আর ফরিদা তো ছাত্র ছাত্র/ছাত্রীদের দ্বারা লাঞ্ছিত হননি । সে লাঞ্ছিত হয়েছে যার হাতে তিনিও একজন শিক্ষক । এই তো কয়েকদিন আগেও তো তিনি ফরিদার সাথে বিভিন্ন কমিটিতে কাজ করেছেন, একরুমে ডিউটি করেছেন । তিনি একটু বেশি রকমের মোটা বলে পরীক্ষার হলে বেশি হাঁটতে পারেন না । ফরিদাই তাকে বলতো আপনি একটু বসেন স‍্যার, আমি তো আছি আপনার ছোট বোন । ভাববেন না । স‍্যার তখন অপ্রস্তুত হয়েই বলতেন না না আমি বেশ পারি । আজ অধ‍্যক্ষ হয়ে তিনি এমন অচেনা হয়ে গেলেন? এমন করে এতগুলো লোকের সামনে তিনি এইভাবে অসম্মান করতে পারলেন? তিনি কি জানেন না একজন শিক্ষকদের কাছে নিজের মর্যাদার মূল্য অনেক বেশি ! সেই মর্যাদা যদি না থাকে তাহলে শিক্ষক হিসেবে সারা জীবনের অর্জনটুকু কী ?

শেষ পর্যন্ত ফরিদা একটা সিদ্ধান্ত নেয় । শিক্ষকতার চাকরি সে আর করবে না । শুধুমাত্র একটু খানি লোভ ত‍্যাগ করতে হবে । সেই লোভটা হল একটু খানি স্বস্তির, একটুখানি ভালো অবস্থানের। মারা যাবার আগে তার বাবা তাকে বলেছিলেন যে কোনো অবস্থায় নির্লোভ থাকবি, দেখবি মেরুদণ্ড কেমন সোজা হয়ে যায় । সারাটা জীবনে যদি সততার জন‍্য কোনো কিছুর সাথে আপোষ না করিস তাহলে কিসের ভয় ?

 

 

ইডেন কলেজ, ঢাকা।