ব্যক্তিগত আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে ট্রাম্প-বাইডেন বাকযুদ্ধ

প্রকাশিত: ৮:৩৪ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০ | আপডেট: ৮:৩৪:পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০

লন্ডন টাইমস নিউজ।তীব্র এক বাকযুদ্ধ হয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ডেমোক্রেট দল থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার প্রতিপক্ষ জো বাইডেনের মধ্যে। করোনা ভাইরাস মহামারি, অর্থনীতি এবং নভেম্বরের নির্বাচনের মর্যাদা নিয়ে এ সময় দুই নেতার বক্তব্যে যেন অগ্নি ঝরছিল। ছিল ব্যক্তিগত আক্রমণ, নাম ধরে ডাকাডাকি। আর যথারীতি জো বাইডেনের বক্তব্যের মাঝখানে ফোঁড়ন কাটছিলেন ট্রাম্প। একে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বক্তব্যের মাঝে বিঘ্ন সৃষ্টি হিসেবে উল্লেখ করেছে। ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্রের এ যাবতকালের সবচেয়ে খারাপ প্রেসিডেন্ট হিসেবে উল্লেখ করেছেন জো বাইডেন। তাকে তিনি দায়িত্বহীন, মিথ্যাবাদী, সঙ, পুতিনের পোষা কুকুর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। পক্ষান্তরে ট্রাম্প বলেছেন, জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে চান।

জো বাইডেনকে তিনি ‘স্মার্ট’ নন বলে আখ্যায়িত করেন। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মঙ্গলবার রাতে প্রথম প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কে মুখোমুখি এমনই আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে একজন আরেকজনকে ঘায়েল করেন। এ সময় উপস্থাপক ক্রিস ওয়ালেস বিতর্কে কোনো নিয়ন্ত্রণই করেননি। বিতর্কের মধ্যে জো বাইডেন যখন প্রথম সেগমেন্টে সুপ্রিম কোর্ট নিয়ে বক্তব্য রাখছিলেন তখন বার বার তার কথার মধ্যে বিঘ্ন সৃষ্টি করছিলেন ট্রাম্প। এ সময় ক্ষিপ্ত বাইডেন তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন- আপনি কি চুপ করবেন? এটা প্রেসিডেন্সিয়ালসুলভ আচরণ নয়।

পরে ট্রাম্পকে ‘ক্লাউন’ (সঙ), ‘রেসিস্ট’ (বর্ণবাদী) এবং ‘পুতিনস পাপি’ (পুতিনের পোষা কুকুর) হিসেবে আখ্যায়িত করেন বাইডেন। বলেন, আপনি আমেরিকার এ যাবতকালের সবচেয়ে খারাপ প্রেসিডেন্ট। জবাবে ট্রাম্প বলেন, আপনার মধ্যে কোন স্মার্ট কিছু নেই, জো (বাইডেন)। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন জো বাইডেনের কথার মধ্যে বার বার বিঘ্ন সৃষ্টি করছিলেন, তখন এক পর্যায়ে তাকে এমন আচরণ করতে বারণ করেন উপস্থাপক ক্রিস ওয়ালেস। তিনি বলেন, আমি মনে করি মানুষের কাছে আমরা ভালভাবে উপস্থাপিত হতে পারবো যদি আমরা দু’জনেরই কথার মধ্যে কম ফোঁড়ন কাটি। আপনাদের কাছে আমি এটা মানতে আবেদন জানাচ্ছি।
জবাবে ট্রাম্প বলেন, ঠিক আছে। তাকেও এটা মানতে বলুন।

ক্রিস ওয়ালেস ট্রাম্পের এ কথার জবাবে বলেন, খোলাখুলি বলি- আপনি বেশি বিঘ্ন সৃষ্টি করছেন।ট্রাম্পের পাল্টা জবাব- তিনিও (বাইডেন) প্রচুর বিঘ্ন সৃষ্টি করছেন।বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, জাতীয় পর্যায়ে জনমত জরিপে ট্রাম্পের (৭৪) চেয়ে এগিয়ে আছেন জো বাইডেন (৭৭), যদিও ব্যাটলগ্রাউন্ড বলে পরিচিত রাজ্যগুলোর জরিপ অনেকটা আভাষ দিতে পারে যে, নির্বাচনে কতটা তীব্র হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কিন্তু এখনই বলা যাচ্ছে না, এই বিতর্ক সূচককে কোনদিকে ঘুরিয়ে দেবে। মঙ্গলবারের বিতর্কে, করোনা ভাইরাস মহামারিতে ট্রাম্পের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জো বাইডেন। এতে কমপক্ষে দুই লাখ মার্কিনি মারা গেছেন। বাইডেন বলেছেন, ট্রাম্প এই করোনা ভাইরাস নিয়ে ভীতি সৃষ্টি করেছেন এবং মার্কিনিদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ, তার কাছে অর্থনীতিই বড় ছিল। তার দৃষ্টি ছিল স্টক মার্কেটের দিকে। বাইডেন বলেন, বিভিন্ন রাজ্যকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য খুলে দিয়েছেন ট্রাম্প। এক্ষেত্রে তিনি করোনা মহামারির হুমকিকে উপেক্ষা করেছেন।  বহু মানুষ মারা গিয়েছেন। তিনি আরো স্মার্ট না হলে, আরো দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে আরো অনেক মানুষ মারা যাবে। এ সময় জো বাইডেনের কথার মধ্যে ‘স্মার্ট’ শব্দের ব্যবহারের বিরোধিতা করেন ট্রাম্প। তিনি জো বাইডেনকে বলেন, আপনি তো আপনার ক্লাসে গ্রাজুয়েট হয়েছেন সবচেয়ে নিচে অথবা সর্বনি¤œ গ্রেডে। আমার বিষয়ে স্মার্ট শব্দ ব্যবহার করবেন না কখনো। আর কখনো ওই শব্দটি ব্যবহার করবেন না। করোনা মহামারির মধ্যে তার গৃহীত পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, আমরা ‘গ্রেট’ কাজ করেছি। কিন্তু জো (বাইডেন) আমি আপনাকে বলি, আমরা যে কাজ করেছি, আপনি কখনো তা করতে পারবেন না। আপনার রক্তে এটা নেই।

