ঢাকা ২৪শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৯ই রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

কক্সবাজার জেলা যুবলীগের প্রস্তাবিত কমিটিতে শিবির-ছাত্রদলকর্মী ও মাদক ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন

LTN
প্রকাশিত আগস্ট ৬, ২০২০
কক্সবাজার জেলা যুবলীগের প্রস্তাবিত কমিটিতে শিবির-ছাত্রদলকর্মী ও মাদক ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন

কক্সবাজার।২০১৮ সালের ২৯ মার্চ সভাপতি-সম্পাদক নির্বাচিত হবার পর দুই বছর অতিক্রান্ত হলেও পুর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে ব্যর্থ হয়েছেন কক্সবাজার জেলা যুবলীগ সভাপতি সোহেল আহমদ বাহাদুর ও সম্পাদক শহিদুল হক সোহেল। কিন্তু যুবলীগের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান-সম্পাদক নির্বাচনের পর চলতি বছরের ২ মার্চ ১০১ সদস্যের প্রস্তাবিত জেলা কমিটি জমা দিয়েছেন কক্সবাজার জেলা সভাপতি-সম্পাদক। দুই বছর পরে এসেও ভাগাভাগিতে গঠন করা কমিটিতে রহস্যজনকভাবে সাবেক শিবির ও ছাত্রদল নেতা, ইয়াবা ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, অপেশাদার রাজনীতিকদের স্থান দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আত্মীয়করণের সর্বোৎকৃষ্ট উদহারণ সৃষ্টি এবং গঠনতন্ত্র না মেনে পদ বন্টন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রস্তাবিত কমিটির ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক সাবেক শিবিরকর্মী হিসেবে পরিচিত রমজানুল আলম সম্প্রতি কলাতলীর ‘ওয়ার্ল্ড বিচ রিসোর্ট’ থেকে ইয়াবাসহ গ্রেফতারের পর প্রস্তাবিত কমিটিতে স্থান পাওয়াদের বিষয়ে বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কমিটির ১০১টি পদকে পারিবারিক সম্পদের মতো ভাগ করে ৫০টি সভাপতি আর ৫১টি পদ সম্পাদক ভাগ করে নিয়ে যাকে ইচ্ছে স্থান দেওয়ার বিষয়ে কেউ কাউকে হস্তক্ষেপ করেননি। তবে কিছু পদের ক্ষেত্রে উভয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েই পদটি পূর্ণ হয়েছে। সভাপতি তার ভাগের পদে নিজের ইচ্ছেতে লোক নিলেও সাধারণ সম্পাদকের ভাগের পদে কে কোন পদে আসীন হবেন তা নিয়ন্ত্রণ করেছেন তার (সম্পাদকের) স্ত্রী, দপ্তর সম্পাদক পদে স্থান পাওয়া সম্পাদকের ঘনিষ্ট বন্ধু। চাহিদা মতো টাকা, স্বর্ণালঙ্কারসহ নানা উপঢৌকন নিয়ে পদ বিক্রি হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জন জানান, কমিটিতে স্থান পাওয়াদের মধ্যে ২০-৩০ জনের অতীতে রাজনৈতিক কর্মকা-ের কোনো ইতিহাস নেই। ২০১৮ সালে বাহাদুর-সোহেল দায়িত্ব পাওয়ার পর এরা বন্ধু, ক্লাশমেট এবং সহমত পোষণকারি হিসেবে তাদের সঙ্গে সময় দেওয়ায় পদ দেওয়া হয়েছে। বিরোধী দলের আমলে রাজপথে থাকা সাবেক ছাত্রলীগ, যুবলীগ বা অন্য সহযোগী সংগঠনের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের করা হয়েছে অবমূল্যায়ন। সভাপতি ও সম্পাদক পদে নির্বাচন করে বিজিত হলে নিয়মানুসারে সহ-সভাপতি ও যুগ্ম-সম্পাদক পদ দেওয়ার নিয়ম ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালের কাউন্সিলে সাধারণ সম্পদেক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা শোয়েব ইফতেকারকে প্রস্তাবিত কমিটিতে সদস্য হিসেবে রাখা হলেও সভাপতি হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মো. শহিদুল্লাহকে কমিটির সদস্য পদেও রাখা হয়নি।

