‘বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে স্বাস্থ্যবিধি পালনও ব্যয়বহুল’

প্রকাশিত: ৯:১৭ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৪, ২০২০ | আপডেট: ৯:১৭:পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৪, ২০২০

এলটিএন ডেস্ক ঢাকা।কোভিড-১৯ প্রতিরোধে সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি পালন করাও ব্যয়বহুল। বাসে, ট্রেনে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, কারখানায় বা কার্যালয়ে কর্মীদের মাঝে দূরত্ব বজায় রাখা এই সবের অর্থনৈতিক মূল্য আছে। এর সঙ্গে হাঁসফাঁস করা গরমে মাস্ক পরার শারীরিক অসুবিধা তো আছেই। সে কারণে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব হচ্ছে না।

অন্যদিকে সমাজের বিত্তবান মানুষদের অনেকে এখনো গৃহবন্দী জীবন-যাপন করছেন। তাঁরা বাইরে তো যাচ্ছেন-ই না, আবার বাড়িতেও কাউকে ঢুকতে দিচ্ছেন না। ফলে বাজারে অনেক কিছুর চাহিদা পড়ে যাচ্ছে।

গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় ‘কোভিড-১৯ ও উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক তিন দিনব্যাপী ভার্চ্যুয়াল সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে এ সব কথা বলেন অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, দেশের কর্মশক্তির প্রায় ৮৬ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। ফলে সাধারণ ছুটির কারণে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয়েছে এই খাতের কর্মীরা। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, সবজি বিক্রেতা এই শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয়েছে। এর মধ্যে আশার আলো দেখাচ্ছে প্রবাসী আয় ও তৈরি পোশাক রপ্তানি। তবে অর্থনীতিকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে গ্রামাঞ্চলে অকৃষি খাত ও শহরের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা দরকার। এ সব খাতেই সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান হয়, সে কারণে এ সব খাতের পুনরুজ্জীবন মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, সাধারণ ছুটি ঘোষণার কারণে অর্থনীতিতে সব ধরনের বিরূপ প্রভাবই পড়েছে, কিন্তু তাতে ভাইরাসের সামাজিক সংক্রমণ ঠেকানো যায়নি। স্বাস্থ্যবিধি প্রয়োগ না করার কারণে এমনটি ঘটেছে। অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ার কারণে এখানে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা সব সময় সহজ নয়।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থাপনা পেশ করেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রাঁসোয়া বুর্গেনন, ভারতীয় অর্থনীতিবিদ কুনাল সেন। অনুষ্ঠানে যোগ দেন সিপিডির চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান। ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদেরাও অংশ নেন।

অধ্যাপক রেহমান সোবহানও ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সুরে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের উন্নয়নে জোর দেন। তিনি বলেন, এই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে প্রাতিষ্ঠানিকতার বাতাবরণে নিয়ে আসতে হবে। দুই খাতের মধ্যকার ব্যবধান কমাতে হবে তাহলে এদের জীবন আর অরক্ষিত থাকবে না। একই সঙ্গে, এই খাতের কর্মীদের মধ্যে যারা কাজ হারিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন, তাদের আর্থিক সহায়তা করতে হবে। জিডিপিভিত্তিক দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা উচিত।

লকডাউনের কারণে বাংলাদেশের মতো সারা পৃথিবীতেই দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে। ফ্রাঁসোয়া বুরগিনিও বলেন, এই মহামারি উদ্ভূত অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দারিদ্র্য বাড়বে। শিক্ষা ও শিশুদের প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, লকডাউনের ফলে শিশুরা যে অপুষ্টির শিকার হচ্ছে, তাতে দীর্ঘ মেয়াদে তাদের শিক্ষা গ্রহণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

কুনাল সেন কোভিড-১৯ মহামারির সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের সম্পর্কের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, মহামারির ফলে লক্ষ্যমাত্রা অর্থাৎ জলবায়ু সংক্রান্ত পদক্ষেপ ছাড়া আর বেশির ভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেই বিঘ্ন ঘটেছে। এতে দারিদ্র্য নিরসনের অর্জনগুলো বিফলে যাচ্ছে এবং বিশ্বায়ন পিছু হটছে।

সাধারণ ছুটির মধ্যে শহর থেকে অনেক মানুষ গ্রামে ফেরত গেছেন-এই শক্তিকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়-এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, এটি উন্নয়ন প্রক্রিয়ার এক ধরনের পাল্টা গতি। ইতিমধ্যে গ্রামে যেখানে অকৃষি খাতে কর্মসংস্থান কৃষি খাতের চেয়ে বেশি, সেখানে এই শ্রমশক্তিকে গ্রামে ধরে রাখা সম্ভব নয় বলেই তাঁর অভিমত।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান।
কোভিড-১৯ মহামারির পরিপ্রেক্ষিতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জনস্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা, শ্রম বাজার, কর্মসংস্থান, রেমিট্যান্স, অভিবাসন, দারিদ্র্য, বৈষম্য, সামাজিক সুরক্ষা-এসব বিষয়ের ওপর ২৪টি গবেষণা প্রবন্ধ তিন দিন ব্যাপী এই সম্মেলনে উপস্থাপিত হয়েছে।

সম্মেলনে জুমের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের প্রায় ১৫০ জন অর্থনীতিবিদ, গবেষক, শিক্ষক, সাংবাদিক, উন্নয়ন কর্মী ও শিক্ষার্থী যোগ দেন। এ ছাড়া সব মিলিয়ে তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলনে আটটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় ৪০০ জন অংশগ্রহণকারী ছিলেন।