জিসা মনি কান্ডের রেশ না কাটতেই হত্যার পর নদীতে ফেলে দেয়া ৬ বছর পর স্বশরীরে হাজির সেই মামুন

প্রকাশিত: ৬:৪৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১, ২০২০ | আপডেট: ৬:৪৬:পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১, ২০২০

নারায়ণগঞ্জ, লন্ডন টাইমস নিউজ।নারায়ণগঞ্জে স্কুলছাত্রী জিসা মনির ঘটনার মতো আরও একটি ঘটনা ঘটেছে। জিসা মনিকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে শীতলক্ষ্যা নদীতে লাশ ফেলে দেয়ার ঘটনার ৪৫ দিন ফিরে আসে। এবার মামুন নামের এক যুবককে অপহরণের পর হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয়ার ছয় বছর পর ফিরে এসেছেন। এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আদালতপাড়ায় কথিত অপহৃত যুবক হাজির হলে দেখা দেয় চাঞ্চল্য।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আফতাবুজ্জামানের আদালতে কথিত অপহৃত মামুন হাজির হন। পরে আদালত একজন আইনজীবীর জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেন। মামুন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার লামাপাড়া এলাকার আবুল কালামের ছেলে।অপহরণের ছয় বছর পর আদালতে হাজির হয়েছেন তিনি। অথচ পুলিশ এ মামলায় আসামিদের গ্রেফতার করে আদালতে তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, অপহৃতকে হত্যার পর লাশ গুম করে শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেয়া হয়েছে। আর সিআইডি তাদের চার্জশিটে বলেছে, ওই যুবককে অপহরণ করা হয়েছে।

এসব কারণে গত চার বছর ধরেই মামলার আসামি হয়ে বিভিন্ন সময় কারাভোগ ও রিমান্ডের শিকার হয়েছেন খালাতো বোনসহ ছয়জন। মামলাটির বিচারকাজও সম্পন্নের পথে।

অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ মামলার বিষয়ে সঠিকভাবে তদন্ত না করে বিবাদীদের গ্রেফতারের পর অমানসিক নির্যাতন আর জোর করে জবানবন্দি নেয়ার চেষ্টা করেছে। মাকসুদা বেগম নামের এক সাক্ষীর ১৬১ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। এছাড়া আসামি কথিত প্রেমিকা তাসলিমা ও তার ভাই রফিক দেড় বছর কারাবাস করেছেন। আসামি রহমত আলী, সাগর ও সাত্তার দেড় থেকে তিন মাস কারাভোগ করেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১০ মে মামুন অপহরণ হয়েছেন- এমন অভিযোগ এনে দুই বছর পর ২০১৬ সালের ৯ মে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন বাবা আবুল কালাম। মামলায় ছয়জনকে বিবাদী করা হয়। তারা হলেন- তাসলিমা, রহমত, রফিক, সাগর, সাত্তার ও সোহেল। মামলার পর পুলিশ ছয়জনকেই গ্রেফতার করে।অভিযোগ রয়েছে, রিমান্ডে নিয়ে ছয়জনকে মারধর করা হয় এবং ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানের জন্য আদালতে পাঠানো হয়। কিন্তু তাদের কেউ আদালতে জবানবন্দি দেননি।মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন ফতুল্লা মডেল থানার এসআই মিজানুর রহমান।

তিনি আদালতে আসামিদের রিমান্ড চাওয়ার সময় আর্জিতে উল্লেখ করেন, খালাতো বোন তাসলিমা ২০১৪ সালের ১০ মে মামুনকে ডেকে নিয়ে কৌশলে অপহরণ করে বিষাক্ত শরবত পান করিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যায় ফেলে দিয়েছে।পরবর্তীতে মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিকে দেয়া হয়। সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর মামলার চার্জশিট দাখিল করেন। এতে মামলার এজাহারভুক্ত ছয়জনকেই অভিযুক্ত করেন।

চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়, ২০১৪ সালের ১০ মে খালাতো বোন তাসলিমাকে দিয়ে কৌশলে মামুনকে বাড়ি ডেকে আনা হয়। পরবর্তীতে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় তাসলিমা। কিন্তু বিয়েতে রাজি না হওয়ায় বিবাদী ছয়জন মিলে মামুনকে কোমল পানীয়র সঙ্গে চেতনানাশক দ্রব্য খাইয়ে অচেতন করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। তবে কোথায় কীভাবে কী অবস্থায় রাখা হয়েছে সেটা জানা যায়নি।

ঘটনার বিবরণে মামলার অন্যতম আসামি চাঁদপুরের মতলব থানা এলাকার রহমত আলীর মেয়ে তাসলিমা বলেন, আমাকে একই এলাকার মো. আবুল কালামের ছেলে মামুন পছন্দ করত। আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু আমি সাড়া দেইনি। পরে আমাকেসহ আমার ভাইদের সঙ্গে খালার বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় চলে আসি। কয়েকদিন পর আমি বাড়ি চলে যাই। বাড়ি চলে যাওয়ার পর আমার বিয়ে হয়ে যায়।

তিনি বলেন, মামুন তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অভিমান করে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। কিন্তু মামুনের বাবা আবুল কালাম আমিসহ আমার বাবা রহমত, ভাই রফিক, খালাতো ভাই সোহেল ও সাগর এবং আমার মামা সাত্তারকে আসামি করে মামলা করে। এই মামলায় আমি ও আমার ভাই এক বছর ধরে জেল খাটি। বাকিরা সবাই এক মাস করে জেল খাটে।

আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এমদাদ হোসেন সোহেল বুধবার আদালতে শুনানি শেষে সাংবাদিকদের বলেন, নিরীহ-নিরাপরাধ মানুষগুলো আজ যে জেল খেটেছে, আমরা তার বিচার চাই। রাষ্ট্রের কাছে ক্ষতিপূরণ চাই। পাশাপাশি বাদী কেন মিথ্যা মামলা করলেন, তার জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।