পবিত্র হজ পালিত, মহামারীমুক্ত বিশ্ব কামনা

প্রকাশিত: ১১:২৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩০, ২০২০ | আপডেট: ১১:২৫:অপরাহ্ণ, জুলাই ৩০, ২০২০

সৌদি আরব।ভিন্ন পরিবেশে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে বৃহস্পতিবার পালিত হল পবিত্র হজ। আত্মশুদ্ধি ও পাপমুক্তির আকুল বাসনা নিয়ে প্রায় ১ হাজার নারী-পুরুষ এদিন আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন।

‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়াননি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক’ (আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির। তোমার কোনো শরিক নেই; সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই, সব সাম্রাজ্যও তোমার) বলে কেঁদে বুক ভাসান। তারা মহামারী ও হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত বিশ্ব এবং মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনা করেন।

এদিন হজের খুতবা দেন শায়খ আবদুল্লাহ বিন সুলাইমান আল-মানিয়া। মসজিদে নামিরা থেকে বাংলাদেশ সময় ৩টা ২৫ মিনিটে খুতবা দিতে শুরু করেন তিনি। শেষ করেন ৩টা ৫৭ মিনিটে।

মূল খুতবা আরবিতে দেয়া হয়, তবে আরও ৯ ভাষায় (সংক্ষিপ্ত পরিসরে) অনুবাদ করা হয় তা, এর মধ্যে ছিল বাংলাও। খুতবা সরাসরি সম্প্রচার করা হয় বিভিন্ন টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে।

খুতবায় শায়খ আবদুল্লাহ বলেন, হে মানব সম্প্রদায়, পৃথিবী দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্ত নয়। জীবনের পদে পদে বিপদ-আপদ আসবেই। তখন আমাদের নিরাশ হলে চলবে না। ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহতায়ালার কাছে সাহায্য চাইতে হবে।

আল্লাহতায়ালা বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে আমাদের ইমানকে যাচাই করতে চান। ধৈর্য ধারণ করে সেই পরীক্ষায় আমাদের উত্তীর্ণ হতে হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, আমি অবশ্যই তোমাদের ভয় দিয়ে, ক্ষুধা দিয়ে এবং জানমালকে সংকীর্ণ করে দিয়ে পরীক্ষা করব। সুসংবাদ ধৈর্যশীলদের জন্য।

৯ জিলহজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা হজের প্রধান রোকন (ফরজ)। গত বছর ২৫ লাখের বেশি মুসল্লি হজে অংশ নিলেও এবার করোনা মহামারীর প্রেক্ষাপটে শুধু সৌদি আরবে থাকা মাত্র ১ হাজারের মতো মুসল্লি হজে অংশ নিতে পেরেছেন।

আরাফাতের ময়দানে সমবেত মুসল্লিরা ১ লাখ ১০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের মসজিদে নামিরায় আদায় করেছেন জোহর ও আসরের নামাজ। পরে তারা পা বাড়ান প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরের মুজদালিফার পথে। মাগরিব ও এশার নামাজ সেখানে পড়েন তারা। সেখানেই রাতে খোলা আকাশের নিচে ছিলেন।

এটি ওয়াজিব। আল্লাহতায়ালার প্রশংসা ও নবীজির (সা.) ওপর দরুদ পাঠ করার পর খুতবায় শায়খ আবদুল্লাহ বলেন, ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি হজ। হজ অত্যন্ত গুরুত্ব ও ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। আর্থিক ও শারীরিকভাবে সক্ষম প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জীবনে একবার হলেও হজ করাকে ফরজ করা হয়েছে। কারও হজ যদি কবুল হয়, তার জন্য আল্লাহতায়ালা পুরস্কার হিসেবে ঘোষণা করেছেন জান্নাত।

খতিব বলেন, হে মুসলিম সম্প্রদায়, আমি তোমাদের প্রতি উপদেশ দিচ্ছি, তোমরা আল্লাহতায়ালাকে ভয় করো। এর মাধ্যমে আপতিত সব আপদ-বিপদ তিনি দূর করে দেবেন। আল্লাহতায়ালাকে ভয় করার অর্থ হল, সুখে-দুঃখে, শান্তিতে-অশান্তিতে আল্লাহতায়ালার কাছেই সমর্পিত হওয়া।

কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে তার কাছেই চাওয়া। পৃথিবীর কোনো সৃষ্টির কাছে না চাওয়া। এটাই কালিমার দাবি। তিনি বলেন, কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, তোমরা আল্লাহতায়ালার ইবাদত করো, তার সঙ্গে কাউকে শরিক করো না।

খুতবায় শায়খ আবদুল্লাহ বলেন, আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনের আরেক জায়গায় বলেছেন, হে ইমানদারগণ, তোমরা সাহায্য প্রার্থনা করো, ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে। নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।

তিনি বলেন, হে মানব সম্প্রদায়, আল্লাহতায়ালার দয়া ও অনুগ্রহ অত্যন্ত প্রশস্ত। তিনি আমাদের জন্য সবকিছু সহজ করতে চান। পবিত্র কোরআনে আছে, প্রত্যেক কাঠিন্যতার সঙ্গেই সহজতা আছে। সাময়িক কিছু দুঃখ-দুর্দশা আমাদের জীবনে এলেও এর বিনিময়ে আল্লাহতায়ালা আমাদের উত্তম বিনিময় দেবেন।

