বাঙালির মুক্তির স্বপ্ন ও অনশ্বর বঙ্গবন্ধু

প্রকাশিত: ৯:৫৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০২০ | আপডেট: ১২:২৭:পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৫, ২০২০

অনুপম সেন।বাংলা ভাষাভাষী বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় দিনগুলো হলো ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর ও ২১ ফেব্রুয়ারি; এই তিনটি দিন বাঙালিকে চিরকাল চরম গৌরবে উদ্ভাসিত করবে। আর ১৫ আগস্ট দিনটি স্মরণ করা হবে বাঙালি জাতির ইতিহাসের অনপনেয় কলঙ্কের দিন হিসেবে। এই দিনটিতে চরম দেশদ্রোহী, বিশ্বাসঘাতক, নিষ্ঠুর কিছু মানুষ, যারা পশুরও অধম, তারা তাদের রাজনৈতিক পরাজয়ের গ্লানি ঢাকার জন্য কেবল জাতির পিতাকেই হত্যা করেনি, তাঁর শিশুসন্তান এবং নবপরিণীতা পুত্রবধূদের হত্যা করতে দ্বিধা করেনি, তাদের বিবেক কম্পিত হয়নি।

বিশ্ব জানে, বাঙালি জানে, উপরে উল্লিখিত মহৎ দিনগুলো সৃষ্টির মহানায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুই বাঙালির জন্য সৃষ্টি করেছিলেন তার নিজের রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের সংবিধানে সর্বপ্রথম ঘোষণা করা হয় সে-ই রাষ্ট্রের মালিক; অর্থাৎ, এই রাষ্ট্রে জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস এবং তাদের মুখের ভাষা বাংলাই এই রাষ্ট্রের ভাষা। বঙ্গবন্ধুই সৃষ্টি করলেন বাঙালির ইতিহাসের প্রথম জাতি রাষ্ট্র। এর আগে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে আমরা তথাকথিত স্বাধীন বাংলা পেয়েছি, যেখানে রাজা এবং তাঁর সহযোগী অমাত্যরাই ছিলেন স্বাধীন, সাধারণ বাঙালিরা নয়, তারা ছিল প্রজা; রাজার ভ্রুকুটিতে তাদের প্রাণ সংশয়ও হতো। বাঙালিকে তার প্রথম নিজস্ব সংবিধানও বঙ্গবন্ধুই অর্পণ করেন ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর। এই সংবিধানের মূল ভাষ্যও বাংলায়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বরের আগে বাঙালি দু’টো প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শাসনে ছিল; ১৯০ বছর ইংরেজের অধীনে, ২৩ বছর পাঞ্জাবী ও উর্দুভাষী সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের অধীনে। এই দুই ঔপনিবেশিক শাসন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশটিকে (বার্নিয়ার, টের্ভার্নিয়ার প্রমুখ পরিব্রাজকের বর্ণনা অনুযায়ী) পরিণত করেছিল পৃথিবীর দরিদ্রতম রাষ্ট্রগুলোর একটিতে। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসনের ২৩ বছরের মধ্যে ১৩ বছরই কাটিয়েছিলেন কারান্তরালে বাঙালিকে পরাধীনতামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত, অর্থনৈতিকভাবে ঋদ্ধ একটি অস্তিত্ব বা জীবন প্রদান করতে, যে-জীবন হবে ক্ষুধামুক্ত স্বাস্থ্য-শিক্ষা ও সংস্কৃতি ঋদ্ধ। তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র পাতায় পাতায় এই ঐকান্তিক ইচ্ছা বা আকুলতা বারবার ফুটে উঠেছে। তিনি ১৯৫৩ সালেই লিখেছেন: ‘এদিকে পূর্ব বাংলার সম্পদকে কেড়ে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানকে কত তাড়াতাড়ি গড়া যায় একদল পশ্চিমা তথাকথিত কেন্দ্রীয় নেতা ও বড় বড় সরকারি কর্মচারী গোপনে সে কাজ করে চলেছিল।