অপরদিকে, সাধারণ সম্পাদকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদ দপ্তর সম্পাদকে নাম এসেছে কুতুব উদ্দিনের। তিনি ১৯৯২-৯৩ সনে কক্সবাজার সরকারি কলেজ ছাত্রশিবিরের সম্পাদকীয় পোস্টে দায়িত্বপালন এবং পরে ছাত্রদলে যোগ দিয়ে শহর ও জেলার দায়িত্বপালন করেছেন বলে সমসাময়িক ছাত্রলীগ নেতারা দাবি করেছেন। তিনিও ২০১৮ সালে সোহেল দায়িত্ব পাওয়ার পর যুবলীগের সঙ্গে হাটা শুরু করেন। তারই মতো একই সময়ে যুবলীগ বনে আইন সম্পাদক পদ পেয়েছেন সাবেক ছাত্রদল নেতা অ্যাড. নুরুল ইসলাম সায়েম। কখনো রাজনীতির ময়দানে না থাকলেও শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক হিসেবে ঢাকায় বাস করা ট্রাভেল ব্যবসায়ী নুরুল আলম, কৃষি ও সমবায় সম্পাদক হিসেবে ব্যাংকার মাসেকুর রহমান, সহ-সম্পাদক হিসেবে সাবেক ছাত্রশিবির নেতা অ্যাড. শামশুল আলম, বিএনপির কেন্দ্রীয় মৎস্য সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলের নিকট আত্মীয় অ্যাড. সরোয়ার, দুবাই প্রবাসী মাতারবাড়ীর কায়সার, সভাপতি বাহাদুরের আপন শ্যালক ব্যাংকার তৌফিকুর রহমান রেজা, ইউছুফ শাহ নবাব সহ-সম্পাদকের পদে নাম তুলতে সক্ষম হয়েছেন বলে অভিযোগ সাবেক যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের।

এছাড়াও, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে নাম এসেছে সাধারণ সম্পাদকের বড় ভাবী জোসনা হকের। জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থ সম্পাদক রাজা শাহ আলমের ছেলে বাবার পরিচয়ে কমিটিতে অর্থ সম্পাদকের পদে এসেছেন ইমতিয়াজ আলম চৌধুরী। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে সাধারণ সম্পাদকের দ্বিতীয় স্ত্রীর ভাই বলে পরিচিত সুলতান মো. বাবুল স্থান পেয়েছেন। আরও একটি সম্পাদকীয় পোস্টে নাম এসেছে উখিয়ায় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের সবচেয়ে ক্ষতিকারী হিসেবে পরিচিত প্রথমে জাতীয় পার্টির নেতা, পরে বিএনপি এবং বর্তমানে আওয়ামীলীগ নেতা হয়ে সুবিধাভোগীর ছেলে সাবেক ছাত্রদলকর্মী বর্তমান পৌর আওয়ামী লীগের পদধারী বিতর্কিত এক যুবক। এভাবে আরও বেশ কয়েকজন স্বজনকে পদে বসিয়েছেন সভাপতি-সম্পাদক দুজনেই।

যুবলীগের চলমান গঠনতন্ত্রের ধারা-২৫ এর উপধারা-‘ঙ’ তে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যুবলীগের কোন সদস্য একই সংগঠনের একাধিক স্তরে কর্মকর্তা বা মূল সংগঠন আওয়ামী লীগ বা অন্য সহযোগী সংগঠনের কোনো স্তরের কর্মকর্তা থাকতে পারবেন না।

