খাগড়াছড়ির নারী ধর্ষণের ক্ষত না শুকাতেই কলঙ্কিত এম সি কলেজ-গণধর্ষণে নাম এল যাদের

প্রকাশিত: ৮:১৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০ | আপডেট: ১১:০০:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০

লন্ডন টাইমস নিউজ। মাত্র কিছুদিন আগে খাগড়াছড়িতে ঘরের মধ্যে ঢুকে তরুণীকে জোর করে ধর্ষণ ও বাড়ির জিনিষ পত্র ডাকাতি করে। সেই ধর্ষণের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশ। ওসি জানালেন তারা অভিযান অব্যাহত রেখেছেন ধর্ষকদের গ্রেপ্তারে।এরই মধ্যে ঘটল সিলেটে আরো এক ন্যাক্কারজনক ঘটনা।

টিলার পাদদেশেই নির্মাণ করা হয়েছে চার তলা ভবন। সন্ধ্যা নামলেই নির্জন হয়ে পড়ে ওই হোস্টেল এলাকা। আলো নেই আশেপাশেও। ফলে অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে এলাকা। আর এই হোস্টেলের সামনেই এমসি কলেজে কলঙ্কময় ইতিহাস রচিত হলো। এমন ঘটনা কখনোই এমসি কলেজে ঘটেনি। পাহাড়, টিলার আবরণে বেষ্টিত এমসির ক্যাম্পাস। সেই বৃটিশ আমলের কলেজ। অনেক স্মৃতি এই কলেজের। এ কারণে বিকাল হলেই ক্যাম্পাসে ঘুরতে যান অনেকেই। এর মধ্যে বেশিরভাগই যান প্রাক্তন শিক্ষার্থী। ক্যাম্পাসে ঘুরে স্মৃতি রোমন্থন করেন তারা। ওই স্বামী-স্ত্রীও ক্যাম্পাস দেখতে গিয়েছিল। ফেরার পথে ধর্ষণের শিকার হন গৃহবধূ। মার্চ থেকেই বন্ধ এমসি কলেজ। সব হোস্টেলই বন্ধ। এরপরও সরব ছিল এমসির ছাত্রাবাস। এই সরবের পেছনের কারণও ভিন্ন। ছাত্রাবাস বন্ধ করা হলেও ছাত্রলীগ হোস্টেল ছাড়েনি। ছাত্রাবাসের নিয়ন্ত্রক ছিল ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর ও রনি। দুই জনই ছাত্রলীগের টিলাগড়ের রঞ্জিত গ্রুপের কর্মী। রঞ্জিত সরকারের বলয়ের হওয়ার কারণে তারা হোস্টেলে ছিল বেপরোয়া। কলেজ কর্তৃপক্ষ হোস্টেল বন্ধ করলেও তারা হোস্টেলের বিভিন্ন রুম দখল করে রেখেছে। বসবাস করতো হোস্টেলে। খাওয়া-দাওয়া সব করতো ওখানেই। তাদের ভয়ে কেউ কোনো কথা বলতো না। ছাত্রাবাসের দারোয়ানরা তাদের ভয়ে থাকতো তটস্থ। ঘটনার পর থেকে তারা আরো ভড়কে গেছে।

গণধর্ষণে নাম এল যাদের

সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের ঘটনায় নয়জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাঁরা ‘ছাত্রলীগের কর্মী’ হিসেবে পরিচিত।  
নাম উল্লেখ করা ছয় আসামি হলেন সাইফুর রহমান (২৮), তারেকুল ইসলাম (২৮), শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি (২৫), অর্জুন লঙ্কর (২৫), রবিউল ইসলাম (২৫) ও মাহফুজুর রহমান ওরফে মাসুম (২৫)। তাদের মধ্যে তারেক ও রবিউল বহিরাগত। বাকিরা এমসি কলেজের সাবেক ছাত্র। নাম উল্লেখ করা ছয়জনের সঙ্গে তিনজন সহযোগী ছিলেন উল্লেখ করে তাদের অজ্ঞাত বলা হয়েছে।শাহপরান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাইয়ূম চৌধুরী ছয়জনের নাম উল্লেখসহ নয়জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের শিকার তরুণীর (২০) স্বামী বাদী হয়ে মামলা করেছেন বলে জানিয়েছেন।
মামলার এজাহারে সাইফুর রহমানের বাড়ি সিলেটের বালাগঞ্জে ও বর্তমান ঠিকানা এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়কের বাংলো উল্লেখ করা। শাহ মাহবুবুর রহমানের বাড়ি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বাগুনিপাড়া ও বর্তমান ঠিকানা ছাত্রাবাসের ৭ নম্বর ব্লকের ২০৫ নম্বর কক্ষ, মাহফুজুর রহমানের বাড়ি কানাইঘাটের গাছবাড়ি গ্রামে, রবিউলের বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় জগদল গ্রামে, অর্জুনের বাড়ি জকিগঞ্জের আটগ্রাম এবং তারেকের বাড়ি সুনামগঞ্জ শহরের নিসর্গ আবাসিক এলাকায় (হাসননগর)।

 

