চোখের জলে ভিজিয়ে দিলেম…নিষ্ঠুর পৃথিবীর বুকে পিতার শেষ অশ্রুবিন্দু

প্রকাশিত: ১০:০৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০২০ | আপডেট: ১০:০৯:অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০২০

মোরসালিন মিজান॥ একজন মানুষের বুকে, বুকের ঠিক মাঝখানটায় একটি দেশের জন্ম হলো। দেশটির নাম বাংলাদেশ। আর মানুষটি? প্রশ্নাতীতভাবেই শেখ মুজিব। এবং সেই মুজিবের বুকে গুলি চালানো হলো! বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতাকে দেখা হলো না এই প্রজন্মের। এমন মহাপুরুষের সামনে দাঁড়ালে কচিকাঁচা প্রাণের ভেতরে কী কী ঘটে? কী কী ঘটতে পারত? জানা হলো না। আজ অনেকেই হয়তো ভাবেন, কিছুকাল আগে যদি জন্মানো যেত! যদি ৭ মার্চের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে শোনা যেত সেই তেজদীপ্ত কণ্ঠ, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ির সামনে এসে শেষ হওয়া মিছিলে থাকা যেত যদি! শেখ মুজিবুর রহমানকে চোখের দেখাটি যদি দেখা যেত! কত সাধারণ মানুষকে জড়িয়ে ধরেছেন তিনি। কাছে বসিয়ে গল্প করেছেন। সেকালে জন্মালে আজকের প্রজন্মেরও থাকত এমন সুখস্মৃতি। হলো না! দেখা হলো না, জানা হলো না কাছ থেকে। এ আক্ষেপ নিয়েই বড় হতে হচ্ছে, বুড়ো হতে হচ্ছে বহু মানুষকে।

আর যারা মুজিবের কালের তারা আরও বেশি বেদনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। সহস্র নদীর দেশে নিঃশব্দে এক রক্ত-নদী বয়ে গেল। টেরই পেলেন না তারা। ব্যর্থতায় গ্লানিতে মাথা এখনও নিচু। পায়ের কাছে এসে ঠেকে। নিজেদের ক্ষমা করতে পারেন না তারা। আগস্ট এলেই আরও বেশি শোকে নিমজ্জিত হন- এত পবিত্র রক্ত এত পিওর ব্লাড এভাবে ঝরতে পারে? অথচ ঝরেছিল।

আর যদি একটা গুলি চলে…। বাঙালী নেতার হুংকারে পাকিস্তানী শত্রুদের ভীত কেঁপে উঠেছিল। মুজিবের বুকে বন্দুক তাক করার সাহস তারা পায়নি। অথচ সে বুকটাই কি না বুলেটে ঝাঁঝরা করে দিল নিজ দেশের সেনাবাহিনীর কয়েক বর্বর। প্রশস্ত বুক টানটান সিনার ভেতরে যত্নে রাখা বাংলাদেশটাও রক্তাক্ত করল এরা। ১৫ আগস্ট তাই চির শোকের। চির ক্রন্দনের।

বাঙালীর কত সংগ্রাম, জ¦লে পুড়ে মরা, কত না পাওয়া, দীর্ঘশ্বাস! কোনটাই ব্যর্থ হতে দিলেন না যিনি তার নাম শেখ মুজিব। মুক্তির পথ খোঁজার পাশাপাশি একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতি রাষ্ট্রের স্বপ্নবীজ মগজের কোষে পুঁতে নিয়েছিলেন তিনি। একাত্তরে সেখান থেকেই হলো বাংলা নামের অদ্ভুত সুন্দর দেশ। বাঙালীর জন্য আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, আগে কোনদিন হয়নি এমন ঝকঝকে নতুন ইতিহাস গড়লেন এই নেতা। আজ দেশ আছে। দেশ আগলে রাখার, প্রত্যাশা মতো এগিয়ে নেয়ার মানুষটি নেই!

সারা জীবন বাঙালীর অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করা নেতা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিকে স্বপ্নের মতো করে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন। উন্নত আধুনিক প্রগতিবাদী চিন্তা ও উদারনৈতিক দর্শনের আলোকে নবনির্মিতি দিতে কাজ করছিলেন। বিশ্ব দরবারে বিশিষ্টার্থক করে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছিলেন বাংলাদেশকে। সে প্রজ্ঞা ডেডিকেশন আত্মবিশ্বাস সাহস সূর্যের তেজ তাঁর ছিল। সামর্থ্যরে সবটুকু নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন নেতা। দেশের অভ্যন্তরে সমস্যা সঙ্কট। ষড়যন্ত্র। সব একে একে চিহ্নিত করে সমাধানের দিকে এগোচ্ছিলেন। শোষণ ও দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে দেশে দেশের বাইরে দোয়েলের মতো কোয়েলের মতো উড়ে বেড়াচ্ছিলেন তিনি। জাতির পিতা যে! সন্তানদের ভাল রাখতে হবে। ভাল রাখার সব চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন।

