বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ক্যাপ্টেন শেখ কামালের সতীর্থ ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের অংশগ্রহণে লন্ডন হাই কমিশনের স্মারক অনুষ্ঠানে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন

প্রকাশিত: ১:৩৫ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৭, ২০২০ | আপডেট: ১:৩৫:পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৭, ২০২০

লন্ডন।গতকাল বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ক্যাপ্টেন শেখ কামালের ৭১তম জন্মবার্ষিকীতে বাংলাদেশ হাই কমিশন লন্ডন কর্তৃক ওয়েবিনারের মাধ্যমে আয়োজিত এক স্মারক অনুষ্ঠানে শেখ কামালের সহপাঠি ও ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধাদের অংশগ্রহণে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনীমের সভাপতিত্বে “ ঝযধযববফ ঈধঢ়ঃধরহ ঝযবরশয কধসধষ: ঠধষরধহঃ ঋৎববফড়স ঋরমযঃবৎ, ঝঢ়ড়ৎঃং ্ ণড়ঁঃয ওপড়হ” শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, এম.পি। বিশেষ অতিথি ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মোঃ জাহিদ আহসান রাসেল, এম.পি এবং প্রথিতযশা সাংবাদিক ও “আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” অমর সংগীতের রচয়িতা আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে ব্যতিক্রমধর্মী ও অন্যতম আকর্ষণ ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের শেখ কামালের সহপাঠী বন্ধুদের এবং আবাহনী ক্রীড়াচক্র ও মুক্তিযুদ্ধের সতীর্থদের আবেগঘন ও মধুর স্মৃতি রোমত্থন। এদের মধ্যে ছিলেন আবাহনী ক্রীড়াচক্রের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, সাবেক সাংসদ হারুনুর রশিদ, ওয়ার কোর্সমেট মেজর জেনারেল (অব:) সাইয়ীদ আহমেদ, বীর প্রতীক এবং শেখ কামালের সহপাঠী ও ঘনিষ্ট বন্ধু ড. হাবিবুল হক খন্দকার, তৌরিদ হোসেন বাদল ও ড. মেহরাজ জাহান।

এছাড়াও ব্রিটিশ বাংলাদেশী কমিউনিটির সিনিয়র ব্যক্তিত্ব সুলতান মাহমুদ শরীফ ও সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুক বক্তব্য রেখে তাঁরা ৬৬-এর ৬-দফা থেকে শুরু করে ৬৯-এর গণ-উভ্যূত্থান ও ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, খেলাধূলা ও সামাজিক কর্মকান্ডে শহীদ শেখ কামালের অসামান্য অবদানের কথা স্মরণ করে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান গউস খান ও বিবিসি’র সাবেক সাংবাদিক উদয় শংকর দাশ সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন।

সরকারের নির্দেশনায় দূতাবাসে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রথমবারের মতো শহীদ ক্যাপ্টেন শেখ কামালের জন্মবার্ষিকীতে আয়োজিত এই স্মারক অনুষ্ঠানে যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশসহ বাংলাদেশ থেকে তরুণ প্রজন্মের তিন শতাধিক বাংলাদেশি অংশগ্রহণ করে শেখ কামালের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি শেখ কামালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সালমান এফ রহমান বলেন, “বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী শেখ কামাল ছিলেন একজন সম্পূর্ণ মানুষ। মাত্র ২৬ বছরের জীবনে সর্বক্ষেত্রেই তিনি তাঁর অসামান্য মেধা ও অসাধারণ কর্মকান্ডের উজ্জল স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁকে কখনো কোনো লোভ-লালসা স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি সব সময়ই ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সুরক্ষায় কাজ করে গেছেন”।

আবাহনী ক্লাবের বর্তমান চেয়ারম্যান সালমান রহমান আরো বলেন, প্রতি বছর ৫ আগস্ট শেখ কামালের জন্মদিনে আমরা আবাহনী ক্লাবে শেখ কামালকে স্মরণ করি এবং ক্লাবের সারা বছরের অর্জনগুলো ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা শেখ কামালকে নিবেদন করি।

যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মোঃ জাহিদ আহসান রাসেল বলেন, স্বাধীনতাত্তোর যুব ও ক্রীড়া উন্নয়নে শহীদ শেখ কামাল যে অনন্য অবদান রেখে গেছেন তার স্মরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তাঁর মন্ত্রণালয় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ‘শেখ কামাল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ পুরস্কার’, শেখ কামালের নামে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মানের ষ্টেডিয়াম ও ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণ এবং শেখ কামালের জীবনের ওপর বিভিন্ন গ্রন্থের প্রকাশ। এছাড়া, শেখ কামালের স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাংলাদেশের ফুটবলকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

স্বাগত বক্তব্যে হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনীম শহীদ ক্যাপ্টেন শেখ কামালের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জেষ্ঠ্য পুত্র শেখ কামালকে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এ ঘাতকেরা নির্মমভাবে হত্যা করলেও স্বাধীন বাংলাদেশের উদ্দীপ্ত তারুণ্যের অগ্রদ্রুত এবং ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম পথিকৃত, বহুমাত্রিক গুণে গুণান্নিত এই অসাধারণ ব্যক্তিত্ব বাঙালির চিন্তা-চেতনায় ও জাতির ইতিহাসে হয়ে থাকবেন চির ভাস্বর।

তিনি বলেন, স্বাধীনতাত্তোর ৭২-৭৫ মাত্র সাড়ে তিন বছর সময়ের মধ্যে শেখ কামাল তাঁর সুযোগ্য ও দৃপ্ত নেতৃত্ব দিয়ে একটি অসম্প্রদায়িক ও আধুনিক তরুণ প্রজন্ম বিনির্মাণে সুদূর প্রসারী ভিশন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