একজন দারোয়ান জানালেন- ছাত্রাবাসে সাইফুর ও রনির আধিপত্য ছিল একতরফা। তারা সব অপকর্মের কেন্দ্রে পরিণত করেছিল হোস্টেলকে। সন্ধ্যা নামলেই চলে আসতো বহিরাগতরা। তারা সবাই গিয়ে একত্রিত হতো নতুন ভবনের ২০৫ নম্বর কক্ষে। কখনো কখনো তারা হোস্টেলের বাইরের নির্জন জায়গায় অবস্থান নিতো। মধ্যরাত পর্যন্ত চলতো তাদের আড্ডা-মস্তি। এসব সবাই দেখলেও কেউ কোনো কথা বলতো না। কথা বললেই করা হতো মারধর। এ কারণে নিরবে সব সহ্য করে চলছিল সবাই। সাইফুর, রনি ছাড়াও রবিউল, অর্জুন, তারেকুল, মাসুমও ছিল আড্ডার মধ্যমনি। মধ্যরাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে তারা হলের বিভিন্ন কক্ষেই ঘুমিয়ে পড়তো। বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে কয়েকজন শিক্ষার্থী লুকিয়ে হোস্টেলে অবস্থান করছিল। ঘটনার সময় তারাও ছিলেন নতুন বিল্ডিংয়ে। দোতলা ও তিনতলায় অবস্থান করছিল তারা। ওখান থেকে এক মহিলার চিৎকার শুনলেও কেউ বাইরে এসে প্রতিবাদ করার সাহস পাননি। এছাড়া হোস্টেলের সিড়িতেও তাদের লোক দাঁড়িয়ে ছিল।

গতকাল দুপুরে তারা  জানান- ঘটনার সময় তারা চিৎকার শুনেছেন। এক মহিলা ও এক পুরুষ সম্ভ্রম রক্ষার জন্য সাহায্য চেয়েছিল। কিন্তু প্রাণভয়ে তারা কেউ বের হননি। ঘটনার পরপর তারাও হোস্টেল ছেড়ে চলে যান। গতকাল দুপুরে এসে তাদের বইপত্র নিয়ে গেছেন। নতুন হোস্টেলটি চারতলা। এই চারতলার মধ্যে ৩ তলা পুরোটারই কাজ শেষ। এ কারণে ওখানে ছাত্রদের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়েছে। হোস্টেলের এক শিক্ষার্থী জানান- নতুন হোস্টেলে দুইতলা ও তিনতলায় ৯৬ জন শিক্ষার্থী বসবাস করেন। কলেজ বন্ধ হওয়ার পর সবাই বাড়িতে চলে গেছেন। বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য কয়েকজন ছিলেন। এর বাইরে ছাত্রলীগের রনি ও সাইফুরের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ সবসময় হোস্টেলে অবস্থান করতো। তারা হোস্টেলকে মাদকের আখড়ায় পরিণত করেছে।

রনির পুরো নাম শাহ মাহবুবুর রহমান রনি। সে এখন আর এমসি কলেজের ছাত্র না। মাস্টার্স পাস করেছে গত বছর। এরপরও সে এমসি কলেজের নতুন বিল্ডিংয়ের ২০৫ নম্বর কক্ষটি দখলে রেখেছে। তার কক্ষে বসেই মাদকের আসর বসাতো বহিরাগত ছাত্রলীগ কর্মীরা। করোনাকালে মহিলাদেরও যাতায়াত করতে দেখেছেন অন্য ছাত্ররা। কিন্তু কেউ কোনো প্রতিবাদ করেননি। রনির কক্ষে শনিবার ভোররাতে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। ওই কক্ষ থেকে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। পুরাতন ছাত্রাবাসের ৪ নম্বর ব্লকে একটি শিক্ষক বাংলো ছিল। ওই বাংলো এখন ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহমানের দখলে। সে শিক্ষক বাংলোতে বসবাস করতো। ছাত্রাবাসে সবাই তাকে ভয় পায়। ভয়ঙ্কর সাইফুর নামে চিনেন সবাই। বেপরোয়া জীবনযাপন তার। যখন যা ইচ্ছা তাই করে। শিক্ষক বাংলো দখলে রাখলেও শিক্ষকরা এর প্রতিবাদ করতেন না। সাইফুর ইয়াবাসহ নানা নেশায় আসক্ত বলে হোস্টেলে বসবাসরত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে। সাইফুর অনার্স পাস করেছে এমসি কলেজ থেকেই। শুক্রবার রাতে ধর্ষণের ঘটনাটি তারই নেতৃত্বে ঘটেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। প্রথমে জোরপূর্বক ওই বধূকে সাইফুরই ধর্ষণ করে বলে জানা গেছে। গতকাল ভোররাতে সাইফুরের কক্ষ থেকে পুলিশ অবৈধ আগেয়াস্ত্র পেয়েছে। ধর্ষক মাহফুজুর রহমান মাহফুজও এমসি কলেজের শিক্ষার্থী। সে হোস্টেলে থাকতো। রবিউল আগে শিক্ষার্থী ছিল। এখন সে হল দখল করে আছে। অর্জুন ও তারেক বহিরাগত। আসামিদের মধ্যে সাইফুরের বাড়ি বালাগঞ্জে, রবিউলের দিরাই, মাছুমের কানাইঘাট, অর্জুনের জকিগঞ্জ, রনির হবিগঞ্জ এবং তারেকের বাড়ি সুনামগঞ্জে। এমসি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর সালেহ উদ্দিন আহমদ মানবজমিনকে জানিয়েছেন- হোস্টেল থেকে ওদের বার বার তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ওরা বারণ মানেনি। সবার অগোচরে এসে আবার হোস্টেলেই বসবাস শুরু করে। তিনি জানান- ‘ধর্ষণের ঘটনার পর আমরা এখন ওই হোস্টেলটিকে সিলগালা করে দেবো। কাউকে সেখানে বসবাস করতে কিংবা ঢুকতে দেয়া হবে না।’

সিলেট মহানগর পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) জ্যোতির্ময় সরকার জানিয়েছেন- ‘ঘটনার সময় ধর্ষিত ও তার স্বামী সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিল। হোস্টেল থেকেই পুলিশকে ফোন করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে।’