বিনিময়ে ১৮টি বুলেট! ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়। উত্তাল রেসকোর্সে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেছিলেন: রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব…। কিন্তু নিজ দেশের কেউ, সে যত বর্বরই হোক, মুজিবের রক্ত নেবে দুঃপ্নেও ভাবেননি। গোটা দুনিয়া কত বাহবা দিচ্ছিল সদ্য স্বাধীন দেশটিকে। কত ভালবাসা সম্মান কুড়িয়ে চলেছিলেন বাঙালীর নেতা। আর তার পর এমন নৃশংসতা। পৃথিবীর জঘন্যতম হত্যাকান্ড।

কল্পনার চোখে দেখছি, ১৪ আগস্ট রাতে ঘুমোতে যাচ্ছেন শেখ মুজিব। পরদিন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে তাঁর আমন্ত্রণ। প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নেয়ার মহা প্রস্তুতি চলছে সেখানে। কী বলব ছাত্রদের উদ্দেশ্যে? শিক্ষকরা কী শুনতে চাইবেন আমার কাছে? পরের দিনের আরও কত ভবনা, ভাবতে ভাবতেই চোখ লেগে আসে শেখ মুজিবের। আগেভাগে বিছানা ছাড়ার হিসাব করেই ঘুমিয়েছিলেন। তারও আগে গুলির শব্দ। গোলাবর্ষণের আওয়াজ। যেন হঠাৎ ভূমিকম্প। গাছের পাতার মতো কেঁপে উঠল ৩২ নম্বরের বাড়ি। ঘুম ভেঙ্গে গেল নেতার। বাড়িসুদ্ধ লোক জেগে উঠল। ততক্ষণে ১৪ আর নেই, ১৫ আগস্ট। হিংস্র দানবের দল গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে ভেতর বাড়ির দিকে আসছে। এ বাড়ি ঘিরে কত ইতিহাস! বাঙালীর প্রতিরোধ সংগ্রামের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে এখান থেকে। পাকিস্তানীরা তবু বাড়ি টার্গেট করেনি। কিন্তু আজ কি হলো? গোষ্ঠী স্বার্থে অনেকেই বিভক্ত। নানা বিবাদে জড়াচ্ছে। তাদের কোন একটি কি এদিক দিয়ে যাওয়ার সময় বেয়াদবি করছে? মুজিব বোঝার চেষ্টা করছিলেন। এরই মধ্যে গুলির আঘাতে ভেঙ্গে পড়তে লাগল জানালার কাঁচ। পলেস্তরা খসে পড়তে লাগল। দুতলার শোবার ঘর থেকে অনেকটা খালি গায়ে নিচে নেমে আসলেন। পাঞ্জাবী গায়ে চড়াতে চড়াতে হাঁক দিলেন, কে রে তোরা? কী চাস আমার কাছে? হ্যাঁ, সেই পিতার কণ্ঠ। অধিকার নিয়ে জানতে চাওয়া। কিন্তু কী আশ্চর্য! বঙ্গবন্ধুর চেনা কণ্ঠে গুলির শব্দ বাড়ে বৈ কমে না। সীমানা প্রাচীরের ভেতরে ঢুকে গুলি ছোড়া হচ্ছে। যে কোন কিছু ঘটে যেতে পারে। কিন্তু আজ কেন খারাপ কিছু ঘটতে যাবে? কষ্টের দিন আর কত? আর কেন মৃত্যু? স্বাধীন দেশে যত বড় দেশ বিরোধীই থাকুক না কেন, মুজিবের বুকে গুলি চালাতে পারে না। স্ত্রী সন্তানদের ওপর তো নয়ই।

