যেভাবে বাঁচলেন সুমন ব্যাপারী

প্রকাশিত: ৯:৫৫ অপরাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২০ | আপডেট: ৯:৫৫:অপরাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২০

গাফফার খান চৌধুরী। মায়ের দোয়ার গুণে ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে দীর্ঘ সাড়ে বারো ঘণ্টা পর জীবিত অবস্থায় আল্লাহ উদ্ধার করেছেন। এছাড়া আর বাঁচার কোন উপায় ছিল না। কিভাবে তিনি বেঁচে ছিলেন একমাত্র আল্লাহ বলতে পারবেন। আমি নিজেও কিছু মনে করতে পারছি না।

সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুমন ব্যাপারী সাংবাদিকদের বলেন, সকাল আটটার দিকে লঞ্চটি মুন্সীগঞ্জ ঘাট থেকে ছাড়ে। সকাল দশটার দিকে সেটি মুন্সীগঞ্জের মোক্তারপুরের কাছাকাছি কাঠপট্টি ঘাটে ভিড়ছিল। এ সময় ময়ূর-২ নামের একটি লঞ্চ তাদের লঞ্চটিকে ধাক্কা দেয়। লঞ্চে বসে থাকার কারণে আমার মধ্যে কিছুটা ঘুম ঘুম ভাব ছিল। হঠাৎ দেখি সবাই চিৎকার করছেন। লঞ্চটি ডুবে যাচ্ছে। ধাক্কা দেয়ার কারণে লঞ্চটি প্রায় পুরোপুরি একদিকে কাঁৎ হয়ে যায়। মানুষজনও সেদিকে জড়ো হয়ে পড়ে। অন্যদের মতো আমিও লঞ্চের যেদিক ওপরে অর্থাৎ ভেসেছিল সেই দিকে দৌঁড়াতে থাকি। এরপর লঞ্চটি পুরোপুরি ডুবে যায়। আমি একটি রুমে ঢুকে রড ধরে ছিলাম। আমি যেখানে ছিলাম সেখানে তেমন পানি ঢুকতে পারেনি। সামান্য একটু পানি ঢুকে ছিল। সেই পানিতে আমি ওযু করে দোয়া পড়তে থাকি। আর আল্লাহর কাছে বাঁচার জন্য কান্নাকাটি করতে থাকি। আমি অনেক চেষ্টা করেও বের হতে পারছিলাম না। আমার গায়ে শুধু একটি গেঞ্জি ছিল। পরে সেটি খুলে কোমরে বেঁধে নেই। যাতে হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা থাকে। মূলত এটি করেছিলাম ওযু ঠিক রাখার জন্য। কারণ হাঁটুর ওপর কাপড় ওঠে গেলে ওযু ভেঙ্গে যায় বলে জানি। যতদূর মনে পড়ে লঞ্চের ইঞ্জিন রুমের পাশের একটি রুমে ছিলাম আমি। চালককে অদক্ষ বলে মনে হয়েছে তার। লঞ্চটি যখন ওপরের দিকে উঠছিল, তখন সাহস করে দরজা খুলে বেরিয়ে যাই। পরে আমাকে উদ্ধার করে উদ্ধার অভিযানে থাকা লোকজন।

মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ রাশীদ উন নবী সাংবাদিকদের জানান, সুমন বেপারী এখন ভাল আছেন, কথাবার্তা বলছেন। তাকে মেডিসিন ওয়ার্ডে নেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, রাজধানীর বাদামতলীর ফল ব্যবসায়ী মোঃ সুমন ব্যাপারী। বড় ভাইদের সুবাদে ছোট থেকেই ফল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ির আব্দুল্লাহপুরের নিজ বাড়িতে থাকেন চারদিন। তিনদিন ঢাকায় এসে ব্যবসা করেন। আট ভাই ও এক বোনের সংসারে তার পিতা ফজল ব্যাপারী মারা যান ছয় বছর আগে। তিনি কাজের জন্য বিদেশেও ছিলেন। দেশে ফিরে মা আমেনা খাতুনকে (৭২) নিয়ে নিজ বাড়িতেই আলাদা থাকেন তিনি। অন্যরা সবাই পৃথক। হয়ত আমি মায়ের দোয়াতেই বেঁচে আছি। ছেলে বেঁচে থাকার খবর পেয়ে মা নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন।

এ ব্যাপারে ফায়ার সার্ভিস এ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা যতদূর জানতে পেরেছি সুমন ব্যাপারী একটি রুমে আটকা ছিলেন। সেই রুমে তেমন পানি ঢুকতে পারেনি। পানি ঢুকতে না পারায় সেখানে বাতাস ছিল। বাতাসে স্বাভাবিক কারণেই অক্সিজেন ছিল। আর তাতেই তিনি বেঁচে ছিলেন। পরবর্তীতে ডুবুরিরা এয়ারলিফটিং করে লঞ্চটি ওপরের দিকে ভাসানোর চেষ্টা করার সময়, সুমন বেপারী সাহস করে বেরিয়ে আসেন। আর আমাদের ডুবুরিরা তাকে উদ্ধার করেন। তবে তিনি নিঃসন্দেহে অসম্ভব ভাগ্যবান ব্যক্তি, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

এদিকে নিহতদের পরিবারগুলোতে চলছে শোকের মাতম। বিশেষ করে মুন্সীগঞ্জের মীরকাদিমে। কারণ নিহতদের অধিকাংশর বাড়িই মীরকাদিমে।

প্রসঙ্গত, সোমবার সকাল দশটার দিকে মুন্সীগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা দু’তলা মর্নিং বার্ড নামের একটি লঞ্চকে ধাক্কা দেয় চাঁদপুর থেকে ছেড়ে আসা ময়ূর-২ নামের একটি বিশালাকার তিন তলা লঞ্চ। এতে করে ছোট লঞ্চটি মুহূর্তেই ডুবে যায়। সোমবার রাত সাড়ে দশটার দিকে প্রায় সাড়ে বারো ঘণ্টা পরেও ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে সুমন ব্যাপারী নামের ওই ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় উদ্ধার হয়। লঞ্চডুবিতে মোট ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। অনেকেই নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি করেছেন তাদের স্বজনরা।