১ কোটি মানুষের জন্যে একটি ল্যাব

প্রকাশিত: ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২০ | আপডেট: ১১:৩৭:পূর্বাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২০
সুশান্ত ঘোষ।বরিশাল বিভাগে বাড়ছে কোভিড-১৯ পরীক্ষার চাহিদা। আর সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শের-ই-বাংলা‌ মে‌ডিকেল কলেজে (শেবাচিম) স্থাপিত বরিশাল বিভাগের একমাত্র আরটি-পিসিআর ল্যাবে বাড়ছে ব্যস্ততা। তারা হিমশিম খাচ্ছে চাপ সামলাতে।

গত ফেব্রুয়ারিতে উদ্বোধন করা এই ল্যাবটিতে কোনো ভাইরোলজিস্ট নেই। কেবলমাত্র একটি আরটি-পিসিআর মেশিন এবং ১১ জন টেকনোলজিস্ট নিয়ে চলছে ল্যাবের কার্যক্রম। বরিশাল বিভাগ থেকে সংগ্রহ করা প্রায় অর্ধেক নমুনাই কেবল পরীক্ষা করা যাচ্ছে এই ল্যাবে।

ল্যাবের ইনচার্জ ও শেবাচিমের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. একেএম আকবর কবির জানান, আরটি-পিসিআর মেশিনে প্রতি শিফটে ৯৪টি নমুনা পরীক্ষা করা যায়।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমরা তিন শিফটে প্রতিদিন ২৩৪টি নমুনা পরীক্ষা করতে পারছি। এ পর্যন্ত আমরা মোট ১০ হাজার ৫০০টি নমুনা পরীক্ষা করেছি।’

‘প্রতিদিন পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের টেকনোলজিস্টরা দিন-রাত কাজ করছেন। তারা কোয়ারেন্টিনেও থাকতে পারছেন না। আমাদের ভাইরোলজিস্টসহ আরও প্রশিক্ষিত টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন’, বলেন তিনি।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অফিসের পরিচালক ডা. বাসুদেব কুমার দাস বলেন, ‘বিভাগের ১০২টি টেকনোলজিস্ট পদের মধ্যে মাত্র ৪৪টি পূরণ হয়েছে। যার ফলে সংকট রয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন পুরো বিভাগ থেকে প্রায় ৪০০টি নমুনা সংগ্রহ করছি। এর মধ্যে ২০০টি পাঠিয়ে দিচ্ছি ঢাকায় এবং বাকিগুলো বরিশালের পিসিআর ল্যাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।’

‘পিসিআর ল্যাবটির সক্ষমতার চেয়ে পরীক্ষার চাহিদা বেড়েছে এবং চাপ তৈরি হয়েছে’, যোগ করেন ডা. বাসুদেব।

শিগগির বিভাগের ভোলা জেলায় আরও একটি পিসিআর ল্যাব চালু করা হবে। এতে করে করোনা পরীক্ষার সংকট সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, ছয়টি জেলার সমন্বয়ে গঠিত বরিশাল বিভাগে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নমুনা সংগ্রহ করছে না। বেশ কয়েকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নমুনা সংগ্রহকারীর অভাবে নমুনা সংগ্রহ করতে পারেনি।

গত সপ্তাহে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার এক বাসিন্দাকে শেবাচিমে নমুনা দিতে এসে বরিশাল শহরের একটি হোটেলে চার দিন থাকতে হয়েছিল।

মেহেন্দিগঞ্জে নমুনা দিতে না পারা ৩৬ বছর বয়সী এই ব্যক্তি বলেন, ‘লঞ্চে করে মেহেন্দিগঞ্জ থেকে আসা-যাওয়ায় ছয় ঘণ্টা সময় লাগে। প্রতিদিন সেখানে গিয়ে তিন ঘণ্টা লাইনে দাড়িয়ে থাকা সম্ভব না। তাই আমি একটি হোটেলে উঠেছিলাম।’

বরিশাল শহরের কাওনিয়া এলাকার বাসিন্দা ৪৮ বছর বয়সী একজন সরকারি কর্মচারী তিন দিন চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে পরীক্ষা করানোর আশা ছেড়ে দিয়েছেন। এখন ঘরে বসে টেলিমেডিসিন সেবা ব্যবহার করে করোনাভাইরাসের লক্ষণের চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই সরকারি কর্মচারী।

গত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শেবাচিমের করোনাভাইরাস ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য নমুনা দিতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন অন্তত ২৫ জন।

অথচ এক সপ্তাহ আগেও শেবাচিমে সকাল ৯টা থেকে দুপুর পর্যন্ত বাইরের রোগীদের কাছ থেকে প্রায় ৫০টি নমুনা সংগ্রহ করতে পারত।

শেবাচিমের করোনাভাইরাস ইউনিটের ইনচার্জ ডা. মনিরুজ্জামান শাহিন জানিয়েছেন, এখন বাইরের রোগীদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ প্রায় ২৫ এ নেমেছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথমে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করি। তারপরে শেবাচিমের স্বাস্থ্যকর্মীদের নমুনা নেই এবং সবশেষে বাইরের রোগীদের।’

গত এক সপ্তাহে শেবাচিমে ভর্তি হওয়া গড় রোগীর সংখ্যা ৩০ থেকে বেড়ে ১০০ জনেরও বেশি হয়ে গেছে। তাই তারা বাইরের রোগীদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা কমিয়ে দিয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. দেলোয়ার হোসেন জানান, গত সপ্তাহে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অফিস তাদের করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য প্রতিদিন ২০ থেকে ২২টির বেশি নমুনা না পাঠানোর নির্দেশনা দিয়েছে।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মতিউর রহমান বলেন, ‘বরিশাল সিটি করপোরেশন এক মাস বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করার পর এখন নমুনা সংগ্রহ বন্ধ রেখেছে। কারণ, তাদের দুই জন নমুনা সংগ্রহকারীর কোভিড-১৯ পজিটিভ।’

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) বরিশাল শাখার সদস্যসচিব ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, ‘বরিশাল বিভাগের এক কোটি মানুষের জন্য মাত্র একটি পিসিআর ল্যাব আছে। তাই মানুষ সময় মতো পরীক্ষার রিপোর্ট পাচ্ছে না। স্বাস্থ্যসেবার জন্য যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই।’

বাম দলটির অভিযোগ, পরীক্ষার কিটের সংকট রয়েছে। তবে, এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আরটি-পিসিআর ল্যাবের ইনচার্জ।

বরিশালে করোনা পরীক্ষার ফলাফল পেতে দুই থেকে ১২ দিন সময় লাগে। কতটা সময় লাগবে তা নির্ভর করে নমুনা কোন হাসপাতালে দেওয়া হয়েছে তার ওপর। শহরের সরকারি হাসপাতালে দিলে সময় লাগে কম আর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে নমুনা দিলে তার ফলাফল পেতে দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হয়।