… আওয়ামী লীগ যখন হিসাব-নিকাশ বের করে প্রমাণ করল যে, পূর্ব বাংলাকে কি করে শোষণ করা হচ্ছে তখন তারা মরিয়া হয়ে উঠল এবং আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাদের উপর চরম অত্যাচার করতে আরম্ভ করল’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী)। তিনি আরো লিখেছেন: ‘অন্যদিকে পূর্ব বাংলার বৈদেশিক মুদ্রা থেকে প্ল্যান প্রোগ্রাম করেই পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্প কারখানা গড়ে উঠতে সাহায্য করতে লাগল। ফলে একদল শিল্পপতি গড়ে তুলতে শুরু করল, যারা লাগাম ছাড়া অবস্থায় যত ইচ্ছা মুনাফা আদায় করতে লাগল জনসাধারণের কাছ থেকে এবং রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেল। করাচি বসে ইমপোর্ট ও এক্সপোর্ট ব্যবসার নাম করে লাইসেন্স বিক্রি করে বিপুল অর্থ উপার্জন করে আস্তে আস্তে অনেকে শিল্পপতি হয়ে পড়ছেন। এটাও মুসলিম লীগ সরকারের কীর্তি…। বাঙালি তথাকথিত নেতারা কেন্দ্রীয় রাজধানী, মিলিটারি হোডকোয়ার্টারগুলি, সমস্ত বড় বড় সরকারি পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য পাঞ্জাবী ভাইদের হাতে দিয়েও গোলাম মোহাম্মদ ও চৌধুরী মোহাম্মদ আলীকে খুশি করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। গণপরিষদে বাঙালিরা ছয়টা সিট পশ্চিম পাকিস্তানের ‘ভাইদের’ দিয়েও সংখ্যাগুরু ছিলেন। তাঁরা ইচ্ছা করলে পূর্ব বাংলার জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে পারতেন। তাঁরা তা না করে তাঁদের গদি রক্ষা করার জন্য এক এক করে সকল কিছু তাদের পায়ে সমর্পণ করেও গদি রাখতে পারলেন না’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী)।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বঙ্গবন্ধু ‘পূর্ব পাকিস্তান ভাষা সংগ্রাম পরিষদের’ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে যে-প্রথম হরতাল আহ্বান করেন তার জন্য তাঁকে হরতালরত অবস্থায় গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় প্রায় ৭০ জন সহকর্মীসহ। সে-সময় তিনি কারাগারে ছিলেন পাঁচ দিন। ১৯৪৮ সালের প্রথমার্ধে এই পাঁচ দিনের কারাবাস দিয়ে তাঁর যে-কারাজীবনের শুরু হয় ‘বাঙালির অধিকার আদায়ের’ জন্য, তা ১৯৫৩ সালের মধ্যেই তিন বছরব্যাপী দীর্ঘ হয়েছিল। এই তিন বছরে বারবার তিনি কারাগারে গেছেন। এই তিন বছরের মধ্যে একটা সময় তিনি সশ্রম কারাদণ্ডও ভোগ করেছেন। বিশ্বমানবের মুক্তিকামী শ্রেষ্ঠ নেতাদের মতো, এই জেলজীবনের অধিকাংশ সময়ই কাটিয়েছেন তিনি নিরাপত্তা বন্দী হিসেবে। যেহেতু তিনি বাঙালির অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে কখনোই কোন আপোস বা নমনীয়তা দেখাননি, তাই পাকিস্তানের শাসকশ্রেণি ও সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র সবসময় তাঁকে পাকিস্তানের ‘শোষকদের বিরুদ্ধে ত্রাস’ হিসেবেই বিবেচনা করেছে, জেলের কুঠুরিতে রাখাই তাদের শ্রেণি-স্বার্থের পক্ষে নিরাপদ মনে করেছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের প্রায় প্রতিটি মুহূর্তই নিয়োগ করেছিলেন সাধারণ মানুষের কল্যাণে। যেহেতু জনগণের স্বার্থকেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মূল লক্ষ্য করেছিলেন, সেহেতু তাঁকে কমিউনিস্ট আখ্যাও দেওয়া হয়েছিল। তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন না, কিন্তু তিনি সমাজতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন, পুঁজিবাদের পক্ষে নয়। এই সমাজতন্ত্র ছিল মানুষের কল্যাণে নিবেদিত সমাজতন্ত্র। ১৯৫৩ সালে গণচীন সফরে যেয়ে তিনি সেখানে রাষ্ট্রকে মানুষের কল্যাণে নিবেদিত দেখে লিখেছিলেন: ‘আমি নিজে কমিউনিস্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসাবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যতদিন দুনিয়ায় থাকবে ততদিন দুনিয়ার মানুষের উপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী)।

সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে বিশ্বাসী হলেও তিনি জনগণের সব অধিকার আদায় জনগণকে নিয়েই করতে চেয়েছেন। তিনি যে-সমাজতন্ত্র চেয়েছিলেন সেটি স্ক্যান্ডিনেভিউ দেশগুলোর মত, বিশেষভাবে সুইডেনে ওলাফ পামের নেতৃত্বে প্রায় তিন দশক ধরে যে-সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, অনেকটা তারই আদলে। তিনি ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের গণপরিষদে সংবিধান উপস্থাপন করার সময় তাঁর অন্তরে সব গণমানুষের কল্যাণে সমাজতন্ত্রের যে-রূপ অবয়ব পেয়েছিল, সেই সমাজতন্ত্রেরই বর্ণনা করেছেন এবং তাই সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।। ১৯৪৮ সাল থেকে বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রধান পুরুষ ছিলেন বঙ্গবন্ধু।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান যখন সৃষ্টি হয়, সেই পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ জনগণ ছিল বাঙালি; পাঞ্জাবী, সিন্ধি, বেলুচ ও পশতু মিলিয়ে বাকি ৪৪ শতাংশ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী। পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ বাঙালি হলেও পাকিস্তানের রাজধানী হয়েছিল প্রথমে করাচি, পরে রাওয়ালপিন্ডি ও সবশেষে ইসলামাবাদ। ফলে কেন্দ্রীয় শাসনের কেন্দ্র হল পশ্চিম পাকিস্তান এবং শাসকরা হলেন পশ্চিম পাকিস্তানী। জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ হল একটি প্রদেশ (পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশের মতো) তার রাজধানী ঢাকা হল একটি প্রদেশের রাজধানী; কেন্দ্রীয় রাজধানী নয়, যদিও এই সম্মান ঢাকারই প্রাপ্য ছিল। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় বাজেটের প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ ব্যয় হতো সামরিক খাতে এবং সামরিক খাতের এই ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই ব্যয় করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। পাকিস্তানের জেনারেল, লে. জেনারেল, মেজর জেনারেল, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, কর্ণেল, লে. কর্ণেল, মেজর, ক্যাপ্টেন ইত্যাদি অফিসারদের নব্বই শতাংশই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী, অধিকাংশই পাঞ্জাবী। বাঙালি অফিসারের সংখ্যা ছিল নগণ্য। ১৯৭০ সালে ছিল মাত্র একজন ব্রিগেডিয়ার, একজন কর্ণেল, আঙ্গুলে গণা কয়েকজন মেজর ও ক্যাপ্টেন। বেসামরিক অন্যান্য খাতের সব ব্যয়ও হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। বেসামরিক আমলাতন্ত্রের সেক্রেটারি, অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি, জয়েন্ট সেক্রেটারি, ডেপুটি সেক্রেটারি প্রভৃতি পদের ৭৫-৮৫ শতাংশই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানীদের দখলে। যে-সামান্য কয়েকজন বাঙালি সেক্রেটারিকে পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল তাঁদেরও কোন ক্ষমতাই ছিল না। পাকিস্তান হওয়ার জন্মলগ্ন থেকেই আজিজ আহমেদ, এন এম খান প্রমুখ পশ্চিম পাাকিস্তানী সেক্রেটারিরা পূর্ব পাকিস্তানকে শাসন করেছে। তাঁদের শাসন কখনোই পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থে হয়নি; তাঁরা বাঙালিদের ঘৃণা করতেন। তাঁদের শাসনের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে শোষণ করে এদেশের সম্পদ নানাভাবে, নানা উপায়ে পশ্চিম পাকিস্তানে স্থানান্তর-করা। পাকিস্তানের ২৩ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনকালে পাকিস্তানের মুখ্য বৈদেশিক-অর্থ-উপার্জনকারী খাত ছিল (আজ বাংলাদেশে যেমন গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি বা তৈরি পোশাক শিল্প) পাট ও পাটজাত দ্রব্য। পাট ও পাটশিল্প থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রাই ব্যবহৃত হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পায়নে, কৃষি উন্নয়নে এবং সেবাখাতের প্রবৃদ্ধিতে। এই একই সময়ে পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের প্রতিটি খাত, কৃষি, শিল্প ও সেবা খাত চরমভাবে অবহেলিত হয়েছে, শোষণের শিকার হয়েছে। পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পরে ১৯৪৯-৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জিডিপি ছিল ১২৩৭.