সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল সেই কিশোরের নারীর সামনে উলঙ্গ ভিডিও প্রসঙ্গে

প্রকাশিত: ৮:১৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৬, ২০২০ | আপডেট: ১১:০৪:অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৬, ২০২০

চট্টগ্রাম ব্যুরোএক নারীর সামনে অশালীন আচরণের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর চট্টগ্রামে এক কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ।মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাত ৮টার দিকে বাবলু নামের ওই কিশোরকে নগরীর আগ্রাবাদ থেকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মেহেদী হাসান।আটক বাবলু (১৬) নগরীর সদরঘাট থানার পশ্চিম মাদারবাড়ি এলাকায় টং ফকির শাহ মাজার লেনে একটি গলির বাসিন্দা।

উপপুলিশ কমিশনার মেহেদী হাসান  বলেন, ‘ফেসবুকে একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে। আমরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। সেজন্য ছবির ওই কিশোরকে আটক করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আসলে ঘটনা কী ঘটেছিল, সেটা জানতে চাইব। এরপর যদি সত্যিই কোনো অভিযোগ পাই, তাহলে তাকে সুনির্দিষ্ট মামলায় গ্রেফতার দেখানো হবে।’মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ছবিতে দেখা যায়, একটি ভবনের নিচে এক নারী দাঁড়িয়ে আছেন। দূরে বিবস্ত্র অবস্থায় অশ্লীল অঙ্গভঙ্গিরত এক কিশোর। তার পেছনে দুই নারীকেও দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন পোস্ট বলছে, ওই দু’জন কিশোরটির মা ও বড় ভাইয়ের স্ত্রী।

অভিযোগ আসে, ছবিতে ভবনের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। শুরু হয় আলোড়ন। তবে পুলিশ জানিয়েছে, তাদের কাছে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। তারাও ফেসবুকেই বিষয়টি দেখেছেন।

সরে জমিনে যা জানা গেলো-

ঘটনাটি চট্টগ্রাম নগরীর সদরঘাট থানার পশ্চিম মাদারবাড়ি এলাকায় টং ফকির শাহ মাজার লেনে একটি গলিতে গত ১৯ আগস্ট ঘটেছে। তবে ফেসবুকে ছবি ভাইরাল হওয়ার পর মঙ্গলবার দুপুর থেকে বিষয়টি জানাজানি হয়েছে। দুই পরিবারের মধ্যে ঝগড়ার মধ্যেই কিশোরের অশালীন অঙ্গভঙ্গির ছবিটি ধরা পড়ে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায়।

টং ফকির শাহ মাজার লেনের একটি অপ্রশস্ত গলিতে প্রায় মুখোমুখি দু’টি বাড়ি। একটি চার তলা আব্দুর রাজ্জাকের মালিকানাধীন। স্থানীয়রা তাকে আব্দুর রাজ্জাক বেইঙ্গ্যা বলে ডাকেন। আরেকটি বাড়ি দোতলা, যার মালিক স্থানীয় বাবলু স্টোর নামে একটি স্টেশনারি দোকানের মালিক ছালেহ আহমেদের। দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ পুরনো। প্রায়ই তাদের মধ্যে ঝগড়া-মারামারি হয় বলে স্থানীয়রা জানালেন।

ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ছবির কিশোর এবং পরে আটক মো. বাবলু দোকানি ছালেহ আহমেদের ছেলে। এলাকায় বখাটে হিসেবেও পরিচিতি আছে তার। আর ছবিতে যে নারী হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হচ্ছে, তিনি দুই পরিবারেরই প্রতিবেশী এক পরিবারের। এক সন্তানের মা ওই নারী থাকেন নগরীর পূর্ব মাদারবাড়ি এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে।

গলির প্রবেশমুখেই ছালেহ আহমেদের দোকান। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি নিজ থেকেই কথা বলতে উদগ্রীব হন।

