স্কুলছাত্রী হত্যা-সাভারের মূর্তিমান আতঙ্ক মিজান ও তার সহযোগীরা

প্রকাশিত: ৬:০৭ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০ | আপডেট: ৬:১৮:পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০

তুহিন খান।সাভারে প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় স্কুলছাত্রী নীলা রায়কে মাদক আস্তানায় নিয়ে নির্যাতন ও হত্যার মূলনায়ক মিজান এবং তার সহযোগীরা ছিল এলাকার ভয়ংকর সন্ত্রাসী ও এলাকার মূর্তিমান আতঙ্ক।

পৌর এলাকার পালপাড়া, দক্ষিণপাড়া, ব্যাংক কলোনি, গার্লস স্কুল রোড, জেলেপাড়া ও কাজী মোকমাপাড়া মহল্লা ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। একের পর এক ভয়ংকর অপরাধ করলেও এলাকাবাসী প্রাণভয়ে ছিল নিশ্চুপ। আবার এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও কোনো ফল পাওয়া যেত না। ঘাতক গ্রুপের অনেকের পরিবারের সদস্যরা ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী হওয়ার সুবাদে পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে ছিল দহরম-মহরম সম্পর্ক।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ঘাতক মিজান ছিল ভয়ংকর কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। এলাকার শাকিল ও সাকিব সহোদর ছিল এ গ্যাংয়ের দলনেতা। ৩০ থেকে ৪০ জন উঠতি বয়সের কিশোর নিয়ে গ্যাংটি গঠিত। পুরো ব্যাংক কলোনি মহল্লার মাদকের স্পটগুলো নিয়ন্ত্রণ করে এই শাকিল ও সাকিব বাহিনী।

তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করে সাগর, সুজব, পারভেজ, হানিফ, জয়, রাব্বি, যাবেরসহ অনেকে। এলাকার চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও নারী উক্ত্যক্তসহ এমন কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ছিল না যা এই গ্যাংয়ের সদস্যরা করত না।

ইতিপূর্বে ঐ এলাকার এক সংগীত শিক্ষককে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা মামলার আসামি ছিল শাকিল। সে একাধিকবার গ্রেফতার হয়ে জেলও খেটেছে। কিন্তু জামিনে বেরিয়ে এসেই পুনরায় পুরোদমে শুরু করে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা।

এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, গোটা এলাকা নিস্তব্ধ। এ ঘটনার পরও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন এলাকাবাসী। একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ গ্রুপটি চুরি-ডাকাতি, মাদক ব্যবসা করেই ক্ষান্ত থাকেনি, মাসে মাসে বিভিন্ন বাড়িতে চাঁদাবাজি করত। চাঁদার পরিমাণ নির্ধারিত হতো কার বাড়িতে কয়টি ফ্ল্যাট ভাড়া হয়েছে তার ওপর। তাদের চাহিদা মোতাবেক চাঁদা না দিলে ভাড়াটিয়াদের উক্ত্যক্তসহ বিভিন্নভাবে নাজেহাল করে তাড়িয়ে দেওয়া হতো। ফলে অনেক বাড়ির মালিক বাড়ি ভাড়ার স্বার্থে মুখ বুঝে তাদের চাহিদা মেটাত।

অভিযোগ রয়েছে, এ বাহিনী এতটাই প্রতাপশালী যে প্রকাশ্যে কাউকে লাঞ্ছিত কিংবা অপমান করলেও কেউ এগিয়ে এসে প্রতিবাদ করার সাহস পেত না। এমনকি রাস্তা দিয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে মেয়েরা হেঁটে যেতেও নিরাপদ বোধ করত না। অভিভাবকদের সামনেই উত্ত্যক্ত করা হতো তাদের।

এছাড়া মিজানুর ও তার গ্যাংয়ের সদস্যরা বিভিন্ন দোকান থেকে পণ্য কিনে টাকা দিত না। গত তিন মাস আগে ঐ এলাকায় এক ব্যবসায়ীর দোকান ভাঙচুর ও তাকে মারধর করে তারা। তাদের ভয়ে জিম্মি ব্যবসায়ীরা। এসব বিষয়ে এলাকাবাসী পৌর মেয়র ও পুলিশ প্রশাসনকে জানালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সাভার থানার পার্শ্ববর্তী এলাকা হলেও পুলিশ অনেক ক্ষেত্রে তাদের এই অপকর্ম জেনেও না জানার ভান করত। এলাকার একাধিক অভিভাবক বলেন, এদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ ও অপকর্ম পুলিশ প্রশাসন অবগত থাকলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

তারা বলেন, পরিত্যক্ত ঐ বাড়িতে প্রতিদিন মাদকের যে আড্ডা বসতো তা কারোরই অজানা ছিল না। তাই পুলিশ যদি শুরুতেই কার্যকর ব্যবস্থা নিত তাহলে নিষ্পাপ স্কুলছাত্রীকে এভাবে প্রাণ দিতে হতো না। পুলিশের কতিপয় অসাধু সদস্যের সঙ্গে বখাটেদের সুসম্পর্ক রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে নীলা রায়কে তুলে নিয়ে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে হত্যা করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য মিজান ও তার সহযোগীরা। এ ঘটনায় নিলার পিতা নারায়ণ রায় বাদী হয়ে হত্যাকারী মিজানুর রহমান, তার পিতা আব্দুর রহমান ও মা আয়েশা সিদ্দিকা নাজমুন নাহারের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো চার জনের বিরুদ্ধে সাভার মডেল থানায় একটি মামলা করেন।

কিন্তু পুলিশ গত চার দিনেও তাদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তবে মিজানুর রহমানের এক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংগঠনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

তবে বিষয়টিকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে পুলিশের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তে নেমেছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। ইতিমধ্যেই সিআইডি পুলিশের একটি দল হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে।

ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মো. সাইদুর রহমান বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান চলছে। যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।