ওদিকে আগাম ভোটে লক্ষাধিক মার্কিনি তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। এ সময়ে যেসব ভোটার দলকানা নন, তাদের জন্য মন পরিবর্তন করার সময়ও খুব সংক্ষিপ্ত। ফলে বোঝা যাচ্ছে না বিতর্কের পর তারা কোন পক্ষে অবস্থান করবেন। আগামী ৩রা নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। আর বাকি প্রায় ৫ সপ্তাহ। এর আগে প্রথম প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্ক অনুষ্ঠিত হলো। এই বিতর্ক নির্বাচনের ওপর খুব বেশি প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এবার বিতর্কের শুরুতে দুই প্রার্থী যখন মঞ্চে উপস্থিত হন তখন তারা করমর্দন করেননি করোনা ভাইরাস সংক্রমণের জন্য। তাদেরকে মানতে হয়েছে সামাজিক দূরত্ব। বিতর্কের আগে বেশ কয়েকবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, নির্বাচনে তিনি পরাজিত হলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন না। তার অভিযোগ, মেইল ব্যবস্থায় যে ভোট হবে তাতে জালিয়াতি হবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে ভোট জালিয়াতি একটি বিরল বিষয়। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টকে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাদেরকে ব্যালটের বিষয়ে দৃষ্টি রাখতে হবে। তিনি এ সময় সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বলেন এবং ভোট দেয়ার দিকে দৃষ্টি রাখতে বলেন। ট্রাম্প বলেন, যদি আমি দেখি লাখ লাখ ব্যালট জালিয়াতি করা হচ্ছে, তাহলে তা আমি মানবো না। কারণ, তারা প্রতারণা করবে।

মার্কিনিদের প্রতি ভোট দিতে যাওয়ার আহ্বান জানান জো বাইডেন। তিনি ভোটারদের নিশ্চয়তা দেন যে, যদি জো বাইডেন বিজয়ী হন তাহলে ট্রাম্পকে বিদায় নিতে হবে। তবে বৈধ ফল না পাওয়া পর্যন্ত তিনি নিজের বিজয় ঘোষণা করবেন না।সম্প্রতি মারা যান যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি রুথ ব্যাডেন গিন্সবার্গ। তড়িঘড়ি করে এ পদে বিচারপতি এমি কোনি ব্যারেটকে মনোনয়ন দিয়েছেন ট্রাম্প। তার এ উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান নেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, নির্বাচনের পরিণতি রয়েছে। ডেমোক্রেটদের বিরোধিতা সত্ত্বেও তার এ পদে মনোনয়ন দেয়ার অধিকার আছে। তার ভাষায়, আমি খুব সাধারণভাবে আপনাকে বলি, আমরা নির্বাচনে জিতেছি। নির্বাচনের একটি পরিণতি আছে। আমাদের রয়েছে সিনেট। আমাদের আছে হোয়াইট হাউজ। সবাই সম্মান করেন এমন একজন নমিনি আছে আমাদের। জবাবে বাইডেন বলেন, নির্বাচনের পরে এই পদে মনোনয়ন দেয়া উচিত ছিল, যখন নির্ধারিত হবে কে হচ্ছেন প্রেসিডেন্ট। আমাদের অপেক্ষা করা উচিত। দেখা উচিত নির্বাচনের ফল কি হয়। এমি কোনি ব্যারেটকে তিনি অধিক রক্ষণশীল আখ্যায়িত করে বলেন, তাকে মনোনয়ন দেয়ার ফলে ওবামাকেয়ার হিসেবে পরিচিত অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট ঝুঁকিতে পড়বে। কিন্তু ট্রাম্প ওই পদে মনোনয়ন দিচ্ছেন দ্রুততার সঙ্গে। তিনি আশা করছেন সুপ্রিম কোর্টে ৬-৩ ব্যবধানে রক্ষণশীলরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে।
বিতর্ক শুরুর কয়েক ঘন্টা আগে জো বাইডেন তার ২০১৯ সালের আয়কর রিটার্ন প্রকাশ করেন। তার প্রচারণা শিবির থেকে এ সময় ট্রাম্পের প্রতিও একই আহ্বান জানানো হয়। উল্লেখ্য, বিগত ১৫ বছরের মধ্যে ট্রাম্প ১০ বছর কোনো আয়কর দেননি বলে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। এতে আরো বলা হয়েছে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ট্রাম্প ফেডারেল ট্যাক্স হিসেবে মাত্র ৭৫০ ডলার হিসেবে জমা দিয়েছেন। জো বাইডেনের আয়কর রিটার্নে দেখানো হয়েছে, তিনি এবং তার স্ত্রী জিল বাইডেন মিলে ২০১৯ সালে ফেডারেল আয়কর ও অন্যান্য পাওনা হিসেবে পরিশোধ করেছেন ৩ লাখ ৪৬ হাজার ডলার। এ সময়ে তাদের আয় ছিল প্রায় ৯ লাখ ৮৫ হাজার ডলার। নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, আমি লাখ লাখ ডলার ট্যাক্স এবং লাখ লাখ ডলার আয়কর দিয়েছি।