তিনি বলেন, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহতায়ালার বিধান মানা আমাদের জন্য আবশ্যক। যা হালাল তা উপার্জন করতে হবে। আর যা হারাম তা পরিত্যাগ করতে হবে। পবিত্র কোরআনে আছে, আল্লাহতায়ালা ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং রিবা তথা সুদকে হারাম করেছেন। তাই সুদ-ঘুষ খাওয়া যাবে না।

অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ ভোগ করতে আল্লাহতায়ালা নিষেধ করেছেন। তাকদির আমাদের জন্য নির্ধারিত। মানুষের সঙ্গে সদাচরণ করতে হবে। পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করা যাবে না। পরস্পরে ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্য বজায় রাখতে হবে। নারী-পুরুষ সবার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এটাই ইসলামের বিধান।

খতিব বলেন, আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন, আল্লাহতায়ালা তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা তার ইবাদত করবে এবং মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করবে।

তাদের দু’জনের একজনকে বা দু’জনকেই যদি বৃদ্ধ অবস্থায় পাও, তাহলে তাদের সামনে (তাদের আচরণে বিরক্ত হয়ে) উফ্ বলবে না এবং তাদের ধমক দেবে না। বরং তাদের সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলবে।

হে মানব সম্প্রদায়, আল্লাহতায়ালা তোমাদের ন্যায় ও ইনসাফের নির্দেশ দিয়েছেন। ইসলামে মানবজাতির জন্য এমন বিধিবিধান রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে সমশ্রেণির মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, তোমরা আল্লাহতায়ালার রঞ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে, ভেদাভেদ সৃষ্টি করো না।

শায়খ আবদুল্লাহ বলেন, হে মানব সম্প্রদায়, নবীজি (সা.) বলেছেন, তোমাদের কোনো এলাকায় যদি মহামারী দেখা দেয়, তাহলে সেখান থেকে বের হয়ো না এবং সেখানে প্রবেশ করো না।

এ হাদিসের প্রতি লক্ষ্য করে করোনা মহামারীর কারণে সৌদি সরকার এবারের হজকে সীমিত পরিসরে আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেয়। খাদিমুল হারামাইন শারিফাইন বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ এবং তার সন্তান মোহাম্মদ বিন সালমানকে আল্লাহতায়ালা উত্তম বিনিময় দান করুন।

খতিব বলেন, হে আল্লাহর বান্দারা, আজকের এই আরাফার দিন, দোয়া কবুলের দিন। আমরা নিজেদের জন্য, অন্য সবার জন্য এবং মহামারী থেকে মুক্তির জন্য দোয়া করব। আল্লাহতায়ালা কোরআনে বলেছেন, তোমাদের প্রতিপালক বলছেন, তোমরা আমার কাছে প্রার্থনা করো। আমি তোমাদের প্রার্থনাকে কবুল করব।

স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে পরিপালন : সৌদির হজ ও ওমরাহবিষয়ক অধিদফতরের মহাপরিচালক সারি আসিরি বলেন, ‘হাজীদের প্রতিটি গ্রুপে একজন করে দলনেতা আছেন, যিনি তাদের সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করছেন। এছাড়া প্রত্যেক গ্রুপে একজন করে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আছেন। তারা হজযাত্রীদের শারীরিক অবস্থা নজরদারির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দেবেন।’

৯৩৬ জন আটক : অনুমতি না থাকার পরও হজে অংশগ্রহণের চেষ্টা করায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৯৩৬ জনকে আটক করেছে সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী। এদের প্রত্যেককে অন্তত ১ হাজার রিয়াল জরিমানা দিতে হবে। নিরাপত্তা বাহিনীর এক কর্মকর্তা এ তথ্য দিয়েছেন। গালফ নিউজের প্রতিবেদনে তা জানা গেছে।

প্রথমবারের মতো নারী পুলিশ : মক্কায় পবিত্র হজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো নারী পুলিশ সদস্যদের মোতায়েন করেছে সৌদি সরকার। বৃহস্পতিবার দেশটির সংবাদমাধ্যম আরব নিউজের প্রতিবেদনে এ তথ্য এসেছে। আগের দিন সৌদি সরকারের সরবরাহ করা মসজিদুল হারামে (কাবা শরীফ) মুসল্লিদের তাওয়াফের ছবিতেও নারী পুলিশের উপস্থিতি দেখা যায়।

মিনায় অবস্থানের মধ্য দিয়ে হজের কার্যক্রম শুরু হয়। বৃহস্পতিবার সারাদিন আরাফাতে অবস্থানের পর মুসল্লিরা রাতে মুজদালিফায় খোলা আকাশের নিচে ছিলেন। এ সময়ই তারা পাথর সংগ্রহ করেছেন, যা মিনার জামারায় প্রতীকী শয়তানকে উদ্দেশ করে ছোড়া হবে।

মুজদালিফায় ফজরের নামাজ আদায়ের পর আজ হাজীরা মিনায় নিজ তাঁবুতে ফিরবেন। মিনায় বড় শয়তানকে সাতটি পাথর মারার পর পশু কোরবানি দিয়ে মাথার চুল ছেঁটে (ন্যাড়া) গোসল করবেন। এরপর পবিত্র কাবা শরিফ সাতবার তাওয়াফ করবেন। এটি হজের আরেকটি ফরজ।

কাবার সামনের দুই পাহাড় সাফা ও মারওয়ায় সাঈ (সাতবার দৌড়ানো) করবেন। মিনায় তারা যতদিন থাকবেন, ততদিন প্রতীকী শয়তানকে লক্ষ করে পাথর ছুড়ে মারবেন। সবশেষে কাবা শরিফে বিদায়ী তাওয়াফের (ওয়াজিব) মধ্য দিয়ে শেষ হবে হজের আনুষ্ঠানিকতা।