ঢাকা ২৪শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৯ই রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

নারায়ণগঞ্জে জিসা মনি কাণ্ড- ‘উল্টো ঝুলিয়ে নির্যাতন করে মিথ্যা স্বীকারোক্তি নেয় পুলিশ’ (ভিডিও)

LTN
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ৩, ২০২০
নারায়ণগঞ্জে জিসা মনি কাণ্ড- ‘উল্টো ঝুলিয়ে নির্যাতন করে মিথ্যা স্বীকারোক্তি নেয় পুলিশ’ (ভিডিও)

রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ।এখনও সেই দু:সহ স্মৃতি মনে করে ঘুমের ঘোরে আঁতকে উঠেন শীতলক্ষ্যার নৌকার মাঝি খলিল। কিডনি, টিবিসহ (যক্ষ্মা) নানা জটিল রোগে আক্রান্ত খলিল মাঝির এখনও মনে হয় কেউ তাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে মুখে কাপড় বেঁধে পানি ঢালছে আর তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। ভয়ে গুটিয়ে যাওয়া খলিল তখন স্ত্রী আর সন্তানদের জড়িয়ে ধরেন।

‘মৃত স্কুলছাত্রী’ জিসা মনির জীবিত ফিরে আসার ঘটনায় পুলিশের তদন্তে ধর্ষণের পর হত্যার স্বীকারোক্তি দেয়া নৌকার মাঝি খলিলুর রহমান বুধবার বিকালে জামিনে মুক্ত হন। পুলিশের ভয়ে জেলা কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর গণমাধ্যমকে অনেকটা এড়িয়ে চলছেন তিনি।

বুধবার সন্ধ্যায় অসুস্থ খলিল মাঝিকে নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলেন তার স্বজনরা উন্নত চিকিৎসার জন্য। কিন্তু অর্থের অভাবে রাতেই ফিরিয়ে আনা হয় তাকে।

বৃহস্পতিবার কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর  তুলে ধরেন সেই রিমান্ড আর লোমহর্ষক মিথ্যা জবানবন্দি আদায়ের ঘটনা।

খলিল মাঝি বলেন, গত ৮ আগস্ট তাকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে গ্রেফতারের কোনো কারণ বলা হয়নি। এসআই শামীম এসে তাকে ধরে নিয়ে যান। সদর থানায় তার সামনে দুই ছেলেকে (জিসা মনির কথিত প্রেমিক আব্দুল্লাহ ও অটোচালক রকিব) দেখিয়ে বলে, ‘তুই ওদের চিনিস’? তখন তিনি বলেন তাদের চিনি না।

তিনি বলেন, আমার হাত-পা রশি দিয়ে বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে মুখে গামছা বেঁধে অনবরত মুখে পানি ঢালত। পানি ঢালার কারণে দম বন্ধ হয়ে যেত। মিথ্যা স্বীকারোক্তি দেয়ার জন্য বারবার মুখে গামছা বেঁধে পানি ঢেলে নির্যাতন করেছে। যদি স্বীকারোক্তি না দেই তাহলে আমাকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।

আমি ওই দুই ছেলে ও কিশোরীকে চিনি না। জীবনে তাদের দেখি নাই। তবু শামীম স্যার আমাকে মারধর করেন আর বলেন, ‘তুই মিথ্যা কস। এভাবে আমাকে থানার লকআপে তিন দিন আটকে রেখে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়।

খলিলের স্ত্রী শারমিন বেগম বলেন, গ্রেফতারের পর দুই দিন থানায় ভাত দিয়েছি। পরের দিন ভাত নিয়ে গেলে রাখেনি পুলিশ। পুলিশ আমাগো দেখা করতেও দেয় নাই। এসআই শামীম উল্টা আমার কাছ থেকে ৬ হাজার টাকা নিয়েছিল।

তিনি বলেন, স্বামী খলিল বুধবার জামিনে মুক্ত হওয়ার পর তাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নিয়েছিলেন। এক্সরে ও অন্য বিভিন্ন পরীক্ষা দিয়েছে কিন্তু অনেক টাকা লাগবে দেখে পরীক্ষা না করিয়ে বাড়িতে ফেরত নিয়ে এসেছি। আগে থেকেই তার অসুখ ছিল। মারধর করে আরও অসুস্থ বানিয়ে ফেলেছে।

শারমিন জানান, প্রতিবন্ধী এক মেয়েসহ তিন মেয়ে নিয়ে তার পরিবার। স্বামীকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়ার দাবি জানান তিনি।

এদিকে এসব অভিযোগ অকপটে অস্বীকার করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (বর্তমানে অব্যাহতিপ্রাপ্ত) এসআই শামীম।

তিনি বলেন, নির্যাতন করার অভিযোগ মিথ্যা। তাকে যদি মারধর ও নির্যাতন করা হতো তাহলে তো তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বলতে পারতেন। ম্যাজিস্ট্রেট স্বীকারোক্তি নেয়ার আগেও তাকে এসব বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছেন। সেখানে তো খলিল এসব অভিযোগের কথা বলতে পারতেন।

তবে কেন জেলা পুলিশের তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে এসআই শামীমকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং জিসা মনি মৃত হলে কীভাবে ফিরে এলো- এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে ব্যর্থ হন এসআই শামীম আল মামুন।

উল্লেখ্য, গত ৪ জুলাই ১৫ বছর বয়সী কিশোরী জিসা শহরের দেওভোগের মা-বাবার বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় জিডি ও মামলা করে তার পরিবার। ওই মামলায় পুলিশ আব্দুল্লাহ, রকিব ও নৌকার মাঝি খলিলুর রহমানকে গ্রেফতার করে।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ৯ অগাস্ট তারা আদালতে জবানবন্দিতে ‘অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দেয়ার’ দায় স্বীকার করেন। এ ঘটনার ১৪ দিন পর গত ২৩ আগস্ট ওই কিশোরী জীবিত ফিরে আসে এবং সে জানায় যে- ইকবাল নামের এক যুবককে বিয়ে করে বন্দর এলাকায় ভাড়া বাড়িতে সংসার করছিল।

এরপরই পুলিশের রিমান্ড ও তদন্ত নিয়ে মিথ্যাচার সামনে আসে; যা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। বুধবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আনিসুর রহমান তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন।

গত ১ সেপ্টেম্বর জামিন শুনানির পর আসামি খলিলুর রহমান খলিলকে জামিন আবেদন করেন। পরে শুনানি শেষে গত বুধবার তারিখ ধার্য করেছিলেন আদালত।