কিন্তু প্রস্তাবিত কমিটির সহ-সভাপতি রিয়াজুল আলম রামু উপজেলা যুবলীগ সভাপতি, শহিদুল ইসলাম চকরিয়া যুবলীগ সভাপতি, মুহাম্মদ ইসমাইল আওয়ামী লীগ সংযুক্ত আরব-আমিরাত কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্বশীল এবং সেখানকার কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের উপদেষ্টা, যুগ্ম সম্পাদক ইফতেকার উদ্দিন পুতু সদর যুবলীগ সভাপতি ও সদর আওয়ামী লীগের সদস্য, ডালিম বড়ুয়া ও শাহেদ মো. এমরান পৌর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক, সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদ উল্লাহ সিআইপিও পৌর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক, ইমাম হোসেন উখিয়া উপজেলা যুবলীগ সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপালন করছেন। তারা চলমান দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন বলে কোনো তথ্য কোথাও নেই।

এছাড়া সদস্য পদেও উপজেলা যুবলীগ সম্পাদক, জেলা যুবলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ব্যক্তিগত কর্মচারী, সৌদি আরবের মক্কার হোটেল ব্যবসায়ী, উখিয়ার সাবেক ছাত্রদল নেতা, কেন্দ্রীয় ছাত্রশিবির নেতা ও জেলা জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি জিএম রহিমুল্লাহর শ্যালক ও শহরের হোটেল সাগরগাঁও’র মালিক সাবেক শিবিরকর্মী, পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাসহ নব্য যুবলীগার অনেককে স্থান দেওয়া হয়েছে।

জেলা যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক শহিদুল হক সোহেল বলেন, যতটুকু সম্ভব একটি শক্তিশালী কমিটি করার প্রয়াস চালানো হয়েছে। এখানে টাকা বা কোন উপঢৌকনের বিনিময়ে কাউকে পদ দেওয়ার বিষয়টি সঠিক নয়। আমাদের কমিটি গোয়েন্দা সংস্থাকেও সরবরাহ করা হয়েছে। ত্রাণ সম্পাদক হিসেবে নাম আসা রমজান ষড়যন্ত্রের শিকার। এরপরও তার বিষয়টি তদন্তে প্রমাণ হলে তাকে বাদ দেওয়া হবে। তার মতো অন্য কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তাদের বাদ দিয়েই এগিয়ে যাবার চেষ্টা চলবে। দপ্তর সম্পাদক কুতুব উদ্দিন আগে রাজনীতি সক্রিয় ছিলো না বলে জানি। এরপরও কমিটিতে নাম আসা কারো বিরুদ্ধে শিবির-ছাত্রদল করার অভিযোগ থাকলে প্রমাণ উপস্থাপন করার অনুরোধ করেন তিনি।

জেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কক্সবাজার পৌরসভার প্যানেল মেয়র মাহবুবুর রহমান বলেন, কেন্দ্রের নির্দেশনা ছিল সাবেক সভাপতি-সম্পাদকের পরামর্শে কমিটি সাজানোর। বর্তমান ও সাবেক আমরা চারজন বসে একটি কমিটি দাঁড় করিয়েছিলাম। পরে জানলাম, সেই কমিটির পরিবর্তে তাদের ভাগ-বাটোয়ারার কমিটি জমা দেওয়া হয়েছে। জমা দেওয়া কমিটিতে নাম আসা অনেককে শিক্ষাজীবনে শিবির-ছাত্রদলের সাথে যুক্ত থেকে মিছিল মিটিংয়ে সক্রিয় থাকতে দেখেছি। অনেকে আবার ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায় যুক্ত।

