বিদেশি মদদে সন্ত্রাসে জড়াচ্ছে রোহিঙ্গারা: ডিডব্লিউ

প্রকাশিত: ১:৫৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২০ | আপডেট: ১:৫৬:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২০

লন্ডন টাইমস নিউজ।বাংলাদেশের শান্তি বিঘ্নিত করতে রোহিঙ্গাদেরই হাতিয়ার করছে পাকিস্তান। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা মাদক পাচারের পাশাপাশি জঙ্গি কার্যকলাপেও যুক্ত হয়ে পড়েছে।

ফলে নতুন করে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বাংলাদেশে।

পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের হয়ে জেএমবি বা জামাত-উল-মুজাহিদিন রোহিঙ্গাদের জঙ্গি প্রশিক্ষণে মদদ দিচ্ছে। পাক-মদদপুষ্ট জেএমবির কারণেই বাংলাদেশেও আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি বা আরসার বাড়বাড়ন্ত লক্ষ্য করা যায়। সবমিলিয়ে বাড়ছে জঙ্গি তৎপরতা।

জার্মানির সংবাদ সংস্থা ডয়েচে ভেলের (ডিডব্লিউ) প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় জেএমবির যোগসাজসের বিষয়টি আগেই উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ৯৯ জন হিন্দু মহিলা, পুরুষ এবং শিশুকে গণহত্যা করে আরসা। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসেও হিন্দু গ্রামবাসীর ওপর আরসার হামলার ফলে হিন্দু এবং অন্যান্য জাতিগত সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

ডিডব্লিউ বলছে, কক্সবাজার এলাকায় শুধু মাদক চোরাকারবার বা অন্যান্য অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই রোহিঙ্গারা। বিদেশি মদদে তারা এখন সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের সঙ্গেও যুক্ত।  রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরেই জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবিরের বিষয়টি উল্লেখ করা হয় তাদের প্রতিবেদনে। জানুয়ারি মাসেই জনা চল্লিশেক রোহিঙ্গাকে শরণার্থী শিবিরের মধ্যেই জঙ্গি প্রশিক্ষণ দেয় জেএমবি।

২০১৬ সালে হলি আর্টিজেন রেস্টুরেন্টে আত্মঘাতী হামলার মধ্যে দিয়ে জেএমবি গোটা দুনিয়ার নজরে আসে। জার্মান সংবাদ সংস্থার খবর, মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ও মালেশিয়া থেকে ১১৭ হাজার ডলার অনুদান পেয়েছিল জেএমবি। সেই অর্থেই ৪০ জন রোহিঙ্গাকে জঙ্গি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আর পুরোটাই হয় পাক-গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের নজরদারিতে। পুরো বিষয়টি নজরে আসতেই ভারতের তরফে বাংলাদেশকে সতর্কও করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রুসেলসে সাউথ এশিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোরামের বিশ্লেষক এস ও ওল্ফ জঙ্গি প্রশিক্ষণে আইএসআইয়ের জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ওল্ফের মতে, আইএসআইয়ের লক্ষ্যই হলো আফগানিস্তান আর ভারতকে অস্থির করে তোলা। আর তারা সেই কাজের জন্য এখন বাংলাদেশের মাটিতে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করছে।

কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চালানো পাকিস্তানের পক্ষে এখন আর সহজ হচ্ছে না। তাই বাংলাদেশের মাটিকে ব্যবহার করে ভারতে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালাতে চায় পাকিস্তান। আর সেই লক্ষ্যেই ব্যবহৃত হচ্ছেন রোহিঙ্গারা। বিঘ্নিত হচ্ছে বাংলাদেশের শান্তি। পাকিস্তান মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছে। তাই মুসলিম ধর্মীয় আবেগকেও কাজে লাগানো হচ্ছে নাশকতার কাজে।

প্রাক্তন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুর রশিদ ডিডব্লিউয়ের কাছে স্বীকার করেছিলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে সন্ত্রাসের বীজ বপনের চেষ্টা বহুদিন ধরেই চলছে। তবে অতীতে বাংলাদেশ এধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে সক্ষমও হয়েছে। সন্ত্রাস দমনে ভারত ও বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করছে। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু এখনও রাজাকার বা পাকিস্তানপন্থীরা নির্মূল হয়নি। বাংলাদেশের উন্নয়নে ঈর্ষান্বিত হয়ে তারাও নাশকতাকে মদদ দিয়ে চলেছে।

আবদুর রশিদও স্বীকার করেন ভারতকে অস্থির করার চক্রান্ত করে চলেছে পাকিস্তান। তবে এই কাজে বাংলাদেশ কখনও পাকিস্তানকে সাহায্য করবে না।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমও জার্মান সংস্থাকে বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের শিবিরে সন্ত্রাস ছড়ানোর কৌশল অতীতেও বাংলাদেশ সরকার বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছিল। সেইসঙ্গে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের কথা বারবার উল্লেখ করেছেন তিনি।

তবু আরসার কার্যকলাপ বেড়ে চলেছে। মিয়ানমারের সেনা কর্মকর্তারা এটা বারবার বলছেন। বাংলাদেশি নিরাপত্তা রক্ষীদের কারণে দিনের বেলায় তাদের কার্যকলাপ সীমিত থাকলেও রাত নামতেই শুরু হয় কার্যকলাপ। সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা তারই প্রমাণ। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জৌ মিন টুন জানিয়েছেন, এপ্রিল মাস থেকে আরসার সামরিক কার্যকলাপ আরও বেড়ে গেছে।

