কারবালার নয় রোজা রাখুন আশুরার

প্রকাশিত: ১:৫৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৬, ২০২০ | আপডেট: ১১:০৫:অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৬, ২০২০

মুফতি মুহাম্মাদ আকতার আল-হুসাইন

হিজরী ৬১ সনের পবিত্র মুহাররাম মাসের দশ তারিখে কারবালার ময়দানে জান্নাতী যুবকদের সর্দার হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) ও উনার পরিবারের সদস্যদের শাহাদাত মুসলিম মিল্লাতের জন্য বড় হৃদয় বিদারক। নিঃসন্দেহে এই দিন আসলে মুসলমানদের অন্তর আত্মা ক্ষেপে উঠে কারবালার ঘটনার স্মরণে। তাই এই দিনকে উপলক্ষ্য করে মুসলিম সমাজে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা, স্বরণ সভা ও দোয়া মাহফিল। যেগুলো যুগ যুগ ধরে কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতেই অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

আবার এই দিনকে পালন করতে গিয়ে আমাদের সমাজে কিছু ভুল কাজ করা হয় যেগুলো আসলে ঠিক নয়। যেমন হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) ও কারবালার ঘটনাকে স্বরণ করে নিজের শরীরকে জখম ও রক্তাক্ত করা, বুক চাপড়ানো, চেহারায় আঘাত করা, মাতম বা আহাজারি করা, শোক মিছিল বা তাযিয়া বের করা, ইয়া আলী, ইয়া হুসাইন বলে আবেগ জাহির করা, এ দিনকে কাতল-মন্জিলের দিন বলা ও জাহিলি যুগের মতো কথা-বার্তা বলা ইত্যাদি। আবার অনেকেই শোকের মাস কিংবা অশুভ সময় মনে করে উক্ত মাসে বিবাহ-শাদী থেকে বিরত থাকেন। এটি সম্পূর্ণ অনৈসলামিক ধারণা ও কুসংস্কার। এ মাসকে অশুভ মনে করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মাসকে আল্লাহর মাস বলে অভিহিত করেছেন।

⬛ বিশেষত এই দিনে অনেকে রোজা রাখেন কারবালার রোজা বলে। অথচ এই রোজা কারবালার ঘটনার বহু আগ থেকেই শুরু হয়েছে বিশেষ করে হযরত মুসা (আঃ) এর মাধ্যমে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই এই রোজা রেখেছেন এবং সাহাবাদের রাখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমনকি রামাদ্বানের রোজা ফরয হওয়ার পূর্বে আশুরার রোজা বাধ্যতামুলক ছিল। সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফের হাদীসে এসেছে- “হযরত আয়শা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে আশুরার দিনে রোজা পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন, পরে যখন রামাদ্বানের রোজা ফরয করা হলো তখন যার ইচ্ছা আশুরার রোজা পালন করত আর যার ইচ্ছা করত না”।

🕋 রামাদ্বানের পরেই আশুরার রোজার অবস্থান। সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে এসেছে- “হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- রামাদ্বানের পরে সর্বোত্তম রোজা হল মুহাররাম মাসের রোজা (অর্থাৎ আশুরার রোজা) এবং ফরয নামাজ পরে সর্বোত্তম নামাজ হল রাতের নফল নামাজ (অর্থাৎ তাহাজ্জুদের নামাজ)”।

🕋 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই আশুরার রোজা রেখেছেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফের হাদীসে এসেছে- “হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় এসে দেখলেন যে, ইহুদীরা আশুরার দিনে রোজা পালন করছে। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এটা কোনদিন যে তোমরা রোজা পালন করছ? তারা বলল, এটা এমন এক মহান দিবস যেদিন আল্লাহ হযরত মূসা (আঃ) ও তার সম্প্রদায়কে নাজাত দিয়েছিলেন। তাই হযরত মূসা (আঃ) শুকরিয়া হিসেবে এ দিনে রোজা পালন করেছেন। এ কারণে আমরাও রোজা পালন করে থাকি। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের চেয়ে আমরা মূসা আলাইহিস সালাম এর অধিকতর ঘনিষ্ট ও নিকটবর্তী। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোজা পালন করলেন ও অন্যদেরকে রোজা পালনের নির্দেশ দিলেন”।

🕋 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশুরার রোজাকে খুব গুরুত্ব দিতেন। সহীহ বুখারী শরীফের দুটি হাদীসে এসেছে- “হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আশুরার দিনের রোজার উপরে অন্য কোন দিনের রোজাকে গুরুত্ব দিতে দেখিনি এবং এ মাস, অর্থাৎ রামাদ্বান মাস এর উপর অন্য মাসের গুরুত্ব প্রদান করতেও দেখিনি”। আপর হাদীসটি “হযরত সালামাহ ইবনে আকওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসলাম গোত্রের এক ব্যক্তিকে লোকজনের মধ্যে এ মর্মে ঘোষণা দিতে আদেশ করলেন যে, যে ব্যক্তি খেয়েছে, সে যেন দিনের বাকি অংশে রোজা পালন করে, আর যে খায়নি, সেও যেন রোজা পালন করে। কেননা আজকের দিন আশূরার দিন”।

🕋 এক বছরের গোনাহ মাফ হয়। সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে এসেছে- “হযরত আবূ কাতাদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- আশুরার দিনের রোজার দ্বারা আমি আল্লাহর নিকট বিগত বছরের গুনাহ মাফের আশা রাখি”।

🕋 দুটি রোজা রাখা মুস্তাহাব। সহীহ মুসলিম ও আবু দাউদ শরীফের হাদীসে এসেছে- “হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন,
যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশুরার রোজা রাখলেন এবং অন্যদেরকে রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। তখন সাহাবীরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এটিতো এমন দিন, যাকে ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা বড় জ্ঞান করে সম্মান জানায়। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আগামী বছর এদিন আসলে, আমরা নবম দিনও রোজা রাখব ইনশা আল্লাহ”। মুসনাদে আহমদের হাদীসে এসেছে- “হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- তোমরা আশুরার দিনে রোজা রাখ। আর এ ব্যাপারে ইহুদীদের সাথে বিরোধিতা/ব্যতিক্রম কর। আশুরার আগে বা পরের দিন রোজা রাখ”।

🕋 আশুরার দিনে যা করণীয়। উপরে বর্ণিত হাদীস সমূহের আলোকে আমরা এই দিনে যে কাজগুলো করতে পারি বা করব সেগুলো হচ্ছে-

👍যেহেতু এই দিন হযরত মুসা (আঃ) আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে রোজা রেখেছেন, তাই আমরা এই দিন আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার মনোভাব সৃষ্টি করতে হবে।

👍যেহেতু আল্লাহর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের আমল ছিল এই দিন রোজা রাখা সুতরাং আমরা এই দিন রোজা রাখব।

👍যেহেতু এই দিন একটি উত্তম দিন তাই আমরা সেদিন বিভিন্ন নেক আমল ও দুআ-ইস্তিগফার করতে পারি ।

👍পরিবার-পরিজনদের জন্য উত্তম খাবারের ব্যবস্থা করতে পারি। হাদীসের কিতাবসহ অন্যান্য কিতাবে এগুলোর বর্ননা পাওয়া যায়।

🤲 কুরআন-সুন্নাহ অনুসরণে সঠিক আমল করার তৌফিক আল্লাহ আমাদের দান করুন। (আমিন)

 

 

 

লেখক: ইমাম ও খতিব ওল্ডহাম জামে মাসজিদ, যুক্তরাজ্য