৪ কোটি টাকা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ১২০৯.১ কোটি টাকা। অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের জিডিপি পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে সামান্য বেশি ছিল। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক দুই দশকের শোষণের ফলে ১৯৬৯-৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জিডিপির পরিমাণ দাঁড়ায় ২২৭১.৩ কোটি টাকা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ৩১৫৬.৩ কোটি টাকা। এ-থেকেই বোঝা যায়, দুই দশকে পূর্ব পাকিস্তান কী নির্মম শোষণের শিকার হয়েছিল! বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে এই অমানবিক শোষণের বন্ধনজাল থেকে মুক্ত করতে ১৯৬৬ সালে ছয় দফা দিয়েছিলেন; এই ছয় দফাই ছিল বাংলাদেশের শোষণমুক্তির দলিল, বাঙালির মুক্তির সনদ। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকচক্র বাংলাদেশ তাদের শোষণের জাল থেকে বেরিয়ে যাক, এটা কোনমতেই মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। তাই ১৯৭০ সালে গণপরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও গণপরিষদের বা ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির অধিবেশনই ডাকা হলো না। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে বাংলাদেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন, তিনি বাঙালির অধিকারের বিনিময়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চান না। বাঙালিকে অধিকার-সংগ্রামের জন্য ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলারও আহ্বান জানালেন। বিশ্বের ইতিহাসে স্বাধীনতার এই শ্রেষ্ঠ ভাষণের (যেটি তিনি দশ লক্ষ জনতার সামনে দিয়েছিলেন) শেষ বাক্যে ঘোষণা করেছিলেন: ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এই বাক্যটি মহাকাব্যিক দ্যোতনা বহন করে। কারণ, এই অসাধারণ বাক্যে মূর্ত হয়েছে বাঙালির হাজার বছরের মুক্তির স্বপ্ন, জাতিগত আকাক্সক্ষা।

নয়মাস ব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে, ত্রিশ লক্ষ প্রাণ ও দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের মূল্যে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা বিজয় অর্জন করলাম। বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে এলেন সম্পূর্ণ এক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে। পাকিস্তানী দখলদার সেনারা নিজেদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে এদেশে এক অবর্ণনীয় ঘৃণ্য ‘পোড়ামাটি নীতি’ গ্রহণ করেছিল; সবকিছু জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাড়খার করে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ফিরে এসেই এই বিধ্বস্ত দেশকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে, এর অর্থনীতিকে প্রাণদান করে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যেতে সচেষ্ট হলেন। দশ মাসের মধ্যেই জাতিকে উপহার দিলেন এক অসাধারণ সংবিধান। অবিলম্বে প্রণয়ন করলেন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। মাত্র এক বছরের মধ্যেই হাজার হাজার ধ্বংসপ্রাপ্ত কালভার্ট ও বৃহৎ সেতু পুননির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সচল করলেন। এক কোটি শরণার্থীকে