হাইকমিশনার বলেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী নতুন প্রজন্মকে শেখ কামালের জীবনাদর্শে সচেতন করার জন্য হাইকমিশন তাঁর জীবনের ওপর বিভিন্ন গ্রন্থ প্রকাশ এবং ‘শহীদ ক্যাপ্টেন শেখ কামাল স্পোর্টস এ্যাওয়ার্ড‘ ঘোষণা করবে ।

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, বাবা বঙ্গবন্ধুর মতোই শেখ কামালও ছিলেন একজন অত্যন্ত সাহসী মানুষ। ২৬ মার্চ ভোরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই তিনি তাঁর মাকে লুকিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। তাঁর সাহসী চিন্তা-চেতনা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং বিচক্ষণতা তাঁকে যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে তরুণ সমাজের কাছে এক অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিলো।

হারুনুর রশিদ বলেন, শেখ কামাল ছিলেন বাংলাদেশের আধুনিক ক্রীড়াঙ্গনের রূপকার। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে তরুণ সমাজকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলার অগ্রণী সৈনিক হিসেবে সংগঠিত করার জন্য তিনি খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক-সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় উদ্যোগী হন এবং ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আবাহনী ক্রীড়াচক্র, যা আজকের আবাহনী ক্লাব।

মেজর জেনারেল (অব:) সাইয়ীদ আহমেদ বলেন, শেখ কামাল মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নিতে চেয়েছিলেন। তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীর এডিসি নিয়োগ করা হলে তিনি যুদ্ধে যেতে না পেরে হতাশ হন। তবে এডিসি হিসেবেও মুক্তিবাহিনীতে গেরিলা বাহিনীর সংগঠনে ও তাদের প্রশিক্ষণে অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

শেখ কামালের বাল্যবন্ধু তৌরিদ হোসেন বাদল তাঁর আবেগঘন স্মৃতিচারণে বলেন, শেখ কামাল শুধু একজন মেধাবী ছাত্র ও প্রগতিশীল ছাত্রনেতাই ছিলেন না, ফুটবল, ক্রিকেট, বাস্কেটবলসহ প্রতিটি খেলায় এবং সাংস্কৃতিক জগতেও ছিলো তাঁর উজ্জল উপস্থিতি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সন্তান হওয়া সত্বেও তাঁকে প্রায়ই দেখা যেতো একটি সেতার হাতে রিক্সায় ছায়ানটে যাচ্ছেন।

তিনি আরো বলেন, সমাজ সচেতনামূলক নাটকের অভিনয়ে ছিলো তাঁর গভীর আগ্রহ এবং কলকাতাসহ বিভিন্ন শহরে এ ধরনের নাটকে তাঁর অভিনয় বহুল প্রশংসিত হয়েছে। দেশজ ও আধ্যাত্বিক সংগীতের পাশাপাশি পাশ্চাত্যের ব্যান্ড সঙ্গীতের প্রতিও ছিলো তাঁর বিশেষ অনুরাগ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ কামালের সহপাঠি বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে জায়েদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. হাবিবুল হক খন্দকার বলেন, শেখ কামাল ছিলেন একজন ইনক্লুসিভ মানুষ। বিরোধী রাজনৈতিক ধারার ছাত্রসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে সবার সাথেই তিনি সন্মানজনক সম্পর্ক বজায় রাখতেন ও বিপদে-আপদে সব ধরনের সহযোগিতায় তাদের পাশে দাঁড়াতেন। অধ্যাপক হক আরো বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৪-এর সামাজিক বিজ্ঞানের ক্লাসটি মেধাবী অনেক ছাত্র-ছাত্রীর তারকাখচিত থাকলেও প্রাণোচ্ছল শেখ কামালই ছিলেন মধ্যমনি।

শেখ কামাল ও স্ত্রী সুলতানা কামালের আরেক সতীর্থ বন্ধু ড. মেহরাজ জাহান বলেন, বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে শেখ কামাল কখনই নারী-পুরুষ, ধনী-গরিব বা প্রচলিত সামাজিক ভেদাভেদ করতেন না। সকল বন্ধুই তাঁর কাছে সমান ছিলো। নারী বন্ধুদের প্রতি তিনি ছিলেন বিশেষভাবে শ্রদ্ধাশীল ও তাদের প্রয়োজনে সবসময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে শহীদ ক্যাপ্টেন শেখ কামাল ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুসহ ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে ও তাঁদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও দোয়া করা হয়। এরপর শেখ কামালের জীবনের ওপর একটি প্রমাণ্যচিত্র প্রদর্শণ ও “শেখ কামাল: উদ্দীপ্ত তারুণ্যের দূত” শীর্ষক একটি স্মারক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সমর সাহার আবৃত্তিতে শহীদ শেখ কামালকে নিবেদন করা হয়।

স্মারক অনুষ্ঠানে হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার মোহাম্মদ জুলকার নাইন, মিনিস্টার (কনস্যুলার) মোঃ লুৎফুল হাসান, সামরিক উপদেষ্টা ব্রিগ্রেঃ জেনারেল মোঃ মাহবুবুর রশীদ, মিনিস্টার (প্রেস) আশিকুন নবী চৌধুরী ও মিনিস্টার (পলি্িটক্যাল) এ,এফ,এম, জাহিদুল ইসলামসহ মিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা উপস্থিত ছিলেন।