বউ পেটানো এসি ল্যান্ড বহাল তবিয়তে

প্রকাশিত: ১১:২৩ অপরাহ্ণ, জুন ২৮, ২০২০ | আপডেট: ১১:২৩:অপরাহ্ণ, জুন ২৮, ২০২০

বিএম জাহাঙ্গীর।প্রশাসন ক্যাডারের ৩৪তম বিসিএসএস কর্মকর্তা সারোয়ার সালাম চাকরিজীবনের শুরুতেই স্ত্রীকে মারধর করে হাত বেশ রপ্ত করে ফেলেছেন। শুধু তাই নয়, গভীর এক পরকীয়ায় মজেছেন ব্যাচমেটের সঙ্গে।

মূলত এ কারণেই সংসারজীবনের সূচনাপর্বেই সাজানো সংসার ভেঙে চুরমার। দিনের পর দিন স্ত্রী ও শিশুসন্তানের খবর নেননি।

অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে স্ত্রী খাদিজার ভাগ্যে জুটত দফায় দফায় শারীরিক নির্যাতন।

এমনকি হরহামেশা তালাকের হুমকি। ইংরেজি সাহিত্যে পড়ালেখা শেষ করলেও স্বামীর অব্যাহত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে বিপর্যস্ত খাদিজা আকতারের ক্যাডার সার্ভিসে চাকরি করার স্বপ্ন এখন শুধুই দুঃস্বপ্ন।

এদিকে ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

এগুলো হল : স্ত্রী-সন্তানকে অধিকারবঞ্চিত করা, স্ত্রীকে নির্যাতন করা, পরকীয়া এবং তালাক প্রদানের হুমকি দেয়া।

সূত্র জানায়, তদন্ত প্রতিবেদনসহ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ১৪৩ পৃষ্ঠার ডকেটসহ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে গত ২৫ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

কিন্তু এরপর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রশাসনিক যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তা খুবই মন্থর। বিশেষ করে এ ধরনের অপরাধ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে দ্রুত ওএসডি করা হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কিছুই করা হয়নি।

প্রসঙ্গত, ভুক্তভোগী খাদিজা আকতার ২০১৯ সালের ৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার এবং ২০ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দেন। যেখানে অভিযোগের সপক্ষে নির্যাতনের বিভিন্ন ছবি এবং ফোনকলের অডিও রেকর্ডের ক্লিপ ছিল। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশে এক পর্যায়ে ১৯ ডিসেম্বর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। যার প্রধান ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইখতিয়ার উদ্দিন আরাফাত।

গত ৩ মার্চ তিনি ১৩ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। এদিকে তদন্ত প্রতিবেদনসহ এ ঘটনার বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণ যুগান্তরের হাতে এসেছে। তদন্ত প্রতিবেদনের শেষ পৃষ্ঠায় ৮নং কলামে মতামত অংশে ৬টি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়, ভরণপোষণ না দিয়ে সারোয়ার সালাম স্ত্রী ও সন্তানকে প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন।

শারীরিক নির্যাতনের বিষয়ে বলা হয়, এটি ফৌজদারি অভিযোগ, যা যাচাইয়ের জন্য উপযুক্ত বিশেষজ্ঞ দ্বারা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তবে মানসিক নির্যাতনের বিষয়টি সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

পরকীয়া সংক্রান্ত ৮টি অডিও ক্লিপের কথোপকথন বিশ্লেষণ করে তদন্ত কমিটি পরকীয়ার অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পেয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের মধ্যে ফোন রেকর্ডের অনেক কথাবার্তা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ২নং রেকর্ডে সারোয়ার সালাম তার স্ত্রী খাদিজা আকতারকে বলেন, ‘তিনি তৃতীয় কোনো ব্যক্তির অপূরণীয় ক্ষতি করেছেন।

তিনি অন্য আরেকজনকে বিয়ে করলে খাদিজা আকতার যেন তার সঙ্গে বোনের মতো থাকে। তার হাতে এখন ২টি অপশন আছে- ডিভোর্স দেয়া অথবা উইদাউট ডিভোর্স।’

জানা গেছে, খাদিজা আকতারের দাম্পত্যজীবনের ৩ বছর পার না-হতেই স্বামীর পরকীয়ার ছোবলে সংসার এক রকম ভেঙে যায়। তাদের বিয়ে হয়েছিল ২০১৬ সালের মে মাসে। ২০১৭ সালে ঘর আলো করে ফুটফুটে এক কন্যাসন্তান আসে। কিন্তু ২০১৮ সাল থেকেই বিনা মেঘে বজ পাতের মতো পরকীয়ায় ফাটল ধরে খাদিজার সাজানো সংসারে।

এরপর নানামুখী নির্যাতনের মুখে বেশিদিন আর এক সঙ্গে থাকা হয়নি তাদের। শেষ চেষ্টা হিসেবে গত বছর জুনে এক মাসের জন্য সংসার করেছিলেন বি.বাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের কর্মস্থলে। কিন্তু নির্যাতনের কারণে সেখানে আর থাকতে পারেননি। এক রাতে বালিশচাপা দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। তারপর জীবনভয়ে সন্তান নিয়ে চলে আসেন।

একবার তো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি হতে হয়েছিল। নির্যাতনের কারণে দু’বার থানায় জিডি পর্যন্ত করেছেন। একটা হল রাজধানীর কদমতলী থানা, অপরটি নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানায়। তা সত্ত্বেও অনেক চেষ্টা করেছেন সংসার টিকিয়ে রাখতে।

কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ভুক্তভোগী বলেন, ‘হাতে গোনা ২/১ জন সিনিয়র অফিসার ছাড়া বেশিরভাগ সহকর্মী ও কর্মকর্তা আমার সংসারের কথা না ভেবে তাদের ক্যাডারের সম্মান বাঁচানোর জন্য সবকিছু ধামাচাপা দিতে সারোয়ার সালামকে প্রটেকশন দিয়েছেন।’ তিনি দিনের পর দিন বহু কর্মকর্তার দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। প্রতিকার পাননি।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যাদের কাছে তার নথিপত্র রয়েছে তারাও তদবিরের চাপে কিছু করতে পারছেন না। এত বড় অপরাধ করার পরও অভিযুক্ত সারোয়ার সালামের স্বপদে বহাল তবিয়তে থাকায় প্রমাণ করে নেপথ্যে প্রভাবশালী কেউ তার পক্ষে ভূমিকা রেখে চলেছেন।

এ প্রসঙ্গে বর্তমানে নোয়াখালীর হাতিয়ায় এসি ল্যান্ড হিসেবে কর্মরত অভিযুক্ত কর্মকর্তা সারোয়ার সালামের বক্তব্য জানতে চাইলে রোববার তিনি  বলেন, তদন্তাধীন বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চান না।

সূত্র জানায়, প্রশাসনে সারোয়ার সালামদের মতো কর্মকর্তার সংখ্যা হাতে গোনা এক-দু’জন নয়। দ্রুত তদন্ত শেষ করাসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার কারণে কর্মকর্তাদের নৈতিক স্খলনজনিত গুরুতর অপরাধ দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

জামালপুরের সেই আলোচিত ডিসি আহমেদ কবির গত বছর ঐহিত্যবাহী প্রশাসনকে একেবারে অতল সাগরে ডুবিয়েছিল। কর্মস্থলে অফিস সহায়কের সঙ্গে তার অনৈতিক সম্পর্কের ভিডিও সর্বত্র ভাইরাল হয়। একই বছর আর একটি আলোচিত ঘটনা ছিল সুনামগঞ্জের তাহেরপুরের ইউএনও আসিফ ইমতিয়াজের।