প্রদীপের দখলে ছিল ক্রসফায়ারের নিরাপদ জোন মেরিন ড্রাইভ!

প্রকাশিত: ১১:০৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৬, ২০২০ | আপডেট: ১১:০৪:অপরাহ্ণ, আগস্ট ৬, ২০২০

শফিউল্লাহ শফি, কক্সবাজার।প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্যের পর্যটন স্পট কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়ক। একপাশে বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে উত্তাল ঢেউ ও গাছের সারি, অন্যপাশে উঁচু পাহাড়ের হাতছানি।

সড়কটিতে পা রাখলেই মনে অন্যরকম আনন্দ জাগে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর অন্যতম ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ সড়ক। এ সড়ক ‘ক্রসফায়ারের’ নিরাপদ জোনে পরিণত করেছিলেন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ।

জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১৯ অক্টোবর টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে প্রদীপ কুমার দাশের যোগদানের পর থেকেই মেরিন ড্রাইভ সড়ক আতঙ্কের ‘ক্রসফায়ারের’ নিরাপদ জোনে পরিণত হয়। দুই বছরে এ সড়কে ক্রসফায়ারে শতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। মাদক নির্মূলের নামে ক্রসফায়ারে মানুষ হত্যা করা ছিল ওই এলাকায় নিত্যদিনের ঘটনা। এই উন্মাদনা থেকে বাঁচতে পারেননি মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানও।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২২ মাসে টেকনাফে ১৪৪টি ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২০৪ জন মারা গেছেন। তাদের অর্ধেকের বেশি লাশ পড়েছিল মেরিন ড্রাইভে। যারা মারা গেছেন তাদের পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। যাকে ক্রসফায়ার করা হতো তাকে ১০ থেকে ১২ দিন থানা হাজতে রাখা হতো। আবার মাসের পর মাস থানা হাজতে রাখার ঘটনাও রয়েছে। এ সময় ক্রসফায়ারে না দেয়ার আশ্বাস দিয়ে ওই ব্যক্তির পরিবার-পরিজনের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হতো। তবে শেষ সম্বলটুকু দিয়েও বাঁচতে পারেনি অনেকেই।

টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল বশর  বলেন, জীবনে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা দেখেছি। কিন্তু টাকার জন্য মরিয়া এমন কর্মকর্তা দেখিনি। ক্রসফায়ারের নামে মানুষ খুন করা ছিল ওসি প্রদীপের নেশা। টেকনাফ থেকে প্রদীপ ২০০ কোটি টাকা নিয়ে গেছে। নুরুল বশর আরও বলেন, টেকনাফের পাঁচ-ছয়জনকে গোয়েন্দারা জিজ্ঞাসাবাদ করলেই ওসি প্রদীপের ক্রসফায়ার ও চাঁদাবাজির লোমহর্ষক তথ্য বেরিয়ে আসবে।

টেকনাফের দুই গরু ব্যবসায়ী ওসি প্রদীপের অপকর্মের দোসর। টেকনাফের গুদারবিল এলাকার ৬নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবু ছৈয়দ এবং সাবরাংয়ের ৫নং ওয়ার্ডের আছারবনিয়ার ইউপি সদস্য শরীফ প্রকাশ শরীফবলি মিয়ানমার থেকে চোরাইপথে গরু আনত। এরপর টেকনাফ হয়ে চট্টগ্রামে গরু বিক্রি করত। আর গরু বিক্রির টাকা চট্টগ্রামে বুঝে নিত প্রদীপের লোকজন।

টেকনাফের ক্রসফায়ারের চাঁদাবাজির টাকাও এ দুই মেম্বারের হাতে জমা হতো। এভাবেই ধরি মাছ না ছুঁই পানির মতো চলেছে প্রদীপের আটক ও ক্রসফায়ারের হুমকি বাণিজ্য।

দুই গরু ব্যবসায়ীর পাশাপাশি রয়েছে স্বর্ণ কেনার মহাজন চট্টগ্রামের সজল ধর। সজলের কাছে প্রদীপের লুণ্ঠিত স্বর্ণালঙ্কার লাখ লাখ টাকায় বিক্রি হতো। আবার যেসব মাদক ব্যবসায়ীর ঘরে অভিযান চালানো হতো তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা আদায়ের পাশাপাশি স্বর্ণালঙ্কার নেয়া হতো।

ওই স্বর্ণালঙ্কার যেত সজল ধরের কাছে। প্রদীপের আরেক সহযোগী হলেন টেকনাফ কমিউনিটি পুলিশের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নুরুল হোসাইন। পুলিশের হাতে আটক ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রতিনিয়ত নুরুল হোসাইন লাখ লাখ টাকা আদায় করত। নুরুল হোসাইন ২৭ জুলাই সেন্টমার্টিন থেকে আটক পূর্বপাড়ার জামাল উদ্দিনের ছেলে মাছ ব্যবসায়ী জুবাইয়েরকে প্রদীপের ক্রসফায়ার থেকে বাঁচানোর কথা বলে টাকা আদায় করেন। জুবাইয়ের ভাই ইউনুচের কাছ থেকে তিনি দুই দফায় ওসি প্রদীপের নাম ভাঙিয়ে ১০ লাখ টাকা নেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) পর্যন্ত জুবাইয়েরকে থানা হাজতে রেখেছে পুলিশ।

সূত্র জানায়, ২৪ জুলাই রাতে উখিয়ার কুতুপালং থেকে ইউপি সদস্য মৌলভি বখতিয়ারকে ধরে আনেন প্রদীপ। এছাড়া একই অভিযানে রোহিঙ্গা তাহেরকে আটক করা হয়। এর একদিন পর দু’জনের ভাগ্যেই জোটে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’। এ ঘটনায় করা মামলায় উল্লেখ করা হয়- মৌলভি বখতিয়ারের ঘর থেকে ১০ লাখ নগদ টাকা এবং ২০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।

জানা গেছে, ঘটনার পর একটি বিশেষ সংস্থার কাছে দেয়া জবানবন্দিতে মৌলভি বখতিয়ারের স্ত্রী জানান, সেই রাতে ওসি প্রদীপের নেতৃত্বে পুলিশি অভিযানে নগদ ৫১ লাখ টাকা ও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে গেছে। বখতিয়ারের এক ছেলেকে ডেকে নিয়ে হাতিয়ে নেয়া হয় আরও বিপুল অঙ্কের টাকা। অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার হাতিয়ে নিয়েও বখতিয়ারকে ক্রসফায়ারে দেয়া হয়।

সূত্র আরও জানায়, টেকনাফের হোয়াইক্যং ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সহসভাপতি মুফিদ আলমকে ধরে নিয়ে পাঁচ লাখ টাকা আদায় করা হয়। একই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাকের আলমকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা নিয়ে ২০০ ইয়াবা দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এসব বিষয়ে কক্সবাজার পুলিশ সুপার বলেন, কোনো ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ করলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হতো। ৩১ জুলাই মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানের হত্যার ঘটনায় ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে ২নং আসামি করে মামলা করা হয়েছে।