ঢাঃবিঃএমফিল-পিএইচডি প্রবন্ধ: গবেষণায় তথ্য-উপাত্ত চুরি অপ্রতিরোধ্য

প্রকাশিত: ৯:৪৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০ | আপডেট: ১১:১৯:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০

মুসতাক আহমদ ।বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘গবেষণা চুরি’র (প্লাজিয়ারিজম) ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনায়াসে এমফিল-পিএইচডি পর্যায়ে গবেষক ভর্তি করা হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিয়মনীতি না মেনে তারা গবেষণা করার সুযোগ পাচ্ছেন। ডিগ্রিও বগলদাবা করছেন একটা পর্যায়ে। কিন্তু এ ধরনের গবেষণাপত্রের মান যথাযথভাবে যাচাই করা হয় না। এছাড়া পদোন্নতির জন্য গবেষণার তালিকা দীর্ঘ করার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শ্রেণির শিক্ষকও যেনতেনভাবে লিখছেন প্রবন্ধ। অন্যের গবেষণা থেকে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে নিজের প্রবন্ধে জুড়ে দেন এমনও অনেক শিক্ষক ও গবেষক আছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত প্রতিটি গবেষণাকর্ম পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা নেই। বিচারের ব্যবস্থা না থাকাসহ কঠোর পদ্ধতির অভাবে গবেষণা চুরির ঘটনা ঘটছে। এ ধরনের চুরির ঘটনা ধরার দায়িত্ব মূলত তত্ত্বাবধায়কসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের। কিন্তু প্রশাসনিকভাবে এদিকে নজর খুব একটা নেই। আবার ধরা পড়লেও রাজনৈতিক কারণে পার পেয়ে যান অনেকে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষকের গবেষণায় চুরির ঘটনাটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে অভিযোগের পর প্রদীপের আলোতে এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল  বলেন, জ্ঞানের রাজ্যে চুরির নামই হচ্ছে ‘প্লাজিয়ারিজম’। এ চুরি হচ্ছে আরেকজনের লেখা, বিশ্লেষণ ও চিন্তা নিজের বলে চালিয়ে দেয়া। এটা সাধারণত তিন ভাবে হয়ে থাকে। এগুলো হচ্ছে- সরাসরি চুরি, পরোক্ষ বা মোজাইক চুরি এবং অনিচ্ছাকৃত বা দুর্ঘটনাবশত ঘটনা। তদারকি, সদিচ্ছা ও জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে প্লেজিয়ারিজমের ঘটনা ধরা পড়ছে না। আর শাস্তির ব্যবস্থা না থাকায় এটা বেড়েই চলেছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা থাকলে এ ধরনের প্রবণতা কমে যেত।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আরেকজনের গবেষণা থেকে তথ্য-উপাত্ত নেয়ার নিয়ম আছে। গবেষণায় একনাগাড়ে সর্বোচ্চ ২৫ শব্দ বা ৪-৫ বাক্য ব্যবহার করা যায়। এজন্য তথ্যসূত্র উল্লেখ করতে হয়। অন্যদিকে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় সবকিছুই হাতের নাগালে থাকায় গবেষকরা খুব সহজেই ইন্টারনেট থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে তা নেই। ফলে নিয়ম জানা না থাকা কিংবা নীতিমালার অভাবে ভার্চুয়াল জগত থেকে নেয়া বিষয়গুলো গবেষণা চুরির মধ্যে পড়ে। প্লেজিয়ারিজম ডিগ্রি বাতিলের পাশাপাশি চাকরি চলে যাওয়ার মতো অপরাধ। এমন ঘটনায় কয়েক বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক নূরউদ্দীন আলোর পিএইচডি ডিগ্রি বাতিল ও চাকরিচ্যুত করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত কয়েক বছরে অন্তত ৫টি প্লেজিয়ারিজমের ঘটনা ধরা পড়েছে। প্রত্যেকটি ঘটনায় অবশ্য পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা আরেকজনের লেখা নিজের নামে চালিয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ আলোচিত হচ্ছে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের একজন প্রভাষকের ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্র্র্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো প্রেস এ অভিযোগ করার পর কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে নেয়। ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবুল কালাম লুৎফুল কবীরের পিএইচডি গবেষণার ৯৮ শতাংশ হুবহু নকল বলে অভিযোগ ওঠেছে। সুইডেনের গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোনাস নিলসন এক চিঠিতে এ অভিযোগ আনেন। এছাড়া ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষক রুহুল আমিন, নুসরাত জাহান এবং বদরুজ্জামান ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে।