পুনর্বাসিত করলেন। দেশের মধ্যে গৃহহারা বাস্তুচ্যুত প্রায় দু’কোটি মানুষের জন্য আশ্রয়ের বন্দোবস্ত করলেন। নির্যাতিত মা-বোনদেরও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলো। তাঁর অনুরোধে মাত্র তিন মাসের মধ্যে ভারতীয় মিত্রবাহিনী প্রত্যাহৃত হলো। মিত্রবাহিনীর এই ধরনের প্রত্যাহার বিশ্ব-ইতিহাসে প্রায় একটি বিরল ঘটনা। আজও জাপানের ওকিনোয়ায় আমেরিকান সৈন্যবাহিনী মোতায়েন রয়েছে, রয়েছে জার্মানীতেও যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে ১৯৪৫ সালে। বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় ছিলেন। ১৯৭২ সালে তিনি যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন তখন বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার কোন রিজার্ভ ছিল না, কোন বিমানবাহিনী ছিল না, রেল ও স্থল যোগাযোগ ছিল বিধ্বস্ত। ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঘটেছিল আরব-ইসরাইল যুদ্ধ। যার ফলস্বরূপ সৃষ্টি হয় ওপেক এবং এক ব্যারেল জ্বালানী তেলের মূল্য ওপেক এক ডলার থেকে প্রায় সতেরো-আঠারো ডলারে উন্নীত করে, যা বিশ্ব-অর্থনীতিতে সৃষ্টি করে অভূতপূর্ব স্ট্যাগফ্ল্যাশন ঝঃধমভষধঃরড়হ বা মন্দা-মূল্য-উল্লম্ফন; অর্থাৎ একই সঙ্গে ঘটে ভয়ানক অর্থনৈতিক মন্দা ও মুদ্রাস্ফীতি। বিশ্ব-অর্থনীতিতে এর আগে কখনো একই সঙ্গে এভাবে মন্দা ও মুদ্রাস্ফীতি ঘটেনি। আমি সে-সময় উত্তর আমেরিকার কানাডায় ম্যাক-মাস্টার বিশ্ববিদ্যালয় পিএইচডি গবেষণা করছিলাম। সে-সময় উত্তর আমেরিকা জুড়ে অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় দেখেছি, খ্রিসমাস ও নিউইয়ার বা নববর্ষের উৎসব ছিল আলোকহীন, নিষ্প্রভ যা অন্যান্য বছর থাকতো আলোয় আলোয় উজ্জ্বল ও বর্ণাঢ্য। এই স্ট্যাগফ্ল্যাশন (ঝঃধমভষধঃরড়হ) ইউরোপেও, বস্তুতপক্ষে সারা বিশ্বেই সৃষ্টি করেছিল বিরাট অর্থনৈতিক বিপর্যয়, মন্দা। বঙ্গবন্ধু অসাধারণ বিচক্ষণতার সঙ্গে বিশ্বজোড়া এই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছিলেন। প্রায় একই কালে বাংলাদেশের ২৩ টি জেলায় ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। তাও তিনি সামাল দিয়েছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণতার মাধ্যমে। বাংলাদেশে তখন প্রকৃতপক্ষে পাটশিল্প ছাড়া কোন শিল্পই ছিল না। বাংলাদেশ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে গড়ে উঠা বিভিন্ন ভোগ্য শিল্পের বাজার, বস্তুতপক্ষে বন্দী বাজার (ঈধঢ়ঃরাব গধৎশবঃ)। বঙ্গবন্ধুই শুরু করেছিলেন বাংলাদেশের প্রকৃত শিল্পায়ন; বহু ধরনের শিল্প সৃষ্টির সূচনা। ফলশ্রুতিতে, ১৯৭৩-৭৪ সালে বাংলাদেশের শিল্পায়ন যে-সাত শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল, তা তাঁর মৃত্যুর আট বছর পরেও অর্জন করা সম্ভব হয়নি। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতেও তিনি কৃষিকেই দিয়েছিলেন বিরাট প্রাধান্য। এই কারণে তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই বাংলাদেশ কৃষিতে প্রায় স্বয়ম্ভরতা অর্জন করে।

বঙ্গবন্ধু কেবলমাত্র বাংলাদেশ সৃষ্টির মহানায়কই ছিলেন না, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মৌল অবকাঠামো নির্মাণ ও তার অগ্রগতির পথ-সৃষ্টিরও মহাশিল্পী ছিলেন। তাঁর কাল থেকে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে আজ আমরা এই সত্যকে উপলব্ধি করি যখন আমরা তাঁর স্বাধীনতাত্তোর প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কার্যাবলী বিশ্লেষণ করে দেখি। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির পুনর্গঠনের মধ্যে দাঁড়িয়ে অনেকের পক্ষে তখন এই সত্যকে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়নি। এই সুযোগই গ্রহণ করেছিল প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি। সবকালেই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি এই সুযোগ গ্রহণ করে থাকে। ১৯২০-এর দশকে লেনিন যখন সোভিয়েত ইউনিয়নকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই সময় অনেকেই তা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। লেনিনকেও এই সুযোগ নিয়েই প্রতিক্রিয়াশীলরা হত্যার উদ্দেশ্যে গুলিবিদ্ধ করেছিল। তাই তিনি জীবনের শেষ দিনগুলো প্রায়ই অর্ধমৃত অবস্থায় কাটিয়েছিলেন। আরও অনেক মহাপ্রাণ ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু, লেলিনের মতো এই ধরনের যুদ্ধাপরাধী দেশদ্রোহীদের প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন, যেমন, আব্রাহাম লিংকন।

১৫ আগস্ট পাকিস্তানপন্থী যুদ্ধাপরাধী দেশদ্রোহীরা কেবলমাত্র বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, তাঁর পরিবারের সতেরো জন সদস্য, Ñআগেই উল্লেখ করেছিÑ যাঁদের মধ্যে নারী-শিশুরাও ছিলেন, তাঁদেরও নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। এমনই ঘৃণ্য কাপুরুষ ছিল এরা। ১৯৮১ সালের মে মাসে বঙ্গবন্ধুর যে-দু’জন কন্যা এই ঘৃণ্য অপরাধীচক্রের হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন তাঁদের অন্যতম শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি-পদে-বৃত হয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। দেশ আবার নতুন পথের সন্ধান পায়। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর একুশ বছর পরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবার বাংলাদেশের উন্নয়নের রথযাত্রার সারথী হয়। আজ বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নয়নের একটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত বা উদাহরণ।

সারা বিশ্বজুড়ে ২০০৮-০৯ সালে যে-গ্রেট রিসেশন বা মহামন্দা শুরু হয়েছিল, সে-সময়েই দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রের হাল ধরে দেশরত্ন শেখ হাসিনা আজ বাংলাদেশকে উন্নয়নের মহাবর্ত্মে নিয়ে গেছেন। সে-সময়ে, ১৯০৮-৯-এ বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ৬০০ মার্কিন ডলারের সামান্য কিছু বেশি। এখন তা প্রায় ২০০০ ডলার। ২০০৬-০৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ছিল কৃষিতে পরনির্ভর। আজ বাংলাদেশ কৃষিতে কেবলমাত্র স্বনির্ভরই নয়, একটি কৃষি রপ্তানিকারক দেশেও রূপান্তরিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে দেশ যখন স্বাধীন হয় তখন বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ছিল মাত্র এক কোটি টন। আজ তা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ৩ কোটি ৮৫ লক্ষ টনে উন্নীত হয়েছে। ১৯৭১ সালে, আগেই উল্লেখিত, বাংলাদেশে কোন শিল্প ছিল না বললেই চলে (পাটশিল্প ছাড়া)। বাংলাদেশের প্রয়োজন মেটানোর প্রায় সব শিল্প-সামগ্রীই আজ বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে। অনেক শিল্প-সামগ্রী (কেবলমাত্র গার্মেন্টস নয়) যেমন, ঔষধ, টিন, কাঁচ, সিরামিক, ছোট ছোট জাহাজ, প্লাস্টিক ইত্যাদি বহির্বিশ্বেও রপ্তানি হচ্ছে। সেবাখাতেও বাংলাদেশের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে-আত্মনির্ভরশীলতা, যে-জয়যাত্রা আজ আমরা দেখছি তার বীজটি বপন করেছিলেন বাঙালি জাতির সর্বকালের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর মহাপ্রয়াণের দিন বিশ্বের সব প্রত্যেক স্বাধীনতাপ্রেমী-মুক্তিকামী মানুষের জন্য একটি স্মরণীয় দিন। তিনি বাঙালিকে মুক্তির ঠিকানা দিয়েছেন, তাই তিনি বাঙালির জন্য অনশ্বর, অমর।