মে মাসে আরসার হামলায় মিয়ানমারের সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তারাও জখম হন। সীমান্তবর্তী গ্রামে জুন মাসে আধ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। মিয়ানমারের গোয়েন্দারাও জানতে পেরেছেন, কক্সবাজারে আরসা বেশ সক্রিয়। পরিস্থিতির ফায়দা নিতে ময়দানে অবতীর্ণ পাকিস্তান।

রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বিভিন্ন টেররিস্ট গ্রুপের সম্পর্কের কথা বিবিসির প্রতিবেদনে বারবার তুলে ধরা হয়েছে। পাকিস্তান পরিস্থিতির সুবিধা নিয়ে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করছে।

বাংলাদেশ পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট সম্প্র্রতি নব্য জেএমবির ‘এফজেড ফোর্স’ নামে যে স্লিপার সেলের সন্ধান পেয়েছে, এই  গ্রুপের প্রায় সব সদস্যেরই বয়স কম। স্কুল পড়ুয়াদের অনলাইনের মাধ্যমে জঙ্গি কার্যকলাপে সামিল করা হচ্ছে। সম্প্রতি ‘এফজেড ফোর্সের’ দুই সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এই তথ্য উঠে এসেছে। কিশোরদের জঙ্গি কার্যকলাপে যুক্ত করার তেমন একটা অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ছিলো না। ২০১৬ সালে নব্য জেএমবির অন্যতম সমন্বয়ক তানভীর কাদেরী তার কিশোর দুই ছেলেকেও জঙ্গিবাদে জড়িয়েছিল। এক ছেলে পুলিশি অভিযানে মারা গেলেও অপর জনকে গ্রেপ্তারে সক্ষম হন নিরাপত্তা রক্ষীরা। সেই ঘটনার চার বছর পর ফের কিশোরদের জঙ্গিবাদে জড়ানোর ঘটনা সামনে এলো। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপ-কমিশনার সাইফুল ইসলাম জানান, নব্য জেএমবির কথিত ‘এফজেড ফোর্স’ স্লিপার সেলের সবার বয়সই কম।

পুলিশ জানতে পেরেছে, অনলাইনে যুদ্ধ যুদ্ধ ফাঁদ পেতে কিশোরদের আকৃষ্ট করা হয়। বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমকে ব্যবহার করা হয় শিশুদের মগজ ধোলাইয়ের জন্য। খেলার ছলে তাদের উত্তেজিত করে বিভিন্ন ধর্মীয় পোস্ট প্রচার করে তাদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে উগ্রবাদে। অনলাইনের ফ্যান্টাসি তাদের টেনে নিয়ে যায় অন্ধকার জগতে। পাকিস্তানিদের মদদে একটা বড় ধরনের চক্র কাজ করছে কিশোর মনকে ভুল পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

১৬ আগস্ট ঢাকার সদরঘাট থেকে গ্রেপ্তার হয় সদ্য কৈশোর পার হওয়া দুই যুবক। সাফফাত ইসলাম ওরফে আবদুল্লাহ ওরফে উইলিয়াম ওরফে আল আরসালান ওরফে মেহেমেদ চাগরি বেগ (১৮) ও ইয়াসির আরাফাত ওরফে শান্ত (২০)। সাফফাত ও ইয়াসিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, দু’জনই অনলাইনের মাধ্যমে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে।

সিলেটে সম্প্রতি ৫ নব্য জেএমবি গ্রেপ্তারের ঘটনাও প্রমাণ করে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের নামে শিক্ষার্থীদের মনে সন্ত্রাসবাদের সর্বনাশা নেশা ঢুকিয়ে দেওয়ার পাঠ চলছে। সম্প্রতি পল্টনে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় সিলেট থেকে গ্রেফতার জেএমবি সদস্য শেখ সুলতান মোহাম্মদ নাইমুজ্জামান দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবে। সেই স্বপ্ন নিয়েই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় সে।

২২ জুলাই ঢাকায় নাসিমুল ইশান চৌধুরী ওরফে নাসিম ইশান গ্রেপ্তার হয়। ২৫ বছর বয়সী এই যুবকের বাড়ি বরিশাল। তিনিও নব্য জেএমবির সক্রিয় সদস্য।

গ্রামের গরীব মানুষদের বদলে শহরের কিশোর মনকেই বেশি আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু নব্য জেএমবির বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশি নিরাপত্তা বাহিনীর দক্ষতা। সরকারও জিরো টলারেন্সের নীতি অটল। এই অবস্থায় পাকিস্তানি মদদে বাংলাদেশকে অস্থির করে তুলতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাজে লাগানো হচ্ছে। নব্য জেএমবির ইসলামিক রাষ্ট্র বানানোর স্বপ্ন ফেরি করতে বাংলাদেশের কিশোর ও তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। লকডাউনের সুবিধা নিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিদেশ থেকে মদদ দেওয়া হচ্ছে আইএস জঙ্গিদের দেশীয় এজেন্টদের। পাশাপাশি রাতের অন্ধকারে রোহিঙ্গা শিবিরে চলছে অস্ত্র প্রশিক্ষণ। ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশকেও অস্থির করে তোলার এই চক্রান্তে চীন বা অন্যান্য দেশ নীরব দর্শক। বরং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে জঙ্গি প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত অস্ত্রের বেশির ভাগই মেড-ইন-চায়না।