ছালেহ আহমেদ  বলেন, ‘আব্দুর রাজ্জাক বেইঙ্গ্যার সঙ্গে আমাদের ঝগড়ার সময় সেই বাসার ওপর থেকে খারাপ ভঙ্গি করে। তখন আমার ছেলেও একই কাজ করেছে। সে মুরব্বী হয়ে যদি উলঙ্গ হতে পারে, আমার ছেলের বয়স তো মাত্র ১৬ বছর, সে তো ছোট, সেজন্য সে-ও করেছে।’

আব্দুর রাজ্জাকের অশালীন আচরণের কোনো ছবি আছে কি না— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আব্দুর রাজ্জাকের বাসার ওপর সিসি ক্যামেরা আছে। সেখানে আমার ছেলের ছবি উঠেছে। কিন্তু আমাদের বাড়িতে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। সেজন্য আব্দুর রাজ্জাকও যে উলঙ্গ হয়েছে, সেটার ছবি আমাদের কাছে নেই।’

ওই নারীর সঙ্গে কোনো ধরনের অশালীন আচরণ বাবলু করেনি দাবি করে তার বাবা বলেন, ‘ওই মেয়ে আমাদের প্রতিবেশী। তার সঙ্গে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। ওই মেয়ের সঙ্গে আমাদের কোনো ঝগড়া নেই। কোনো বিরোধও নেই। সে আমাদের বাড়িরই মেয়ে। ঝগড়া শুনে ওই মেয়ে দেখতে এসেছিল। তাকে আমার ছেলে কিছুই বলেনি।’ বারবার অনুরোধের পরও বাবলুকে সামনে আনেননি ছালেহ আহমেদ।

ছালেহ আহমেদের সঙ্গে কথা শেষ করার আগেই আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে পরিচয় দিয়ে একজন এবং তার সঙ্গে কয়েকজন উঠতি বয়সের যুবক এই প্রতিবেদকের কাছে আসেন। রাজ্জাকের ছেলে মো. রায়হান নিজ থেকেই তার মোবাইলে সংরক্ষিত তাদের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখালেন। ওই ফুটেজে ঝগড়ারত অবস্থায় বাবলুর অশালীন আচরণের দৃশ্যটি সংরক্ষিত আছে। বোঝা গেল, মূলত রাজ্জাকের বাসার সিসি ক্যামেরায় সংরক্ষিত ফুটেজ থেকে নেওয়া ছবিই ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে।

রায়হানের দাবি, বাবলুসহ এলাকার কয়েকজন কিশোর-তরুণ ইয়াবার ব্যবসা করে। তারা প্রায়ই এলাকার নারীদের উত্ত্যক্ত করে। কয়েকদিন আগে তাদের বাসায় হামলা করে সিসি ক্যামেরা ভেঙে ফেলে। এ নিয়ে আদালতে দায়ের হওয়া একটি মামলা তদন্তাধীন আছে।

বাবলু ওই নারীর সঙ্গে অশালীন আচরণ করেছিল কি না, জানতে চাইলে রায়হান  বলেন, ‘বাবলু ওর সঙ্গেই বেয়াদবি করেছিল, সবার সঙ্গে সে বেয়াদবি করে।’

যে নারীকে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে, তার মায়ের বাসায় গিয়ে অসুস্থ বৃদ্ধা মাকে পাওয়া গেল। সম্পাদকীয় নীতি অনুযায়ী ওই নারী এবং তার মায়ের নাম প্রকাশ করা হলো না।

তার মা ফেসবুকে ছবি দেখে এবং অভিযোগের কথা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে পূর্ব মাদারবাড়িতে থাকে। সে বেড়াতে এসেছিল। ঝগড়া শুনে সে দেখতে গিয়েছিল। আমাদের সঙ্গে কারও ঝগড়া হয়নি। ঝগড়া হয়েছে আব্দুর রাজ্জাক ও ছালেহ আহমেদের পরিবারের সঙ্গে।’

তার মেয়েকে যৌন হয়রানি করা হয়েছিল কি না, অথবা কোনো অভিযোগ করেছেন কি না— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এরকম কোনো ঘটনা তো ঘটেনি। কিছু হলে তো আমার মেয়ে আমাকে বলত। আমরা তো কারও কাছে কোনো অভিযোগ করিনি। আমার মেয়েও তো শ্বশুরবাড়িতে চলে গেছে।’