কমিটির সামগ্রিক বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জেলা যুবলীগ সভাপতি সোহেল আহমদ বাহাদুর বলেন, আওয়ামী লীগ বুর্জুয়া সংগঠন। এখানে যথাযথ বলতে কিছু নেই। গঠনতন্ত্রের পাশাপাশি রেওয়াজেও কমিটিতে পদ বন্টন হয়। সহযোগী সংগঠনের সভাপতি-সম্পাদক হিসেবে যে নামগুলো দিয়েছি, তাদের দলের জন্য উপযুক্ত মনে করেছি। আগে ভিন্ন পার্টি করা অনেকে মাদার (আওয়ামীলীগ) সংগঠনে স্থান পেয়েছে। সেই রেওয়াজে আগে রাজনীতি না করা নতুন অনেকে আমাদের কমিটিতেও স্থান পেয়েছে এটা ঠিক। সবার বায়োডাটা কেন্দ্রে জমা দেওয়া আছে। কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইন শৃঙ্খলাবাহিনী দিয়ে তদন্ত করে বাদ দিলে আমার বলার কিছু নেই। আমাদের স্বজন হিসেবে যারা পদ পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তাদের পারিবারিক রাজনৈতিক ইতিহাস সমৃদ্ধ। সে হিসেবেই তারা কমিটিতে এসেছে।

টাকার বিপরীতে কমিটিতে পদ দেওয়ার বিষয়টি গুজব উল্লেখ করে সভাপতি বলেন, কে টাকা দিয়েছে প্রমাণসহ বলতে পারলে নিজের বিরুদ্ধে নিজেই ব্যবস্থা নেব। আগের জেলা কমিটিতেও উপজেলা-ইউনিয়ন ও পৌর শাখার অনেক নেতা-কর্মী ডাবল পোস্ট ক্যারি করেছে। তাই গঠনতন্ত্রে নিষেধ থাকলেও অতীত রেওয়াজে আমরাও অনেককে রেখেছি। রাজনীতির কল্যাণে, কাকে রাখবো না রাখবো সেটা সম্পূর্ণ আমাদেরই বিষয়।

জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম বলেন, ছাত্রলীগ থেকে যুবলীগের দায়িত্বপালনে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়েছি। পুরো জেলায় আমাদের হাতেগড়া বঙ্গবন্ধু প্রেমী নেতা-কর্মী রয়েছে। দলের সুসময়-দুঃসময়ে দলকে আঁকড়ে ধরা কর্মীকে চিনি আমরা। কিন্তু প্রস্তাবিত কমিটিতে যাদের নাম দেখছি এদের অনেককে আমরা সাবেক সভাপতি-সম্পাদকও চিনি না। এ কমিটি শক্তিশালী যুবলীগ উপহার দেবে বলে মনে হয় না।

উপজেলা বা অন্য শাখার নেতাদের আগে জেলা কমিটিতে রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের কমিটি গঠন হয়েছিল ২০০৮ সালে। তখন একজন একাধিক কমিটিতে থাকার বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ ছিল না। কিন্তু ২০১২ সালে গঠনতন্ত্র সংশোধনের পর স্পষ্ট ঘোষণা এলো একজন একাধিক কমিটিতে থাকতে পারবে না। তাই রেওয়াজের চেয়ে গঠনতন্ত্র মানা জরুরি।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কেন্দ্রীয় যুবলীগ সম্পাদক মইনুল হোসেন নিখিল বলেন, কক্সবাজার জেলা যুবলীগ সভাপতি-সম্পাদক স্বাক্ষরিত একটি কমিটি মার্চের শুরুতে হাতে পেয়েছি। কমিটিতে উল্লেখিত নামের বিপরীতে তাদের বায়োডাটা উপস্থাপন হয়নি। সে হিসেবে এটি অসম্পূর্ন উপস্থাপনা। তার ওপর উক্ত কমিটির ত্রাণ সম্পাদক ইয়াবাসহ আটক ও মামলায় অভিযুক্ত হয়েছে বলে জেনেছি। তিনি আবার সাধারণ সম্পাদকের ব্যাবসায়ীক পার্টনার বলেও গণমাধ্যমে এসেছে। আমরা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদারক করছি। বায়োডাটা যাছাই ছাড়া কোনো অবস্থাতে কোথাও নেতৃত্বে স্থান পাওয়ার প্রশ্নই আসে না। যুবলীগ চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তেই এ পদ্ধতিতে এগুনো হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।