জানালার কাঁচের মতো মুজিবের সকল বিশ্ব‍াস একে একে ভেঙ্গে পড়তে থাকে। তাঁর প্রায় চোখের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় বড় ছেলে কামলকে। ঘাতকেরা এরপর ছুটে আসতে থাকে নেতার দিকে। নেতাও এগিয়ে যান। কী আসলে হচ্ছে? অভিবাক তিনি। তাঁকে জানতে হবে। জানার সুযোগটুকু দেয়া হয় না। মুহূর্তেই ব্রাশফায়ার। বাড়ির প্রথম তলার সিঁড়ির মাঝখানে যে সমতলভাগ, তার তিন-চার ধাপ ওপরে লুুটিয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু। সেই যে বুকের কথা বলছিলাম, বাংলাদেশকে আগলে রাখা বুকে বুলেটের পর বুলেট এসে বিদ্ধ হতে থাকে। তলপেট ঝাঁঝরা হয়ে যায়। আর সেই যে তর্জনী, যেটি বাঙালীর শৌর্য-বীর্যের প্রতীক হয়ে ওঠেছিল, গুলি এসে লাগে সেখানেও। ৭ মার্চের তর্জনী বাহু থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঝুলে থাকে। পরনে তখন চেক লুঙ্গি। পাঞ্জাবি। রক্তে ভেসে যেতে থাকে। চোখ থেকে ছিটকে পড়ে চশমা। একটি গ্লাস ভাঙ্গা। পাইপটা নিভে গেছে। মুজিবের হৃদস্পন্ধন তখনও বন্ধ হয়নি। আমার দেশের ছেলেরা আমার বুকে গুলি চালাল? কিছুটা যেন লজ্জায় পড়ে যান জাতির পিতা। নিজের কাছে নিজে ছোট হয়ে যান। দেশটার কী হবে? আমার দেশ, সোনার বাংলা…। মানুষগুলোকে দেখে রাখবে কে? বড় বড় ছিদ্র হওয়া পাঁজর আর এখানে ওখানে থেতলে যাওয়া শরীর নিয়ে ছটফট করতে করতে ভাবেন নেতা। শারীরিক যন্ত্রণার চেয়ে দেশ ও জনগণের দুর্ভাগ্যের কথা ভেবে বেশি কষ্ট পেতে থাকেন। এরই মাঝে সিঁড়িতে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা অবস্থায় তিনি টের পান তাঁর রক্তাক্ত দেহ ডিঙিয়ে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে নিষ্ঠুর ইয়াজিদের দল। দু’তলায় তার শোবার ঘরে স্ত্রী পুত্র পুত্রবধূরা আশ্রয় নিয়েছে। সেদিকেই যাচ্ছে ওরা। বঙ্গবন্ধু ভেবে পান না, উপরে আর কেন? মুজিবের রক্তেও কি মিটলো না পিপাসা? নেতা শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে যেন বলার চেষ্টা করেন, রেণু, সিঁড়িতে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকো না। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দাও। আমার কথা ভাবতে হবে না। আমার কামালকে ওরা মেরে ফেলেছে। জামাল, ঘর থেকে বের হোস নে বাবা। আমার বৌমা, বৌমারা কোথায়? ভয় পেও না, মায়েরা। তোমরা অন্য বাড়ির মেয়ে। তোমাদের কেন মারবে? সাহস রাখ, মা। আশ্চর্যের যে, এমন বিপদের দিনে কনিষ্ঠ পুত্র রাসেলের কথা তাঁর অনেক পরে মনে পড়ে। আসলে তিনি ধরেই নিয়েছিলেন, ১০ বছরের শিশুকে গুলি করার মতো পাষন্ড তাঁর দেশে একটিও জন্মায়নি। ফুটফুটে মুখের দিকে তাকালে, যতই চেষ্টা করুক, গুলি চালাতে পারবে না ওরা। আর শুধু শুধু কেন মারবে মাসুম বাচ্চাকে? আল্লা আছে তো। পারবে না। নাকি ওরা সব পারে? মুজিব সিঁড়ির মেঝেতে আরও মিশে যান। ভাল করে কান পাতার চেষ্টা করেন। উপর থেকে আর্তচিৎকার ভেসে আসছে। ঝনঝন শব্দে নিচে গড়িয়ে পড়ছে বুলেটের খোসা। বাংলার সিংহপুরুষ এই প্রথম ভয় পান। অসহায় বোধ করেন। এমন কেয়ামতের দিনে কিছুই তার করার নেই! নিজের জন্য দ্রুত আরও দ্রুত মৃত্যু কামনা করেন তিনি। একটু আগে মৃত্যু হলে এত এত প্রিয় মানুষের সর্বশেষ পরিণতি দেখে যেতে হবে না।

কিন্তু তাঁর হাসু? রেহানা? আদরের মেয়ে দুটি ঠিক আছে তো? জার্মানীতে ওরা। সাত সমুদ্র তেরো নদী দূরত্ব। নিশ্চয়ই ওদের কোন ক্ষতি হবে না। কাজের চাপে টেলিফোনে কতদিন প্রাণখুলে কথা বলা হয়নি। আহা, একটু যদি কথা বলা যেত! হাসুকে সাসহ দিতে হবে, দোয়া করে দিতে হবে। ভেতরটা হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠে পিতার। টেলিফোনটা খুঁজতে থাকেন তিনি। শেষবারের মতো উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করেন। ঠিক তখন মনে পড়ে যায়, তাঁর বাসার টেলিফোন লাইনটাও কাটা। একটি লাইনে কোনরকমে যোগাযোগ করা গেলেও, নপুংশক সেনা প্রধানটি উল্টো বলেছিল, ‘ক্যান ইউ গেট অফ দ্য হাইজ?’ সব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন নেতা, বেদনায় দুঃখে ক্ষোভে ঘৃণায় অপমানে চোখ বুজেন। রক্তের ওপর ভাসতে থাকা মুজিবের চোখ থেকে শেষ অশ্রুবিন্দুটি গড়িয়ে পড়ে নিষ্ঠুর পৃথিবীর বুকে।

রবীন্দ্রনাথ গানে গানে বলছিলেন: কেন চোখের জলে ভিজিয়ে দিলেম না…। জাতির পিতা চোখের জলে, বুকের তাজা রক্তে ভিজিয়ে দিয়ে গেলেন গোটা বাংলাদেশটাকেই!