তবে ওই বৃদ্ধা তার মেয়ের মোবাইল নম্বর ও শ্বশুরবাড়ির ঠিকানা জানাতে পারেননি। ঘটনার আকস্মিকতায় তাকে অপ্রস্তুত দেখা গেছে।

তাদের প্রতিবেশী রোখসানা বেগমের সঙ্গে কথা হয়, যিনি ঝগড়ার সময় সেখানে ছিলেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘সব মিথ্যা কথা। সে গেছে ওখানে ঝগড়া দেখার জন্য। আমিও পাশে ছিলাম। ঝগড়া হয়েছে আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে ছালেহ আহমেদের পরিবারের। রাজ্জাক নিজে উলঙ্গ হয়ে যায়, তখন বাবলুও হয়। আমাদের সঙ্গে কোনো সমস্যা হয়নি।’

রোকসানার সঙ্গে কথা শেষ করার পর রায়হান আরেকজন নারীকে তাদের পক্ষে সাক্ষী হিসেবে সামনে আনেন। শাহীনূর বেগম নামে ওই নারী  বলেন, ‘এখানে প্রায়ই ঝগড়া হয়। বাবলুরা নানাভাবে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে। এখানে আমাদের মা-বোনেরা থাকে। তাদের সামনেই করে।’

ছবির নারীকে যৌন হয়রানির উদ্দেশে বাবলু অশালীন আচরণ করেছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটা আমি জানি না। তবে বাবলু যখন এ কাজ করছিল, তখন সে এখানে দাঁড়িয়ে ছিল।’ এ নিয়ে কোনো অভিযোগ করেননি বলেও তিনি জানান।

এরপর কথা হয় বাবলুর মা জ্যোৎস্না বেগমের সঙ্গে। তিনি  বলেন, ‘রাজ্জাক প্রথমে নোংরা কাজ করেছে। সে পাথর মেরেছে। তখন আমার ছেলেও পাথর মেরেছে। সে-ও নোংরা কাজ করেছে। তার (ছবির নারী) সঙ্গে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। তাকে আমার ছেলে কোনো অসম্মান করেনি।’

একপর্যায়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে সেখানে উপস্থিত স্থানীয় ২০-৩০ জনকে সাক্ষী মানেন। তাদের মধ্যে অধিকাংশই আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে রায়হানের সামনেই জানান, ঝগড়ার সময় বাবলু অশালীন আচরণ করেছে, ওই নারীর সঙ্গে করেনি।

এলাকায় উপস্থিত অধিকাংশ লোকজনের মনোভাবও আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে দেখা গেছে। তবে রায়হানের দাবি, ছালেহ আহমেদের পরিবারের ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না।

তবে পুলিশ জানিয়েছে, আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে সদরঘাট থানায় চারটি মামলা আছে। গত ১২ জুলাই ওই এলাকায় ফারজানা আক্তার মিশু নামে এক ছাত্রলীগ কর্মী এবং তার বাবার ওপর হামলার অভিযোগে মামলা হয় সদরঘাট থানায়। এই ঘটনায় আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন এবং পরে সংবাদ সম্মেলন হয়।

সদরঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফজলুর রহমান ফারুকী বলেন, টং মাজারের পাশের গলিতে আব্দুর রাজ্জাক বেইঙ্গ্যা এবং ছালেহ আহমেদের পরিবারের মধ্যে বিরোধ অনেক পুরনো। প্রায় প্রতিদিনই দুই পরিবারের মধ্যে ঝগড়া হয়। ঝগড়া করতে গিয়ে তারা খুব নোংরা ভাষা ব্যবহার করে, নোংরা অঙ্গভঙ্গিও করে বলে অভিযোগ আছে। আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে সদরঘাট থানায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে চারটি মামলা আছে।’

বাবলু সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে জড়িত কি না— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার থানায় তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা নেই।