জিয়া-মোশতাক গংদের মুখোশ উন্মোচনে তদন্ত কমিশন চায় ১৪ দল

প্রকাশিত: ২:১০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৯, ২০২০ | আপডেট: ২:১০:অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৯, ২০২০

ঢাকা: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কুশীলবদের খুঁজে বের করতে একটি জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন করার প্রস্তাব দিলেন কেন্দ্রীয় ১৪ দলের নেতারা। নেতারা এই প্রস্তাবটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তুলে ধরারও দাবি জানিয়ে জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে জিয়াউর রহমান ও খন্দকার মোশতাকসহ কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করার দাবি করেন।

বুধবার (১৯ আগস্ট) জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে ১৪ দলের ভার্চুয়াল সভায় এ সব দাবি উত্থাপন করেন কেন্দ্রীয় নেতারা। পরে ১৪ দলের সমন্বয়ক ও মূখপাত্র এবং আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা যেতে পারে বলে মত দেন।

সভাপতির বক্তব্যে আমির হোসেন আমু বলেন, ‘এ সভা থেকে অনেকেই তদন্ত কমিশন গঠনের প্রস্তাব করেছেন। কমিশন গঠন করার মধ্য দিয়ে তদন্ত করা হোক, যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল, কারা নেপথ্যে নায়ক ছিলেন। যারা নেপথ্যে নায়ক হিসেবে হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করেছেন এ জন্য একটি তদন্ত কমিশন গঠন হওয়া উচিত। আমি মনে করি, ১৪ দলের পক্ষ থেকে দাবি জানাচ্ছি এবং এটি গ্রহণ করা যেতে পারে।’

আমির হোসেন আমু বলেন, ‘১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের কালরাতে জাতির জনককে সপরিবারে হারিয়েছিলাম। হারাবার মধ্যে দিয়ে সেদিন হারাতে শুরু করেছিলাম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মূল্যবোধ। যে জাতীয় চারনীতির ভিত্তিতে সংবিধান রচিত হয়েছিল সেই জাতীয় চারনীতি ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এই দেশে সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতির কোনো অনুমোদন ছিল না সংবিধানে, সেটা তুলে দিয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটনা হয়েছিল। গোলাম আযমের নাগরিকত্ব না থাকার পরেও তাকে নাগরিকত্ব দিয়ে দেশে এনে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। এই দেশকে একটি নব্য পাকিস্তানি করবার ষড়যন্ত্র নিয়েই ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্টের হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিল। ১৯৭১ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘটিয়েছিল।’

আমু আরও বলেন, ‘জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বিল পাশ করেছিল। হত্যাকারীদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছিল। বঙ্গবন্ধুর আমলে সাড়ে ১১ হাজার যুদ্ধাপরাধী কারাগারে বন্দি ছিল তাদের মধ্যে সাড়ে ৪০০ লোকের বিভিন্ন রকমের সাজা হয়েছিল সেই সাজাপ্রাপ্তের মধ্যে ৫২ জনের ফাঁসির আদেশ হয়েছিল, একজনের ফাঁসির আদেশ কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি করে দিয়েছিল শাহ আজিজের মতো লোককে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিল। জিয়াউর রহমান এই দেশে পরাজিত শক্তিদের জাতীয় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেয়।’

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়নি, আমাদের স্বাধীনতার চেতনা মূল্যবোধকে হত্যা করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী কয়েকজন খুনির জবানবন্দিতে এটা পরিষ্কার যে জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল এতে কোনো সন্দেহ নেই। পাকিস্তানিরা পারেনি, খন্দকার মোশতাক ও জিয়া দেশি-বিদেশি ষড়ন্ত্রের মাধ্যমে সেদিন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছিল।’

তিনি বলেন, ‘সময় এসেছে একটা কমিশন গঠন করে তদন্ত করা। কারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল যারা বিদেশি তারা কারা? তদন্ত করলে প্রকৃত কুশীলবরা বেরিয়ে আসবে।’

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চেয়ে বহুদিন রাজপথে দাবি করে আসছি কিন্তু আমাদের কথা কেউ শোনে না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করার পর বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসি হয়েছে। অনেকে পালিয়ে বিদেশে রয়েছে। আশা করি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকার পলাতাক খুনিদের ধরে এনে ফাঁসির রায় কার্যকর করা হবে। খুনি যারা তাদের রায় হয়েছে, কিন্তু তাদের মূল পরিকল্পনাকারী, ষড়যন্ত্রকারী তারা কিন্তু আড়ালে রয়েছে। বারবার দেশের মানুষ জানতে চায মূল পরিকল্পনাকারী কারা? কারা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেছিল? যদি পরিকল্পনাকারীদের সঠিকভাবে ধরা না হয় তাহলে ষড়যন্ত্র চলছে, চলতেই থাকবে। যদি মূল ষড়যন্ত্রকারীদের ধরা হয় ষড়যন্ত্র চিরতরে ধ্বংস হবে। এ জন্য কমিশন গঠন করে খুনি জিয়াসহ কুশীলবদের বের করে আনতে হবে।’

ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রকে হত্যা করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। যারা স্বাধীনতা চায়নি যে আন্তর্জাতিক শক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আমাদের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা পাকিস্তানের চর হিসেবে, যারা আমাদের মাঝে ছিল তারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। নীল নকশার মাধ্যমে দেশকে হত্যা করার জন্য আমাদের স্বাধীনতা হত্যা করার লক্ষ্যে হত্যাকাণ্ড হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডের কুশীলব জিয়া-মোশতাকসহ যারা কুশীলব ছিল তাদেরও বিচার হওয়া প্রয়োজন। একটি কমিশন গঠন করে বঙ্গবন্ধু হত্যার কুশীলব ও ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার করার প্রস্তাব করছি। এটা ব্যতিরেকে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার অপরিপক্ক হবে। জীবিত কুশীলবদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার পরিপূর্ণতা পাবে। পরবর্তী প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে।’

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড কোনো ব্যক্তির হত্যা ছিল না, এটা ছিল রাজনীতিকে হত্যা, বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিতে মুক্তিযুদ্ধের পথ থেকে সরিয়ে আনতে এবং স্বাধীনতার ঘোষণা সামাজিক ন্যায় বিচারের থেকে সরিয়ে নেওয়ার হত্যাকাণ্ড। জিয়া সংবিধান খণ্ডবিখণ্ড করেছে। সময় এসেছে একটি কমিশন গঠন করে কুশীলবদের খুঁজে বের করার।’

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির হত্যাকাণ্ড নয় অথবা শুধুমাত্র ক্ষমতার রদবদলের হত্যাকাণ্ড নয় এটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকান্ড। এ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করা হয়নি, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র এবং সংবিধানের আত্মাকে ধ্বংস করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল। বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে সাম্প্রদায়িকতার পথে অপরাজনীতির পথে বাংলাদেশকে ঠেলে দেওয়ার একটা চেষ্টা মোশতাক এবং জেনারেল জিয়াউর রহমান গং’রা করেছিলেন।’

ইনু আরও বলেন, ‘এখনও সাম্প্রদায়িক অপরাজনীতি বহন করে চলেছে বিএনপি-জামায়াতসহ কতিপয় চক্র। সে জন্য আমরা এখন ষড়যন্ত্রর ভেতর আছি, চক্রান্তের ভেতর আছি। কারা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে? কারা তাদের পুরস্কৃত করেছে, কারা দেশে পাকিস্তানি রাজনীতি আমদানি করেছে? লালন করছে সবই প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে। বিএনপি বা যে কোনো মহল যে যুক্তিই দেখাক না কেন বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে খন্দকার মোশতাক ও জেনারেল জিয়া পরস্পর জড়িত। এই দায় তারা এড়াতে পারে না।’

ইনু বলেন, ‘জাতিকে সঠিক ইতিহাস চর্চা করার জন্য বঙ্গবন্ধু হত্যার কান্ডের নেপথ্যে নায়কদের স্বরূপ উন্মোচন করার জন্য ১৪ দলের পক্ষ থেকে একটি শক্তিশালী জাতীয় কমিশন গঠন করার প্রস্তাব করছি। কমিশন গঠন করে তদন্ত করা হোক তাহলেও নেপথ্যে নায়করা বেরিয়ে আসবে।’

সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, ‘জাতির পিতার একটা রাজনৈতিক আদর্শ ছিল, একটা কমিটমেন্ট ছিল। ওনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতীক ছিলেন। উনি গণতন্ত্রের প্রতীক ছিলেন। উনি শোষিত-বঞ্চিত নিপীড়িত জনগণের প্রতীক ছিলেন। উনি যদি জীবিত থাকতেন, হয়ত এই সময়ে আমরা বাংলাদেশকে একটি আধুনিক বাংলাদেশে রূপান্তর করতে পারতাম। বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যদিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি। যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’

১৪ দলের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র আমির হোসেন আমুর সভাপতিত্বে ভার্চুয়াল সভায় বক্তব্য রাখেন, জাসদের আম্বিয়া, তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী, জেপির শেখ শহিদুল ইসলাম, ন্যাপের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন, বাসদের আহ্বায়ক রেজাউর রশিদ খান, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন, গণআজাদী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট এস কে শিকদার, কমিউনিস্ট কেন্দ্রের আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন। সভা সঞ্চালনা করেন আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মৃনাল কান্তি দাস।