এ প্রসঙ্গে ভিসি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান বলেন, প্লেজিয়ারিজম নিয়ে দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নীতিমালা নেই। আমাদের একটি কমিটি এ নিয়ে কাজ করছে। ১০-১৫ দিনের মধ্যে তাদের রিপোর্ট আমরা হাতে পাব। তাতে কোনোটাকে প্লেজিয়ারিজম বলা হবে এবং এ অপরাধের শাস্তির দিকটিও থাকছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গবেষণায় মান নিয়ন্ত্রণ আর তদারকির ব্যবস্থা না থাকায় গত প্রায় এক দশকে সচিবসহ শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে পিএইচডি ডিগ্রি করার প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। মানসম্মত গবেষণার জন্য ছুটি নেয়ার প্রয়োজন থাকলেও অনেকেই তা নেন না। এসব কর্মকর্তার মধ্যে বেশিরভাগেরই ডিগ্রি রাজধানী ও ঢাকা শহরের আশপাশের বিশ্ববিদ্যালয়ের। বিশেষ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকই বেশির ভাগ গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক বলে জানিয়েছেন ইউজিসির এক শীর্ষ কর্মকর্তা। ইউজিসির ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সরকারের একজন সচিবের পিএইচডি গবেষণার বিষয় হচ্ছে দেশের দুই উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির ভূমিকা সংক্রান্ত। এ ধরনের পরিসর নিয়ে বিষয়টি গবেষণাযোগ্য কিনা তা নিয়েই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মধ্যে নিজ প্রতিষ্ঠান ও বিভাগে এমফিল-পিএইচডি ডিগ্রি করার প্রবণতাও দিন দিন বাড়ছে। মূলত এ ধরনের গবেষণা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) অধ্যাপক ফরিদউদ্দিন আহমেদ বলেন, গবেষণায় চুরির ঘটনা ধরতে বর্তমানে উন্নতমানের সফটওয়্যার আছে। এছাড়া সার্চ ইঞ্জিন গুগলে কয়েকটি বাক্য লিখে খুঁজলেও চুরির ঘটনা চিহ্নিত করা যায়। তাই গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক চাইলে সহজেই প্লেজিয়ারিজম ধরতে পারেন। তবে অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, এজন্য সফটওয়্যারের প্রয়োজন পড়ে না। প্রবন্ধ বা থিসিস পড়লেই বিষয়টি ধরা সম্ভব।

গবেষণা জগতে চুরি ধরার জন্য বহুল ব্যবহৃত সফটওয়্যারের নাম ‘টার্নিটইন’। কিছুদিন আগে এটির ব্যাপক ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে শাবিপ্রবি। প্রতিষ্ঠানটি লাইব্রেরিসহ সব শিক্ষক, বিভাগের প্রধান ও ডিনকে এর আইডি ও পাসওয়ার্ড দিয়েছে। এছাড়া নীতিমালা তৈরি করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি এবং বিভিন্ন ডিনের দফতরে প্লেজিয়ারিজম ধরার সফটও্যয়ার আছে। যে কোনো থিসিস দুই স্থান থেকে যাচাইয়ের পর অনুমোদনের নিয়ম করা হয়েছে বলে জানান ভিসি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান।

দেশে বর্তমানে শুধু ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এমফিল ও পিএইচডি পর্যায়ে গবেষক ভর্তির অনুমতি আছে। কিন্তু উল্লিখিত দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাদে আর কোথাও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘চুরি’ ধরার ব্যবস্থা নেই। আর নীতিমালা নেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে। টার্নিটানে শুধু ইংরেজি লেখাগুলো পরীক্ষা করা যায়। ফলে যারা বাংলা থিসিস লেখেন তাদের থিসিস নিরীক্ষা সম্ভব হয় না। এ সংক্রান্ত বাংলা সফটওয়্যার এখনও তৈরি হয়নি।

এ প্রসঙ্গে উচ্চশিক্ষার অ্যাপেক্সবডি খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ এ প্রসঙ্গে  বলেন, গবেষণায় প্লাজিয়ারিজম(সিমিলারিটি)

Plagiarism is presenting someone else’s work or ideas as your own, with or without their consent, by incorporating it into your work without full acknowledgement. All published and unpublished material, whether in manuscript, printed or electronic form, is covered under this definition.

ধরার লক্ষ্যে এ ধরনের সফটওয়্যার স্থাপনের কথা ভাবছে ইউজিসি। তবে তা শুধু ইউজিসিতে থাকবে না সব বিশ্ববিদ্যালয়েই দেয়া হবে তা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি।